মাগুরার শালিখা উপজেলার চুকিনগর এলাকায় অবস্থিত মুন্সী শহিদুর রহমান বিএম কলেজে দীর্ঘদিন কোনো পাঠদানের চিহ্নই নেই, অথচ প্রতিষ্ঠানটির জন্য দেড় কোটি টাকার নতুন ভবন বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নিয়ে স্থানীয়ভাবে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা।
আড়পাড়া-কালীগঞ্জ আঞ্চলিক সড়কের পাশে অবস্থিত এই এমপিওবিহীন কারিগরি প্রতিষ্ঠানটি সরেজমিনে পরিদর্শন করে দেখা গেছে, দুটি জরাজীর্ণ আধা পাকা ঘর নিয়ে গঠিত কলেজটির কোনো নামফলকই নেই। চারপাশে জমেছে ঝোপঝাড় ও ময়লার স্তূপ, বারান্দায় গজিয়েছে ঘাস-লতা, বেশির ভাগ কক্ষ তালাবদ্ধ অবস্থায় মরিচা ধরে আছে। জানালা দিয়ে উঁকি দিলে চোখে পড়ে ধুলোয় ঢাকা বেঞ্চ, যা থেকে বোঝা যায় প্রতিষ্ঠানটি বহুদিন ধরে ব্যবহৃত হচ্ছে না।
মাগুরা জেলা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের পরিচালন বাজেটের আওতায় জেলার দুটি সংসদীয় আসনের ছয়টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভবন নির্মাণের জন্য দেড় কোটি টাকা করে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে এই কলেজটিও। সংশ্লিষ্ট চিঠিতে ১৫ জুলাইয়ের মধ্যে সরেজমিন জরিপ প্রতিবেদন এবং ১৫ আগস্টের মধ্যে মাটি পরীক্ষার প্রতিবেদন জমা দিতে নির্বাহী প্রকৌশলীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পদাধিকারবলে কলেজ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)। সম্প্রতি দায়িত্ব নেওয়া শালিখার ইউএনও তানভীর হাসান চৌধুরী জানান, সরকারি বরাদ্দে মাটি ফেলার কাজ তদারকিতে তিনি প্রতিষ্ঠানে গিয়েছিলেন, তবে ভেতরে প্রবেশ করেননি এবং একাডেমিক কার্যক্রম সম্পর্কে সরাসরি খোঁজ নেননি বলে জানান।
২০১৫ সালে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটিতে প্রথম কয়েক বছর শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি থাকলেও গত প্রায় সাত বছর ধরে নিয়মিত কোনো পাঠদান হতে দেখেননি স্থানীয় বাসিন্দারা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, কলেজের উদ্যোক্তারা বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকায় প্রতিষ্ঠান চালুর কয়েক বছরের মধ্যেই তা পরিচালনায় সমস্যায় পড়ে। অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রতিষ্ঠানটি যাঁর নামে, তিনি ছিলেন আড়পাড়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান। তাঁর বড় ছেলে মনিরুজ্জামান উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং বর্তমানে জেলা বিএনপির সদস্য, আর কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন তাঁর আরেক ছেলে মো. কামরুজ্জামান।
অধ্যক্ষ কামরুজ্জামান দাবি করেন, বর্তমানে কলেজে প্রায় ৫০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি রয়েছেন এবং তাঁদের মধ্যে ১৫ জনের মতো এবার উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন। পরীক্ষা চলমান থাকায় প্রতিষ্ঠান সাময়িক বন্ধ রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, বেশির ভাগ শিক্ষার্থী চাকরিজীবী হওয়ায় নিয়মিত আসেন না, তবে গত মাসেও ক্লাস হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর ভাষ্যে, প্রতিষ্ঠানে তাঁকে নিয়ে মোট ১৪ জন শিক্ষক-কর্মচারী কর্মরত আছেন, যাঁরা এমপিওভুক্তি না থাকায় খণ্ডকালীন ভিত্তিতে কাজ করছেন।
ভবনের বেহাল দশা প্রসঙ্গে অধ্যক্ষ কামরুজ্জামান জানান, গত ১৭ বছরে একাধিক মামলার মুখোমুখি হয়ে তাঁকে পালিয়ে বেড়াতে হয়েছে, এমনকি ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধেও মামলা হয়েছে বলে দাবি তাঁর। এক ঝড়ে টিনের চালা উড়ে যাওয়ার পর সহায়তা চাইতে গেলে ইউএনও কার্যালয়ে সেই আবেদনপত্র ছিঁড়ে ফেলা হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর প্রত্যাশা, নতুন ভবন হলে প্রতিষ্ঠানটি আবার ঘুরে দাঁড়াবে।
কলেজের প্রকৃত একাডেমিক কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে শালিখা উপজেলা ও জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয়ে গিয়েও কোনো তথ্য মেলেনি। মাগুরার ভারপ্রাপ্ত জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাহীলুদ্দীন জানান, বিএম কলেজগুলো কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে পরিচালিত হওয়ায় তাঁদের কার্যালয়ে এসব প্রতিষ্ঠানের নামের তালিকা ছাড়া বিস্তারিত কোনো তথ্য নেই। পরে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের খুলনা বিভাগীয় পরিচালক মো. হুসাইন শওকতের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে তথ্য পেতে তথ্য অধিকার আইনে আবেদনের পরামর্শ দেন।
জেলা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, কোন প্রতিষ্ঠানে ভবন নির্মিত হবে, তা মূলত স্থানীয় সংসদ সদস্যদের আধা সরকারি পত্রের (ডিও) ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় নির্ধারণ করে। এ বিষয়ে জেলা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী সরকার হারুন অর রশিদ জানান, সরেজমিন জরিপ প্রতিবেদনের ভিত্তিতে দরপত্র প্রক্রিয়ায় যাওয়া হবে কি না, সে সিদ্ধান্ত নেবে প্রধান কার্যালয়। বর্তমান জরিপ ফরমে শিক্ষা কার্যক্রম সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য না চাওয়া হলেও কোনো অসংগতি চোখে পড়লে তা মন্তব্য কলামে উল্লেখ করে প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হবে বলে জানান তিনি।
মাগুরার একটি বেসরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ কাজী নজরুল ইসলাম মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়নে নিয়মিত একাডেমিক কার্যক্রম, শিক্ষার্থীর উপস্থিতি ও শিক্ষার মানকেই প্রধান বিবেচনায় নেওয়া উচিত। দীর্ঘদিন পাঠদান বা পরীক্ষায় অংশগ্রহণহীন প্রতিষ্ঠানে বড় অঙ্কের উন্নয়ন বরাদ্দের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায় বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়ার আগে প্রতিষ্ঠানের একাডেমিক সক্ষমতা যাচাই হওয়া জরুরি।