ছবি: সংগৃহীত

সুদহারনির্ভর নীতি নয়, মূল্যস্ফীতিকে লক্ষ্য ধরে নতুন মুদ্রানীতি কাঠামোর ভাবনা বাংলাদেশ ব্যাংকের

Share

টানা কয়েক মাস ধরে দেশের মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে থাকা এবং উচ্চ সুদহার সত্ত্বেও তা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় না নামায় বর্তমান সুদহারভিত্তিক মুদ্রানীতি কাঠামো পরিবর্তনের চিন্তা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিকল্পনা হলো, সুদহারকে মূল লক্ষ্য না রেখে ধীরে ধীরে মূল্যস্ফীতিকে একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় নামিয়ে আনাকে কেন্দ্র করে আধুনিক মুদ্রানীতি কাঠামো গড়ে তোলা।

রোববার জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির প্রথম বৈঠকে এই পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে বাংলাদেশ ব্যাংক। বৈঠকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর হাবিবুর রহমান ‘বাংলাদেশ ব্যাংক এবং মুদ্রানীতি’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। কমিটির সভাপতি মুশফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে অংশ নেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমসহ কমিটির সদস্যরা। এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান এবং অর্থ মন্ত্রণালয়, এনবিআর ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ভাষ্য, বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতিতে উন্নীত করতে হলে বিদ্যমান মুদ্রানীতি কাঠামোকে আরও যুগোপযোগী করতে হবে, যেখানে শুধু সুদহার বাড়ানো-কমানোর বদলে মূল্যস্ফীতিকে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে রাখাই হবে নীতির কেন্দ্রবিন্দু। এ জন্য ১৯৭২ সালের বাংলাদেশ ব্যাংক আদেশ সংশোধন করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আইনগত সক্ষমতা ও স্বাধীনতা আরও জোরদার করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরা হয় বৈঠকে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত জুনে দেশের মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ, টানা তিন মাস ধরেই যা ৯ শতাংশের ওপরে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে উচ্চ নীতি সুদহার প্রয়োগ করেও কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়া নিয়ে বৈঠকে প্রশ্ন তোলেন একাধিক সংসদ সদস্য। বৈঠক শেষে কমিটির সভাপতি মুশফিকুর রহমান জানান, সদস্যদের অনেকেই উচ্চ সুদহার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে জানতে চান, সুদহার বাড়ানোর পরও কেন মূল্যস্ফীতি কমছে না। প্রথম বৈঠক হওয়ায় বিস্তারিত আলোচনা সম্ভব হয়নি জানিয়ে তিনি বলেন, পরবর্তী বৈঠকগুলোতে বিষয়টি নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাখ্যায় বলা হয়, বর্তমানে নীতি সুদহার ১০ শতাংশ, যা বাড়ার ফলে ব্যাংক ঋণের সুদও বেড়েছে, ফলে ঋণ গ্রহণ কমেছে এবং বিনিয়োগ-ব্যয় সংকুচিত হয়ে বাজারে অর্থপ্রবাহও কমেছে। বিপরীতে মূল্যস্ফীতি লক্ষ্যভিত্তিক কাঠামোয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক আগে থেকেই একটি নির্দিষ্ট মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য ঠিক করবে এবং সুদহার, তারল্য ব্যবস্থাপনা ও বিনিময় হারসহ সব নীতিগত পদক্ষেপ সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য পরিচালিত হবে—অর্থাৎ সুদহার নিজে লক্ষ্য না থেকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের একটি হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে।

এই কাঠামো কার্যকর করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, মূল্যস্ফীতির নির্ভরযোগ্য পূর্বাভাস দেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানো, বাজারভিত্তিক সুদহার ব্যবস্থা কার্যকর করা, রাজস্ব ও মুদ্রানীতির মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা এবং বিনিময় হারকে তুলনামূলক বাজারভিত্তিক রাখার মতো কয়েকটি শর্ত পূরণ জরুরি বলে মনে করে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরও বলেছে, শুধু সুদহার বাড়ানো যথেষ্ট নয়; বিনিময় হার, রাজস্বনীতি ও সরবরাহব্যবস্থার উন্নয়নেও সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন, কারণ আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা, সরবরাহ দুর্বলতা ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা এখনো চাপ তৈরি করছে। তবে সরকার ঘোষিত ৬৩ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়বে বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, যদিও এই বাড়তি অর্থপ্রবাহ মূল্যস্ফীতির ওপর কিছুটা চাপও তৈরি করতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, স্বাধীনতার পর প্রথম দিকে সরাসরি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে মুদ্রানীতি পরিচালিত হতো, ২০০৩ সাল থেকে অনুসরণ করা হয় অর্থের জোগানভিত্তিক মুদ্রানীতি, আর ২০২৩ সালের ১ জুলাই থেকে চালু হয় সুদহারভিত্তিক বর্তমান কাঠামো, যা এখন সুদহার করিডর ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।

বৈঠকে বিএনপির সংসদ সদস্য ও কমিটির সদস্য শাহাদাত হোসেন ব্যবসায়ীদের ঋণসংক্রান্ত সমস্যার বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, উচ্চ সুদহারের কারণে ব্যবসা পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে, তাই সুদহার এক অঙ্কে নামিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া উচিত। এ ছাড়া খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ আরও ছয় মাস বাড়ানো এবং ‘ব্যাংক-গ্রাহক সম্পর্ক’ শর্তের কারণে ব্যবসায়ীদের হয়রানি বন্ধেরও আহ্বান জানান তিনি।