মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রপ্তানি নিয়ে গড়ে ওঠা একটি সিন্ডিকেটে সম্পৃক্ত থেকে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে ৪৯টি রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল করেছে সরকার, যার মধ্যে আওয়ামী লীগের সাবেক পাঁচ সংসদ সদস্যের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আদালতে দাখিলকৃত অভিযোগ গৃহীত হওয়ার পর গতকাল রোববার প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপন জারি করে এই তথ্য নিশ্চিত করে।
মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, লাইসেন্স পাওয়ার শর্ত হিসেবে প্রতিটি এজেন্সিকে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান আইন-২০১৩ এবং বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী (সংশোধন) আইন-২০২৩ মেনে চলতে হয়। কিন্তু এই ৪৯ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির প্রতারণা, আত্মসাৎ ও ষড়যন্ত্রসংক্রান্ত একাধিক ধারায় আদালতে মামলা গৃহীত হওয়ায় অভিবাসী আইন অনুযায়ী তাদের লাইসেন্স প্রত্যাহার করা হয়েছে।
তালিকায় থাকা উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে সাবেক অর্থমন্ত্রীর স্ত্রী ও কন্যার মালিকানাধীন অরবিটালস এন্টারপ্রাইজ ও অরবিটাল ইন্টারন্যাশনাল; ঢাকা-২০ আসনের সাবেক সংসদ সদস্যের আহমেদ ইন্টারন্যাশনাল; ফেনী-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্যের স্নিগ্ধা ওভারসিজ লিমিটেড; এবং ফেনী-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্যের ফাইভ এম ইন্টারন্যাশনাল। এ ছাড়া জনশক্তি রপ্তানি খাতের পরিচিত এক ব্যবসায়ীর প্রতিষ্ঠান ইউনিট ইস্টার্ন প্রাইভেট লিমিটেড এবং সিন্ডিকেটের অন্যতম হোতা হিসেবে পরিচিত ব্যক্তির প্রতিষ্ঠান ক্যাথারসিস ইন্টারন্যাশনালও এই তালিকায় স্থান পেয়েছে।
মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট এক সূত্র জানায়, বিভিন্ন সময়ে ইস্যু করা এসব লাইসেন্সের মধ্যে অনেকগুলো কয়েক দশকের পুরোনো। সাধারণত শর্ত ভঙ্গের ক্ষেত্রে লাইসেন্স বাতিলের বিধান থাকলেও গুরুতর অপরাধ বা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচিত হলে তা সরাসরি প্রত্যাহার করা হয়। এসব ক্ষেত্রে লাইসেন্স পুনরুদ্ধার করতে চাইলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে আদালতের দ্বারস্থ হতে হতে পারে।
বাতিল হওয়া বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে শাহীন ট্রাভেলস, আরভিং এন্টারপ্রাইজ, হৃদয় ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, রাব্বি ইন্টারন্যাশনাল ও জাহরাত ইন্টারন্যাশনালসহ আরও প্রায় ৪০টি এজেন্সি, যেগুলো দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কার্যক্রম পরিচালনা করত।
জানা যায়, দীর্ঘ প্রায় চার বছর বন্ধ থাকার পর ২০২২ সালের জুলাইয়ে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় খুলে দেওয়া হয়। তখন কর্মী পাঠানোর জন্য এজেন্সি নির্বাচনের ক্ষমতা দেওয়া হয় মালয়েশিয়া সরকারকে, যদিও বাংলাদেশ থেকে ১ হাজার ৫২০টি এজেন্সির তালিকা পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু শুরুতে মাত্র ২৫টি প্রতিষ্ঠানকে সুযোগ দেওয়া হয়, যা পরে ধাপে ধাপে বেড়ে ১০০টিতে দাঁড়ায়। এই সীমিত সুযোগের তালিকায় নাম তোলার জন্য মোটা অঙ্কের অর্থ লেনদেনের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় ছিল।
তথ্য অনুযায়ী, সরকার নির্ধারিত সর্বোচ্চ অভিবাসন ব্যয় ছিল ৭৮ হাজার ৯৯০ টাকা, অথচ বাস্তবে একজন কর্মীকে গড়ে সাড়ে পাঁচ লাখ টাকার কাছাকাছি খরচ করতে হয়েছে। প্রায় দেড় বছরের মধ্যে সাড়ে চার লাখ কর্মী পাঠিয়ে এই খাতে প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই সিন্ডিকেট-সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগেই ২০২৪ সালের জুন মাসে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানো সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। ওই বছরের ৩১ মে ছিল অনুমোদিত কর্মীদের জন্য দেশটিতে যাওয়ার সর্বশেষ সুযোগ। এরপর দুই দেশের মধ্যে একাধিকবার আলোচনা হলেও এখন পর্যন্ত শ্রমবাজার পুনরায় চালু হয়নি।