ছবি : সংগৃহীত

থানায় বারবার হামলা, প্রশ্নের মুখে পুলিশের নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা সক্ষমতা

Share

বিপদে পড়লে সাধারণ মানুষের প্রথম আশ্রয়স্থল থানা হলেও সেই থানা ও পুলিশ সদস্যরাই এখন বারবার হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছেন। কোথাও রাজনৈতিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে, আবার কোথাও গুজব ছড়িয়ে সংঘবদ্ধ জনতাকে উত্তেজিত করে থানায় হামলার ঘটনা ঘটছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ১১ জুলাই সন্ধ্যা পর্যন্ত দেশে অন্তত তিনটি থানায় সরাসরি হামলা বা হামলার চেষ্টার খবর পাওয়া গেছে, আর আরেকটি ঘটনায় থানার ভেতরেই সাংবাদিক ও ছাত্রনেতাদের ওপর সংঘবদ্ধ হামলা হয়েছে।

সাম্প্রতিক হামলার ঘটনাপ্রবাহ

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত ৯ জুলাই এক আসামির মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে কয়েকশ মানুষ বরিশালের আগৈলঝাড়া থানায় আকস্মিক হামলা ও ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। হামলাকারীদের বেধড়ক মারধরে ছয় পুলিশ সদস্যসহ অন্তত ১২ জন আহত হন। ঘটনার পর ১১ জুলাই সন্ধ্যা পর্যন্ত নারী-পুরুষ মিলিয়ে ১৮ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

এর আগে গত ২২ মে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর হামলা ও ডিম নিক্ষেপের ঘটনায় মামলার প্রতিবাদে ঝিনাইদহ সদর থানা ঘেরাও করে ছাত্রদল ও যুবদলের নেতাকর্মীরা, যদিও সেই ঘটনায় কোনো পুলিশ সদস্য আহত হননি। এ ছাড়া গত ২৫ মার্চ গাইবান্ধার পলাশবাড়ী থানায় ঢুকে ওসিসহ পুলিশ সদস্যদের মারধরের অভিযোগ ওঠে যুব জামায়াতের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে, যাতে সাতজন পুলিশ সদস্য আহত হন। অন্যদিকে ২৩ এপ্রিল শাহবাগ থানার ভেতরে সাংবাদিক ও ছাত্রনেতাদের ওপর সংঘবদ্ধ হামলার ঘটনায় থানা সরাসরি লক্ষ্যবস্তু না হলেও পুলিশের উপস্থিতিতেই হামলা হওয়ায় থানার নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

পুলিশ সংগঠন ও সদর দপ্তরের প্রতিক্রিয়া

আগৈলঝাড়া থানায় হামলার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও তীব্র নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনটির ভাষ্যে, গুজবনির্ভর এই ধরনের সংঘবদ্ধ হামলা দেশে গড়ে ওঠা মব সংস্কৃতির বহিঃপ্রকাশ, যা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও জননিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি এবং শাস্তিযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ।

পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি (ক্রাইম ম্যানেজমেন্ট) মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান জানান, থানায় হামলার সময় তাৎক্ষণিকভাবে সব হামলাকারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সবসময় সম্ভব না হলেও পরবর্তীতে ভিডিও ফুটেজ ও প্রযুক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণ করে জড়িতদের শনাক্ত করা হচ্ছে। তিনি জানান, আগৈলঝাড়া থানার ঘটনায় মামলা হয়েছে এবং ইতিমধ্যে ১৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো গুজব নিয়েও তদন্ত করছে পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিট। হামলার কারণে পুলিশের সামগ্রিক কার্যক্রমে কোনো প্রভাব পড়ছে না দাবি করে তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট এলাকার পুলিশ সদস্যরা সাময়িকভাবে বিপর্যস্ত হলেও সার্বিকভাবে বাহিনীর মনোবল অটুট রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ

পুলিশ কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় দেশজুড়ে থানায় হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও অস্ত্র লুটের ঘটনায় বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য নিহত হন, যার প্রভাব কাটিয়ে উঠতে দীর্ঘ সময় লেগেছিল বাহিনীর। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পুলিশ আরও সক্রিয়ভাবে কাজ শুরু করলেও থানায় হামলার সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বাহিনীর মধ্যে নতুন করে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, আগৈলঝাড়া থানার হামলায় জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় না আনলে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও হুমকির মুখে পড়তে পারে। তাঁর মতে, ২৪ ঘণ্টা জনগণের নিরাপত্তায় নিয়োজিত বাহিনীর সদস্যদের ওপর থানায় গিয়ে হামলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় এবং কারণ যা-ই হোক, জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। তিনি আরও বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগের বিভিন্ন ঘটনায় কিছু পুলিশ সদস্যের বিতর্কিত ভূমিকার প্রভাবে বাহিনীর মনোবল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এবং দীর্ঘ সময় পর তা স্বাভাবিক হতে শুরু করার মধ্যেই নতুন করে থানায় হামলা উদ্বেগজনক।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. রেজাউল করিম বলেন, আগস্ট-পরবর্তী সময়ে পুলিশের প্রতি জনমনে অবিশ্বাস এবং বাহিনীকে দুর্বল করার প্রবণতার কারণে বিভিন্ন স্থানে পুলিশ আক্রান্ত হচ্ছে। তাঁর ভাষ্যে, পুলিশকে দুর্বল করে কোনো রাষ্ট্র অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, বরং পুলিশ কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালন করতে না পারলে অপরাধপ্রবণ ব্যক্তি ও গোষ্ঠী আরও সক্রিয় ও উৎসাহিত হয়ে ওঠে। তিনি পুলিশের মনোবল বাড়ানোর পাশাপাশি জনবল, যানবাহন ও প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতের ওপর গুরুত্ব দেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, পুলিশের কোনো সদস্য অপরাধ করলে তার বিচার হওয়া উচিত, তবে কয়েকজনের কারণে পুরো বাহিনীকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো দেশের জন্য সুফল বয়ে আনবে না।

অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু মনোবল অটুট থাকার মৌখিক আশ্বাসই যথেষ্ট নয়—থানায় হামলা ও মব সহিংসতার ঘটনায় দ্রুত ও দৃশ্যমান বিচার নিশ্চিত করতে না পারলে রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগের সক্ষমতাই প্রশ্নের মুখে পড়বে বলে তাঁরা সতর্ক করেছেন।