আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটে তৈরি হয়েছে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ। নির্বাচনি কৌশল নিয়ে জোট শরিকদের মধ্যে মতপার্থক্য ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। জোটসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের ভাষ্যে, নির্বাচনে অংশগ্রহণের ধরন নিয়ে শরিক দলগুলোর মধ্যে ভিন্নমত দেখা দিয়েছে। জামায়াত এককভাবে নির্বাচনে অংশ নিতে আগ্রহী হলেও জোটের অধিকাংশ শরিক সংসদ নির্বাচনের মতো সমঝোতার ভিত্তিতে ভোটের মাঠে নামার পক্ষে।
জোটের দায়িত্বশীল সূত্রগুলোর দাবি, নিজেদের সাংগঠনিক শক্তির ওপর ভরসা রেখে দলীয় পরিচয়ে এককভাবে প্রার্থী দেওয়ার পক্ষেই জামায়াতের নীতিনির্ধারকরা। অন্যদিকে জোটের শরিক জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টিসহ (এলডিপি) অন্য দলগুলো জোটবদ্ধভাবে নির্বাচন করার পক্ষে মত দিলেও এককভাবে প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতিও রাখছে তারা। তবে জামায়াত এককভাবে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিলেও আলোচনার দরজা সম্পূর্ণ বন্ধ করেনি বলে জানিয়েছে সূত্রগুলো।
জানা গেছে, চলতি বছরের দলীয় প্রতীকবিহীন স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে অক্টোবর-নভেম্বরে, আর এরই মধ্যে নির্বাচনের আচরণবিধি চূড়ান্ত করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
সিটি করপোরেশনে সমঝোতাহীন, তৃণমূলে ছাড়ে আপত্তি নেই
জামায়াতের নীতিনির্ধারকদের ভাষ্য, স্থানীয় সরকার নির্বাচন এককভাবে করার পরিকল্পনা তাদের আগে থেকেই ছিল, বিশেষত সিটি করপোরেশন নির্বাচনে কোনো দলের সঙ্গে সমঝোতায় না যাওয়ার পক্ষে দলের হাইকমান্ড। তবে উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ পর্যায়ে স্থানীয় নেতারা পরিস্থিতি বিবেচনায় সমঝোতার ভিত্তিতে প্রার্থী দিলে সে বিষয়ে কেন্দ্রের আপত্তি থাকবে না।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ জানান, অতীতে জাতীয় নির্বাচনে জোট থাকলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সব দলই আলাদাভাবে অংশ নিয়েছে, তাই সিটি করপোরেশনসহ স্থানীয় নির্বাচনে এবারও এককভাবে অংশগ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে জামায়াত। কেন্দ্রীয়ভাবে শরিক দলগুলোর সঙ্গে কোনো সমঝোতা না হলেও উপজেলা-পৌরসভা পর্যায়ে স্থানীয় নেতারা সমঝোতা করে নির্বাচন করতে পারবেন, এতে দলের কোনো আপত্তি নেই বলে জানান তিনি।
জোটসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে শরিকদের মতামতকে তেমন গুরুত্ব দিচ্ছে না জামায়াত, আর দলটির এই আচরণ অনেক শরিকের মধ্যে অসন্তোষের জন্ম দিয়েছে। তৃণমূলের চাহিদাকে গুরুত্ব দিয়ে জামায়াত এককভাবে নির্বাচন করার লক্ষ্যেই এগোচ্ছে। তবে শেষ পর্যন্ত জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতা না হলে জোটের অন্য শরিকরা নিজেদের মধ্যে সমঝোতা করে জোটবদ্ধভাবে নির্বাচনে অংশ নিতে পারে—এমন আলোচনাও চলমান রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই কৌশলগত ভিন্নতা এখনই জোটে বড় প্রভাব না ফেললেও নির্বাচনের তপশিল ঘোষণার পর পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট হবে।
সূত্রমতে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করেই মূলত গড়ে উঠেছিল ১১ দলীয় জোট। তবে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সীমিত পরিসরে সমঝোতার সুযোগ থাকতে পারে, যেখানে এনসিপি ঢাকার একটি সিটিসহ আরও দু-একটি সিটিতে এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস নারায়ণগঞ্জ ও ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনে সমঝোতার চেষ্টা করতে পারে।
শরিকদের ভিন্ন অবস্থান
একাধিক শরিক দলের নেতা মনে করেন, জাতীয় নির্বাচনের মতো স্থানীয় নির্বাচনেও সমন্বিত কৌশল নিলে ভোটের মাঠে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে, কারণ একাধিক শরিক দল একই এলাকায় আলাদা প্রার্থী দিলে ভোট বিভক্ত হয়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপি সুবিধা পেতে পারে বলে মনে করছেন তাঁরা।
এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন জানান, তাঁরা আপাতত এককভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন করার প্রস্তুতি শুরু করেছেন এবং দেশের অনেক এলাকার প্রার্থী চূড়ান্ত করেছেন, বাকি এলাকায় প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ চলছে। তবে নির্বাচনের সময় জোটগত পরিস্থিতি তৈরি হলে সে অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানান তিনি, কারণ তাঁর মতে স্থানীয় নির্বাচনে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের চেয়ে তৃণমূলের বাস্তবতা জয়-পরাজয়ে বেশি প্রভাব ফেলে।
এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার জানান, তাঁরা সারা দেশে প্রার্থী ঘোষণা করছেন এবং জুলাই পদযাত্রা কর্মসূচিতেও দলীয় প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া হচ্ছে, আগামী সেপ্টেম্বরে দ্বিতীয় ধাপে বিভিন্ন জেলায় গিয়ে প্রার্থীদের জনগণের সামনে তুলে ধরা হবে।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব জালালুদ্দীন আহমদ বলেন, জোটগতভাবে নির্বাচন না করলে প্রতিপক্ষ বিএনপির প্রার্থী সুবিধা পাবে এবং জয়ের সম্ভাবনা কমে যাবে। তবে কেউ এককভাবে নির্বাচন করতে বা জোটে না থাকতে চাইলে তা সম্পূর্ণ তাদের এখতিয়ার বলে মন্তব্য করে তিনি জানান, আপাতত প্রতিটি দল আলাদাভাবে প্রচারণা চালাচ্ছে এবং তপশিল ঘোষণার সময় জোট নাকি এককভাবে অংশ নেওয়া হবে, তা সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, স্থানীয় নির্বাচন নির্দলীয় ফরম্যাটে হওয়ায় এতে জাতীয় পর্যায়ে জোট হওয়ার সম্ভাবনা কম, তবে স্থানীয়ভাবে কোনো কোনো অঞ্চলে তা হতে পারে। তাঁর দল দলীয়ভাবে স্থানীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিপক্ষে হলেও কোনো নেতাকর্মী স্বেচ্ছায় অংশ নিতে চাইলে তাঁদের উৎসাহ ও সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
জোট ছাড়ার আভাস খেলাফত মজলিসের
প্রায় এক মাস ধরে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের কার্যক্রমে নিষ্ক্রিয় রয়েছে বাছিত আজাদের নেতৃত্বাধীন খেলাফত মজলিস। সূত্রমতে, জোটের বর্তমান কার্যক্রম ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অসন্তুষ্ট দলটি, বিশেষত স্থানীয় নির্বাচনে জামায়াতের একক প্রার্থী ঘোষণা ও তাদের চাওয়াকে গুরুত্ব না দেওয়ায় দূরত্ব বজায় রেখে চলছে তারা। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট এলাকায় ছাড় আদায়ে তৃণমূলের চাপও রয়েছে দলটির শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর। জোটে মাওলানা মামুনুল হকের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও এনসিপির তরুণ নেতাদের তুলনামূলক বেশি গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টিও সহজভাবে নিতে পারছে না খেলাফত মজলিসের নেতাকর্মীরা, যে কারণে খেলাফত আন্দোলনের পর কওমিভিত্তিক আরেকটি দল হিসেবে তাদেরও জোট ছাড়ার আলোচনা চলছে দলটির অভ্যন্তরে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত ২৭ জুন ময়মনসিংহ ও ১১ জুলাই রংপুরের বিভাগীয় সমাবেশ বর্জন করেছে খেলাফত মজলিস, আর আগামী ১৮ জুলাই বরিশাল ও ২৫ জুলাই সিলেটের জনসমাবেশেও অংশ নিচ্ছে না দলটি। শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে পরবর্তী বৈঠকের পর জোটে থাকা না থাকার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাতে পারে দলটি।
খেলাফত মজলিসের নেতাদের ভাষ্য, সংসদ নির্বাচনে আসন সমঝোতার সময় তাদের ন্যায্য আসন দেওয়া হয়নি, আর জুলাই সনদ বাস্তবায়নসহ জাতীয় সংকট নিয়ে আন্দোলন চলমান থাকার ফাঁকেই জামায়াত কৌশলে নিজেদের নির্বাচনি প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে ও একক প্রার্থী ঘোষণা করছে, তাই নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে জোটের মূল্যায়ন হওয়া জরুরি বলে মনে করেন তাঁরা।
খেলাফত মজলিসের মহাসচিব ড. আহমদ আব্দুল কাদের জানান, ১১ দলীয় ঐক্যের সঙ্গে তাঁরা এখনো আছেন এবং দাবি-দাওয়ার সঙ্গে একমত হলেও বিশেষ কারণে আপাতত কোনো কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন না, আগামী ২৫ জুলাই দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির শূরার বৈঠকের পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হবে।
১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ও জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, খেলাফত মজলিসের কিছু মান-অভিমান থাকতে পারে এবং একসঙ্গে পথ চলতে গেলে না চাইলেও কিছুটা ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়। তবে বিষয়টি নিয়ে আলাপ-আলোচনা চলছে এবং তা সমাধান হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
হেফাজতের সঙ্গে কওমি ধারার সাত দলের বৈঠক
অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে গতকাল বৃহস্পতিবার কওমি মাদ্রাসা ঘরানার সাতটি দলের শীর্ষ নেতারা পৃথকভাবে বৈঠক করেছেন। দলগুলো হলো ইসলামী আন্দোলন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, খেলাফত আন্দোলন, ইসলামী ঐক্যজোট ও নেজামে ইসলাম পার্টি, যাদের মধ্যে খেলাফত মজলিসের দুই অংশ ও নেজামে ইসলাম পার্টি ১১ দলীয় জোটেরও অংশ।
বৈঠকসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সাতটি দলকে নিজেদের মধ্যকার ভুলত্রুটি ভুলে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে হেফাজত, আর প্রতিটি দলই একসঙ্গে পথচলার বিষয়ে একমত পোষণ করেছে। আগামী দিনে একসঙ্গে পথচলার রূপরেখা প্রতিটি দল প্রস্তুত করে হেফাজতের দায়িত্বশীল নেতাদের কাছে জমা দেবে, যার ভিত্তিতে পরবর্তী বৈঠকগুলোতে ঐক্যের কাঠামো তৈরি হতে পারে।