জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। জোটের দুটি শরিক দল খেলাফত মজলিস ও বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন ইতিমধ্যে জোটের কর্মসূচি থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একই সময়ে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের উদ্যোগে কওমি ধারার সাতটি ইসলামি দলকে নিয়ে একটি নতুন ঐক্য প্রক্রিয়া এগিয়ে চলছে, যা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে কৌতূহল বেড়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আসন সমঝোতা এবং সংরক্ষিত নারী আসনে প্রত্যাশিত ছাড় না পাওয়ায় খেলাফত মজলিসের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই অসন্তোষ ছিল। দলটির অভিযোগ, জোটের ভেতরে মাওলানা মামুনুল হকের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসকে বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জামায়াতের এককভাবে অংশগ্রহণের সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগ। এই প্রেক্ষাপটে রাজধানীর কাকরাইলে কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরার সাধারণ অধিবেশনে খেলাফত মজলিস ১১-দলীয় ঐক্যের কর্মসূচি থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়। দলটির নায়েবে আমির আহমাদ আলী কাসেমী জানান, তাঁরা এখন থেকে এককভাবে কর্মসূচি পালন করবেন, তবে চাইলে অন্য দলের অনুষ্ঠানে অংশ নিতে পারবেন।
একই ধরনের সিদ্ধান্ত এর আগে জুন মাসে নিয়েছিল বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন। দলটি তখন কর্মসূচিতে তাদের নাম ব্যবহার না করারও অনুরোধ জানিয়েছিল। দলীয় সূত্র বলছে, আসন সমঝোতা না হওয়া এবং উচ্চকক্ষ গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তাই এই সিদ্ধান্তের মূল কারণ। তবে দলটির আমির মাওলানা হাবিবুল্লাহ মিয়াজী জানিয়েছেন, হেফাজতের জ্যেষ্ঠ আলেমদের তত্ত্বাবধানে নতুন কোনো ঐক্য গঠিত হলে তাঁরা তাতে যুক্ত হতে আগ্রহী।
এদিকে গত ১৬ জুলাই চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে জামেয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদ্রাসায় হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সভাপতিত্বে এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে অংশ নেয় জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, ইসলামী ঐক্যজোট, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। সভা সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক দূরত্ব কমিয়ে ভবিষ্যতে একসঙ্গে চলার বিষয়ে নীতিগত সম্মতি হয়েছে। প্রতিটি দলকে আগামী ৩ আগস্টের মধ্যে লিখিত প্রস্তাব জমা দিতে বলা হয়েছে, এরপর সেগুলো পর্যালোচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ হবে।
হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী বলেন, ইসলামপন্থী দলগুলো যেন ধর্মীয় বিষয়ে ঐক্যবদ্ধ থাকে এবং পরস্পরের বিরুদ্ধে সমালোচনা না করে, সে লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে হেফাজতের কেন্দ্রীয় কমিটির একাধিক নেতা জানিয়েছেন, অতীতেও এ ধরনের উদ্যোগ ফলপ্রসূ হয়নি, ফলে নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক স্বার্থের দ্বন্দ্বে এবারের উদ্যোগও কতটা সফল হবে তা নিয়ে সংশয় থেকে যাচ্ছে।
অন্যদিকে ১১-দলীয় ঐক্যে থাকা কওমি ধারার দলগুলোর নেতারা বলছেন, এখনই জোট ছাড়ার সিদ্ধান্ত হয়নি। বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মাওলানা মুসা বিন ইযহার বলেন, সাত দলের ঐক্য এখনো চূড়ান্ত রূপ পায়নি, প্রস্তাব জমার পরই বিষয়টি স্পষ্ট হবে। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বলেন, ১১-দলীয় ঐক্যের মূল লক্ষ্য গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, তাই এই আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। হেফাজতের উদ্যোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি মূলত ধর্মীয় বিষয়ে বোঝাপড়ার প্রক্রিয়া, রাজনৈতিক ঐক্যের কোনো আলোচনা এখনো হয়নি।
১১-দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ও জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, খেলাফত মজলিস ও বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন এখনো জোটে এবং সংসদেও আছে, শুধু কিছু কারণে কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছে না। হেফাজতের সাত দলের ঐক্য উদ্যোগের পেছনে সরকারের ইন্ধন থাকতে পারে বলে সন্দেহ প্রকাশ করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, বিরোধী দলের আন্দোলন গণতান্ত্রিক পথে মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়ে সরকার ভিন্ন কৌশল নিচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ১১-দলীয় ঐক্য এখন এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। হেফাজতের উদ্যোগে কওমি ধারার দলগুলোর এই আলোচনা শেষ পর্যন্ত নতুন কোনো রাজনৈতিক জোটে রূপ নেয় কি না, তা স্পষ্ট হবে আগামী দিনের ঘটনাপ্রবাহে।