সবুজ পটভূমিতে সাদা অক্ষরে লেখা একটি সড়ক নিরাপত্তা সাইনবোর্ড— যা তিন বছর ধরে কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার দুটি গ্রামের মধ্যে রক্তক্ষয়ী বিরোধের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভৈরব-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে ২০২৩ সালে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের বসানো সাইনবোর্ডে কেবল ‘আকবরনগর বাজার’ লেখা থাকাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট এই বিরোধ গত সোমবার আবারও রক্তক্ষয়ী রূপ নিয়েছে।
সবশেষ সংঘর্ষে কালিকাপ্রসাদ ইউনিয়নের মিরারচর গ্রামের মাসুদ ও হিরণ নামের দুজন প্রাণ হারিয়েছেন, আহত হয়েছেন অন্তত ২৫ জন। সংঘর্ষের সময় ভাঙচুর ও আগুন লাগানোর ঘটনাও ঘটে, আর কয়েক ঘণ্টার জন্য বন্ধ থাকে ভৈরব-ময়মনসিংহ রুটে রেল যোগাযোগ। আতঙ্কে অনেকে বাড়িঘর ছেড়ে চলে যান।
এক সাইনবোর্ডে ভাঙল বহু বছরের সম্পর্ক
স্থানীয়দের ভাষ্যে, এটি নিছক একটি নামের লড়াই নয়— বরং একটি সাইনবোর্ডকে ঘিরে ভেঙে পড়েছে আকবরনগর ও মিরারচর গ্রামের দীর্ঘদিনের সামাজিক বন্ধন, আত্মীয়তা ও পারস্পরিক আস্থা। বাজারের কেনাবেচা থেকে শুরু করে সামাজিক অনুষ্ঠান— সবখানেই এখন স্পষ্ট বিভাজনের ছাপ। কালিকাপ্রসাদ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান লিটন মিয়ার অভিযোগ, স্থানীয় মানুষের মতামত উপেক্ষা করে সওজ একটি গ্রামের নাম রেখে অন্যটির নাম বাদ দিয়েছে, যার খেসারত এখন দিতে হচ্ছে দুই গ্রামের সাধারণ মানুষকে।
সরেজমিন পরিদর্শনে জানা যায়, ২০২৩ সালের প্রথম সংঘর্ষের পর থেকেই দুই গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে যোগাযোগ কমতে শুরু করে। আগে যে বাজারে সবাই নির্বিঘ্নে কেনাকাটা করতেন, এখন সেখানে ক্রেতারা আগে দোকানির গ্রাম-পরিচয় জেনে নেন, এমনকি গ্রাম দেখেই দোকান বাছাই করেন অনেকে— যার প্রভাব পড়েছে সরাসরি ব্যবসায়। ওই দুই গ্রামের বাইরের এক চা-বিক্রেতা জাকির মিয়া বলেন, একটি সাইনবোর্ডই বহু দিনের সম্পর্ক নষ্ট করে দিয়েছে। পার্শ্ববর্তী গ্রামের ব্যবসায়ীরাও জানান, বিরোধের পর আকবরনগর ও মিরারচরের ব্যবসায়ীর সংখ্যা কমে গিয়ে আশপাশের গ্রামের ব্যবসায়ীদের প্রাধান্য বেড়েছে।
যৌথ উদ্যোগে গড়া বাজার, এখন বিভাজনের কেন্দ্র
প্রবীণ বাসিন্দাদের বরাতে জানা গেছে, ১৯৮৫ সালে মহাসড়ক ঘেঁষে আকবরনগর বাসস্ট্যান্ড গড়ে ওঠে এবং ১৯৯১ সালে দুই গ্রামের উদ্যোগেই বাসস্ট্যান্ডের দুই পাশে বাজার প্রতিষ্ঠিত হয়। আকবরনগরের অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্য কাদির মিয়া এবং মিরারচরের করম আলী, মস্তু মিয়া, বরজু মিয়াসহ দুই গ্রামের অনেকের যৌথ প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠা বাজারটি তখন থেকেই স্থানীয়ভাবে পরিচিত ছিল ‘আকবরনগর-মিরারচর বাজার’ নামে।
বর্তমানে ২০০টির বেশি দোকান নিয়ে চলা এই বাজারের কোনো সরকারি নাম বা ইজারা নেই। ২১ শতাংশ জমি ৬৬ জন ব্যক্তিমালিকের হাতে, আর ব্যবসা চলে ইউনিয়ন পরিষদের ট্রেড লাইসেন্সের ভিত্তিতে। বাজার পরিচালনা কমিটিতেও রয়েছে দুই গ্রামের অলিখিত ভারসাম্য— সভাপতি ও কোষাধ্যক্ষ পদ থাকে আকবরনগরের প্রতিনিধির হাতে, সাধারণ সম্পাদক পদ থাকে মিরারচরের প্রতিনিধির কাছে। তিন দশকের বেশি সময় এই সমঝোতাতেই বাজার চলছিল।
