মাত্র তিন মাস আগে পাস হওয়া সাইবার সুরক্ষা আইন আবারও সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। নতুন সংশোধনীতে আইনটিকে আরও কঠোর করার পাশাপাশি শাস্তির মাত্রাও বাড়ানো হচ্ছে বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সংশোধিত খসড়ায় গুজব, অপতথ্য, হেয়প্রতিপন্ন ও মানহানিকর তথ্য—এই চারটি বিষয়কে অপরাধের সংজ্ঞার আওতায় এনে অভিযুক্তদের শাস্তির ব্যবস্থা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। আইন প্রয়োগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং ক্ষমতাপ্রাপ্ত অন্য একটি সংস্থাকেও যুক্ত করা হচ্ছে, যার মাধ্যমে মূলত ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারকে (এনটিএমসি) বোঝানো হয়েছে বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে। তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, জাতীয় সংসদের পরবর্তী অধিবেশনেই সংশোধিত আইনটি পাসের সম্ভাবনা রয়েছে।
সংশোধিত খসড়ায় নতুন যুক্ত হওয়া ২৬/ক ধারায় বলা হয়েছে, সাইবার পরিসরে কেউ গুজব বা অপতথ্য প্রকাশ বা প্রচার করলে তা অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। এ অপরাধে সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ ৪০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড কিংবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। খসড়ায় গুজবের সংজ্ঞা নির্ধারণ করে বলা হয়েছে, জনমনে বিভ্রান্তি, আতঙ্ক বা সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে বা করার ঝুঁকি রাখে এমন যেকোনো অসমর্থিত বা অযাচাইকৃত তথ্য, সংবাদ বা দাবিই গুজব। আর ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রকে বিভ্রান্ত বা ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে প্রচারিত মিথ্যা বা বিকৃত তথ্যকে অপতথ্য হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে।
আইনের ২৫ নম্বর ধারায়ও পরিবর্তন আনা হচ্ছে। মানহানি বা হেয়প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে অডিও, ভিডিও, স্থিরচিত্র, গ্রাফিকস কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি কোনো তথ্য প্রকাশ বা প্রচার করলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে, যার শাস্তি সর্বোচ্চ ৫ বছর কারাদণ্ড বা ২০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড। তবে কোনো নারী বা ১৮ বছরের কম বয়সীর বিরুদ্ধে এমন কনটেন্ট প্রচার করা হলে শাস্তি বেড়ে দাঁড়াবে সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ড বা ৪০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড পর্যন্ত। মানহানির সংজ্ঞা নির্ধারণে দণ্ডবিধির ৪৯৯ ধারা অনুসরণ করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তি, রাজনৈতিক নেতা ও বিভিন্ন পেশার মানুষের বিরুদ্ধে গুজব-অপতথ্য ছড়িয়ে দেশ ও সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার প্রবণতা বেড়েছে, যে বাস্তবতা মাথায় রেখেই আইনে নতুন ধারা যুক্ত করা হচ্ছে। এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া ভিডিও-অডিও ও বিভ্রান্তিকর ছবির মাধ্যমে অপপ্রচার ঠেকাতেও কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হচ্ছে বলে একাধিক নীতিনির্ধারক জানিয়েছেন।
তবে প্রযুক্তি-বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, এর মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ আমলের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ধাঁচে ফিরছে বাংলাদেশ। তাঁদের মতে, তড়িঘড়ি পাস না করে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা জরুরি। আইনবিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, গুজব ও অপতথ্যের সংজ্ঞা যত বেশি নির্দিষ্ট ও স্পষ্ট হবে, প্রয়োগ নিয়ে বিতর্কের আশঙ্কা তত কম থাকবে।
ডিজিটালি রাইটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিরাজ আহমেদ চৌধুরী বলেন, সংশোধিত আইন পাস হলে এর অপপ্রয়োগ হবে এবং অনলাইন স্বাধীনতার বৈশ্বিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান আরও নিচে নামবে, যা গণতান্ত্রিক পরিবেশ মূল্যায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড।
সূত্র জানায়, সংশোধনী নিয়ে সরকারের অভ্যন্তরেই মতভেদ রয়েছে। একাংশ সংশোধনের পক্ষে যুক্তি দিচ্ছে, আরেক অংশের মতে এতে সমালোচনা, অপপ্রয়োগ ও আন্তর্জাতিক চাপ বাড়বে।
উল্লেখ্য, ২০১৮ সালে ব্যাপক বিরোধিতার মধ্যেই কার্যকর হওয়া ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পরবর্তী সময়ে ভিন্নমত দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার আইনটি বাতিল করে ‘সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ-২০২৫’ জারি করে। পরে গত ৩০ এপ্রিল অধ্যাদেশ রহিত করে সংসদে পাস হয় ‘সাইবার সুরক্ষা বিল-২০২৬’। পাসের মাত্র তিন মাসের মাথায় আইনটি আবার সংশোধনের মুখে পড়ছে।