ছবি: সংগৃহীত

আলফাডাঙ্গায় কলেজছাত্র হত্যার জেরে গ্রামজুড়ে দফায় দফায় হামলা-ভাঙচুর-লুটপাট, নিষ্ক্রিয় পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ

Share

ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলায় কলেজছাত্র সুমন শেখ (২৪) হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষের অন্তত ১০টি বাড়িতে দফায় দফায় হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, দিনে-রাতে দুই সময়েই এসব ঘটনা ঘটলেও তা ঠেকাতে পুলিশের কোনো কার্যকর পদক্ষেপ চোখে পড়েনি।

গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা ১১টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত উপজেলার টগরবন্দ ইউনিয়নের বড়ভাগ গ্রামের বিভিন্ন মহল্লা ঘুরে একাধিক বাড়িতে ব্যাপক ভাঙচুরের চিত্র দেখা গেছে। এলাকায় আতঙ্ক বিরাজ করায় অনেকেই নাম প্রকাশ করে কথা বলতে রাজি হননি।

গত ২৬ জুন সন্ধ্যায় বড়ভাগ পূর্বপাড়ায় উকিল শেখের বাড়ির সামনে পূর্বশত্রুতা ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে হামলায় নিহত হন কলেজছাত্র সুমন শেখ, যিনি বড়ভাগ গ্রামের আলাউদ্দিন শেখের ছেলে এবং কাশিয়ানী উপজেলার এম এ খালেক ডিগ্রি কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। এই ঘটনায় তাঁর ভাই শামীম শেখ ১৭ জনকে আসামি করে আলফাডাঙ্গা থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।

স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, হত্যাকাণ্ডের রাতেই প্রথমে উকিল শেখের বাড়িতে হামলা চালানো হয়। এরপর ২৯ জুন সন্ধ্যায় হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে মানববন্ধন কর্মসূচির পর থেকেই ধারাবাহিকভাবে দিনে-রাতে বড়ভাগ গ্রামের বিভিন্ন মহল্লায় প্রতিপক্ষের অন্তত ১০টি বাড়িতে ভাঙচুরের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

টগরবন্দ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মিয়া আসাদুজ্জামান জানান, স্থানীয় আধিপত্য নিয়ে সাবেক ইউপি সদস্য কুদ্দুস শেখের ছেলে হুসাইন শেখ ও একই গ্রামের মুরাদ খানের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। নিহত সুমন শেখ ছিলেন মুরাদ খানের সমর্থক হিসেবে পরিচিত, আর এই পুরোনো বিরোধের জেরেই বিভিন্ন সময়ে তাঁদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়ে আসছিল।

সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, কুদ্দুস শেখ ও তাঁর ছেলে হুসাইন শেখের বাড়িতে পাকা ও আধা পাকা ঘর ভাঙচুর করে আসবাবপত্র নষ্ট করা হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, শত শত মানুষের একটি দল শাবল-হাতুড়ি দিয়ে দরজা-জানালা, দেয়াল ও ছাদ ভেঙে ফেলে, এমনকি কয়েকটি আধা পাকা ঘরের চালের টিনও খুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কুদ্দুস শেখ, হুসাইন শেখ, উকিল শেখ, এনায়েত শেখ, জনি শেখ, আলিম শেখ, শাহাদাৎ শেখ, আজগর শেখ, উজ্জ্বল শেখ ও রকিব শেখের বাড়িতে একই ধরনের তাণ্ডবের অভিযোগ করেছেন তাঁরা।

ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যরা এলাকায় না থাকায় তাঁদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলা যায়নি এবং একাধিক পরিবারের মুঠোফোন নম্বরও বন্ধ পাওয়া গেছে। তবে আলিম শেখের স্ত্রী শাপলা বেগম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে জমা দেওয়ার জন্য একটি লিখিত অভিযোগ প্রস্তুত করেছেন, যেখানে তিনি জানান, হামলাকারীরা আলমারি ভেঙে নগদ ৫ লাখ টাকা ও ১৫ ভরি স্বর্ণালংকার লুট করে নিয়ে গেছে, পাশাপাশি ঘরের আসবাবপত্র ভাঙচুর করে মূল্যবান জিনিসপত্রও নিয়ে গেছে। প্রতিবাদ করায় তাঁকে হত্যার হুমকিও দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করেছেন তিনি।

আলফাডাঙ্গা থানার ওসি ফকির ফাইজুর রহমান জানান, এ ধরনের কোনো লিখিত অভিযোগ নিয়ে এখনো কেউ থানায় আসেননি।

এ বিষয়ে বক্তব্য নিতে নিহত সুমন শেখ-সমর্থিত পক্ষের নেতা মুরাদ খানের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। অন্যদিকে হত্যা মামলার বাদী ও নিহত সুমনের ভাই শামীম শেখ প্রতিপক্ষের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর ও লুটপাটে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, হত্যাকাণ্ডের ২১ দিন পার হলেও এজাহারভুক্ত মাত্র একজন আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ, বাকিরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। তাঁর অভিযোগ, বাকি আসামিরা এখনো তাঁদের হুমকি দিয়ে যাচ্ছে, একটি লাশ পড়েছে বলে আরও পাঁচ-ছয়টি লাশ ফেলার হুমকিও দিচ্ছে তারা।

এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অনীহা প্রকাশ করে ওসি ফকির ফাইজুর রহমান জানান, ওপরের নির্দেশ থাকায় তিনি এ নিয়ে কিছু বলতে পারবেন না এবং ফরিদপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) কাছ থেকে বক্তব্য নেওয়ার পরামর্শ দেন। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শামসুল আজম জানান, ১৭ জনের বিরুদ্ধে করা হত্যা মামলায় একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং বাকিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। পাশাপাশি প্রতিপক্ষের বাড়িতে ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগও তদন্ত করা হচ্ছে বলে জানান তিনি, এবং দাবি করেন এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে।

মামলাটি প্রাথমিকভাবে তদন্ত করছিলেন আলফাডাঙ্গা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সুমিত মজুমদার, তবে গতকাল এই মামলার তদন্তভার ফরিদপুর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে বলে তিনি জানান।

পুলিশের ভাষ্যমতে, হত্যাকাণ্ডের পর ফরিদপুর পুলিশ লাইনস থেকে আট সদস্যের একটি দল নিরাপত্তার দায়িত্বে পাঠানো হয়েছিল। তবে সরেজমিনে টানা তিন ঘণ্টা গ্রাম ঘুরেও ওই পুলিশ দলের কোনো সদস্যের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়নি।