সাইনবোর্ড থেকে সংঘর্ষের সূচনা
২০২৩ সালের জুলাইয়ে সওজের বসানো সাইনবোর্ডে শুধু ‘আকবরনগর বাজার’ লেখা দেখে আপত্তি জানান মিরারচরের বাসিন্দারা। একই বছরের ৯ জুলাই তাঁরা সাইনবোর্ডটি ভেঙে ফেললে শুরু হয় দফায় দফায় সংঘর্ষ, যাতে শতাধিক মানুষ আহত হন, এমনকি আহত হন পুলিশ সদস্যও, ভাঙচুর হয় অনেক দোকান। সেই সময় সংঘর্ষ থামলেও বিরোধ মেটেনি— বরং মানুষের মনে তৈরি হয় স্থায়ী দূরত্ব।
চলতি বছরের ১৯ জুলাই বাজার এলাকায় রিকশার ধাক্কাকে কেন্দ্র করে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দেয়। মিরারচরের দ্বীন ইসলামের অভিযোগ, আকবরনগরের রিকশাচালক শরিফ মিয়া তাঁকে ধাক্কা দেন। তবে শরিফের বক্তব্য, তিনি শুধু রাস্তা থেকে সরাতে চেয়েছিলেন, কিন্তু গ্রাম-পরিচয়ের কারণেই তাঁকে মারধরের শিকার হতে হয়। এই ঘটনার জেরে দ্রুত উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে, মিরারচরবাসী আবার সাইনবোর্ড পরিবর্তনের দাবি তোলেন, আর কয়েক দিনের মধ্যেই পরিস্থিতি গড়ায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে।
দুই পক্ষের অনড় অবস্থান
আকবরনগরবাসীর দাবি, বাজারের তিন দিকই তাঁদের গ্রামের সীমানার মধ্যে, বাসস্ট্যান্ডটি সরকারি নথিতেও আকবরনগর বাসস্ট্যান্ড নামে নথিভুক্ত এবং জমির বড় অংশও তাঁদের মালিকানাধীন— তাই সাইনবোর্ডে অন্য গ্রামের নাম যুক্ত করার প্রশ্নই ওঠে না। স্থানীয় বাসিন্দা আহসান উল্লাহর ভাষায়, এটি তাঁদের বাড়ি ও ভিটার প্রশ্ন, তাই নিজেদের পরিচয় অন্যকে ভাগ করে দেওয়ার কোনো যুক্তি নেই।
অন্যদিকে মিরারচরবাসীর যুক্তি, বাজারটি দুই গ্রামের যৌথ উদ্যোগে গড়ে উঠেছে এবং তিন দশকের বেশি সময় যৌথভাবেই পরিচালিত হয়ে এসেছে, তাই হঠাৎ একটি গ্রামের নাম বাদ দেওয়া ইতিহাসবিরোধী। বাজার কমিটির সাধারণ সম্পাদক বরজু মিয়া বলেন, দুই গ্রাম মিলে গড়া ও পরিচালিত বাজারের সাইনবোর্ডে কেন কেবল একটি গ্রামের নাম থাকবে, তা তাঁদের বোধগম্য নয়। মিরারচরের একাধিক বাসিন্দার দাবি, হয় আগের মতো যৌথ নাম ফিরিয়ে আনতে হবে, নয়তো দুই গ্রামের নামই সমানভাবে সাইনবোর্ডে যুক্ত করতে হবে।
প্রশাসন ও সওজের বক্তব্য
ভৈরব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কে এম মামুনুর রশিদ জানান, বিরোধ মেটাতে শুরু থেকেই প্রশাসনের নানা উদ্যোগ ছিল এবং সবশেষ সংঘর্ষের আগের দিনও দুই পক্ষকে নিয়ে বৈঠক করে সংঘর্ষ এড়ানোর অঙ্গীকার নেওয়া হয়েছিল, যদিও তা রক্ষা হয়নি। এখন উচ্চপর্যায়ে সমাধানের উপায় নিয়ে আলোচনা চলছে বলে তিনি জানান।
সওজ কর্মকর্তারা বলছেন, সাইনবোর্ডটি মূলত সড়ক নিরাপত্তা বার্তা দেওয়ার উদ্দেশ্যে বসানো হয়েছিল এবং স্থানটি যেহেতু আকবরনগর মৌজার অন্তর্গত ও বাসস্ট্যান্ডটিও এ নামেই পরিচিত, সে কারণেই সাইনবোর্ডে ওই নাম ব্যবহার করা হয়। তবে সওজ কিশোরগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী শাকিল মোহাম্মদ ফয়সাল বলেন, সরকারি গেজেটে নির্দিষ্ট নাম না থাকলে প্রচলিত নাম ব্যবহারের রীতি থাকলেও, একটি সাইনবোর্ড যদি জনশান্তি বিনষ্ট করে ও প্রাণহানির কারণ হয়ে ওঠে, তাহলে জনস্বার্থে তা সংশোধন বা সরিয়ে ফেলার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে।