জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দীর্ঘদিনের আবাসস্থল গণভবনেই গড়ে তোলা হয়েছে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’। আগামী ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এটি উদ্বোধন করবেন বলে জানা গেছে। শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি চললেও জাদুঘরের স্থায়ী জনবল নিয়োগ এখনো সম্পন্ন হয়নি।
গত ১২ মে গণভবনে জাদুঘরের নির্মাণকাজ পরিদর্শন শেষে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, জুলাইয়ের শেষ নাগাদ বা ৫ আগস্টের মধ্যে জাদুঘর খুলে দেওয়া হবে। জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক ও জুলাই স্মৃতি জাদুঘরের মহাপরিচালক তানজিম ওয়াহাব প্রথম আলোকে জানান, জনবল নিয়োগ সম্পন্ন না হলেও নির্ধারিত দিনেই আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হবে, আর দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা ও প্রবেশ টিকিট ব্যবস্থাসহ প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি চলছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা দেশত্যাগের পর গণভবনে বিক্ষুব্ধ জনতা প্রবেশ করে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়, এমনকি বৈদ্যুতিক সুইচবোর্ড ও গণভবন লেখা সাইনবোর্ডও খুলে নিয়ে যাওয়া হয়। শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত ১৭ দশমিক ৬৮ একরের এই ভবনের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট নেয় সেনাবাহিনী। এরপর ৫ সেপ্টেম্বর সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার এটিকে জাদুঘরে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নেয় এবং ২৪ ডিসেম্বর উপদেষ্টা পরিষদের সভায় নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়।
জাদুঘরের মহাপরিচালক তানজিম ওয়াহাব জানান, গণপূর্ত বিভাগ ও জাতীয় জাদুঘর যৌথভাবে এই প্রকল্পে মোট ১২৩ কোটি ৪৫ লাখ টাকা বরাদ্দ পেয়েছিল, যার মধ্যে ব্যয় হয়েছে ১১০ কোটি ৯২ লাখ টাকা এবং অব্যয়িত ১২ কোটি ৫৩ লাখ টাকা কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়েছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে জাদুঘর পরিচালনার জন্য বরাদ্দ ধরা হয়েছে ১৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা। ভবন সংস্কার ও অবকাঠামোগত কাজ করেছে গণপূর্ত অধিদপ্তর, আর ভাস্কর্য নির্মাণ, নিদর্শন সংগ্রহ, গ্যালারি সাজানো ও তথ্যচিত্র নির্মাণের দায়িত্বে ছিল জাতীয় জাদুঘর।
তবে নির্মাণকাজে কার্যাদেশ পাওয়া প্রতিষ্ঠানের বদলে অন্য প্রতিষ্ঠানের কাজ করা, ঠিকাদারের ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার, ভাস্কর্য ও প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ এবং আপ্যায়ন খাতে অতিরিক্ত ব্যয়ের অভিযোগ নিয়ে একাধিক গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে, যার প্রতিবাদ জানিয়েছে জাদুঘর কর্তৃপক্ষ। এ প্রসঙ্গে তানজিম ওয়াহাব বলেন, নিয়ম মেনেই কাজ হয়েছে, তবে দ্রুততার কারণে কিছু প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। তিনি জানান, গণপূর্ত এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে জাদুঘর হস্তান্তর করেনি এবং অডিটও বাকি রয়েছে।
জাদুঘর নির্মাণে সরাসরি ক্রয়পদ্ধতি অনুসরণের সিদ্ধান্তও সমালোচনার মুখে পড়েছিল। গত বছরের ১৫ জুলাই অর্থনৈতিক বিষয়-সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটি রাষ্ট্রীয় জরুরি প্রয়োজন দেখিয়ে এই পদ্ধতিতে অনুমোদন দেয়, যাতে নির্ধারিত সময়ে উদ্বোধন সম্ভব হয়। এ নিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছিলেন, এই প্রক্রিয়ায় সরকারি ব্যয়ে প্রত্যাশিত স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি লঙ্ঘিত হয়েছে এবং জাদুঘর নির্মাণ কোনো বিশেষায়িত ক্রয়ের আওতায় পড়ে না। জবাবে তানজিম ওয়াহাব বলেন, সরকারের অনুমতিতেই দ্রুত উদ্বোধনের লক্ষ্যে সব কাজ হয়েছে, প্রক্রিয়াটি অবৈধ না হলেও এটি ছিল সঠিক পথ নয়।
জাদুঘরের জনবল নিয়োগ নিয়েও জটিলতা রয়েছে। তানজিম ওয়াহাব জানান, আপাতত জাতীয় জাদুঘরের ১৮ জন কর্মকর্তা অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে এখানে কাজ করছেন এবং আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে জনবল নেওয়া হবে। নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল—নিয়মে লিখিত পরীক্ষা বাধ্যতামূলক থাকলেও ৬২টি পদে ৯৬ জনকে শুধু মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়, মাত্র সাত দিনের আবেদন সময়সীমা দিয়ে গত ২৮ জানুয়ারি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। রাষ্ট্রপতি লিখিত পরীক্ষার শর্ত শিথিল করলেও সমালোচনার মুখে পরে মৌখিক পরীক্ষা বাতিল করা হয়। গত ৯ জুলাই আইন অনুযায়ী জাদুঘরের ১৫ সদস্যের পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয়েছে, যার সভাপতি সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী এবং সদস্যসচিব মহাপরিচালক তানজিম ওয়াহাব। তিনি জানান, নতুন পর্ষদ গঠিত হওয়ায় নিয়োগ-জটিলতা দ্রুত কাটবে বলে আশা করছেন।
জাদুঘরে জুলাই আন্দোলন, শাপলা ট্র্যাজেডি, বিডিআর বিদ্রোহসহ গুম-খুনের শিকার প্রায় চার হাজার মানুষের স্মৃতি সংরক্ষণে মেমোরিয়াল তৈরি করা হয়েছে, যেখানে এখন পর্যন্ত আড়াই হাজারের বেশি প্রতীকী কবর বানানো হয়েছে। ১৯টি থিমে মোট ৬২টি প্রামাণ্যচিত্র নির্মিত হয়েছে এবং একটি থিয়েটারে ফ্যাসিবাদী আমলের ইতিহাস তুলে ধরা হবে। এ ছাড়া পাঁচটি নতুন ওয়াকওয়ে, সম্প্রসারিত লেক, ফুডকোর্ট, টিকিট হাউস, স্যুভেনির শপ এবং প্রতীকী আয়নাঘর তৈরি করা হয়েছে।
জাদুঘর পর্ষদের সদস্য ও শহীদ মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধর যমজ ভাই মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ বলেন, ফ্যাসিবাদী আমলের অত্যাচারের ইতিহাস মানুষকে জানাতে জাদুঘরটি দ্রুত খুলে দেওয়া প্রয়োজন এবং প্রতিটি জুলাই শহীদের স্মারক সেখানে থাকা জরুরি। এর আগে সাবেক প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসও একাধিকবার জাদুঘর পরিদর্শন করে এর গুরুত্বের কথা তুলে ধরেছিলেন। তবে জাদুঘর পরিদর্শনকারী অতিথিদের আপ্যায়ন খাতে ৩৭ লাখ টাকার বেশি ব্যয় নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে সমালোচনা হয়েছে।