দেশে মোবাইল নেটওয়ার্কের বিস্তার প্রায় সর্বজনীন হলেও সেই সুবিধা কাজে লাগিয়ে ডিজিটাল সেবা ব্যবহারে এখনো বড় ঘাটতি রয়ে গেছে। ফলে আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নের (আইটিইউ) সর্বশেষ ডিজিটাল অগ্রগতি সূচকে বাংলাদেশ প্রতিবেশী কয়েকটি দেশের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে।
২০২৪ সালের তথ্যের ভিত্তিতে ১৫৯টি দেশের মূল্যায়ন করে প্রকাশিত আইটিইউর প্রতিবেদনে বাংলাদেশের মোট স্কোর হয়েছে ৬৮.৯। আগের বছরের ৬৪.৯ থেকে এটি প্রায় ৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেলেও দেশের অবস্থান এখনো ভিয়েতনাম, ভুটান, কম্বোডিয়া, শ্রীলঙ্কা ও মিয়ানমারের নিচে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভিয়েতনাম ৮৮.৪ স্কোর নিয়ে তালিকায় এগিয়ে রয়েছে। এরপর রয়েছে ভুটান (৮৬.৪), কম্বোডিয়া (৭৮.৭), শ্রীলঙ্কা (৭৩.২) ও মিয়ানমার (৭১.৬)। বাংলাদেশের পরে রয়েছে পাকিস্তান (৬৭.৭), আর সর্বনিম্ন অবস্থানে আফগানিস্তান (৩৬.২)।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে ইন্টারনেট ও মোবাইল নেটওয়ার্কের বিস্তার উল্লেখযোগ্য হলেও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন, শিক্ষা, ব্যবসা, ব্যাংকিং ও সরকারি সেবায় প্রযুক্তির ব্যবহার প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছায়নি। এ কারণেই অবকাঠামোগত উন্নয়নের সুফল আন্তর্জাতিক সূচকে পুরোপুরি প্রতিফলিত হচ্ছে না।
আইটিইউর তথ্যমতে, বাংলাদেশের প্রায় ৯৯.৭ শতাংশ মানুষ থ্রিজি এবং ৯৯.৬ শতাংশ মানুষ ফোরজি নেটওয়ার্কের আওতায় রয়েছেন। ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন ৬৪.৪ শতাংশ মানুষ। কিন্তু ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর হার মাত্র ৫৩.৪ শতাংশ। অর্থাৎ দেশের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী এখনো নিয়মিত ইন্টারনেট ব্যবহার করছেন না।
একইভাবে, দেশের ৫৫.১ শতাংশ পরিবারের বাসায় ইন্টারনেট সংযোগ রয়েছে। ফলে প্রায় প্রতি দুই পরিবারের একটিতে এখনো ঘরে বসে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ নেই। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বৈশ্বিক গড়েরও নিচে অবস্থান করছে।
আইটিইউ ডিজিটাল অগ্রগতি মূল্যায়নে দুটি প্রধান সূচক ব্যবহার করেছে। এর মধ্যে নেটওয়ার্কের মান, গতি ও কভারেজ বিবেচনায় বাংলাদেশের ‘অর্থবহ সংযোগ’ স্কোর ৮৭.১। তবে সাধারণ মানুষের বাস্তব ব্যবহার পরিমাপকারী ‘সর্বজনীন সংযোগ’ সূচকে স্কোর নেমে এসেছে ৫০.৬-এ। বিশেষজ্ঞরা এই ব্যবধানকে ‘ইউসেজ গ্যাপ’ হিসেবে উল্লেখ করছেন।
তথ্যপ্রযুক্তি বিশ্লেষক সুমন আহমেদ সাবিরের মতে, শুধু প্রযুক্তিগত অবকাঠামো নির্মাণ করলেই হবে না; বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো, ডিজিটাল সেবা সহজ করা এবং জনগণের দক্ষতা বৃদ্ধি জরুরি। অন্যথায় প্রযুক্তির বিস্তার হলেও এর কার্যকর ব্যবহার বাড়বে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক বি এম মইনুল হোসেন বলেন, বাংলাদেশের স্কোর ধীরে ধীরে উন্নত হচ্ছে, যা ইতিবাচক। তবে এখন আইসিটি অবকাঠামোকে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও নাগরিকসেবার মান বাড়ানোর কাজে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে হবে। পাশাপাশি ডিজিটাল বৈষম্য কমিয়ে সব শ্রেণির মানুষকে প্রযুক্তিনির্ভর সেবার আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
আইটিইউর সুপারিশ অনুযায়ী, বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ইন্টারনেট ব্যবহারের হার বাড়ানো, ফিক্সড ব্রডব্যান্ড সংযোগ সম্প্রসারণ, নাগরিকদের ডিজিটাল দক্ষতা উন্নয়ন এবং সাইবার নিরাপত্তা–সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ ও নীতিনির্ধারণ আরও শক্তিশালী করা। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব ক্ষেত্রে অগ্রগতি অর্জন করা গেলে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক ডিজিটাল সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান আরও উন্নত হতে পারে।