সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য প্রতীক্ষিত নবম বেতন কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরপরই বিষয়টি মন্ত্রিসভায় উত্থাপন করা হবে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। মন্ত্রিসভার অনুমোদন মিললে সংশ্লিষ্ট প্রজ্ঞাপন জারির প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে বুধবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের জানান তিনি।
নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের সুপারিশ প্রণয়নে গত ২১ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠিত হয়েছিল। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, কমিটি ইতিমধ্যে তাদের সুপারিশ প্রায় চূড়ান্ত করে ফেলেছে। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, অর্থসচিব, জনপ্রশাসনসচিব, আইনসচিব, প্রতিরক্ষাসচিবসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তারা এই কমিটির সদস্য।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) একটি প্রতিনিধিদল ঢাকা সফরে এসে অর্থমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করে। ১২ থেকে ১৬ জুলাই অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে সংস্থাটি রাজস্ব আহরণে সরকারকে আরও জোর দেওয়ার পরামর্শ দেয় এবং নতুন বেতনকাঠামোর অর্থায়নের উৎস সম্পর্কে জানতে চায়। এ প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, আইএমএফের ঋণের সঙ্গে বেতনকাঠামোর কোনো সম্পর্ক নেই এবং প্রজ্ঞাপন জারি হতে খুব বেশি সময় লাগবে না। বিষয়টি নিয়ে বারবার আলোচনায় অনীহা প্রকাশ করে তিনি বলেন, গণমাধ্যম যেভাবে খুশি প্রচার করতে পারে, তবে তিনি একবারেই এ নিয়ে কথা বলবেন।
অর্থ বিভাগের একটি সূত্র জানিয়েছে, বেতনকাঠামো বাস্তবায়ন নিয়ে আইএমএফের সরাসরি কোনো বক্তব্য নেই, এমন এখতিয়ারও সংস্থাটির নেই। তারা কেবল অর্থের সংস্থান এবং রাজস্ব আহরণে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।
উল্লেখ্য, অষ্টম বেতন কমিশনের প্রায় এক যুগ পর ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই অন্তর্বর্তী সরকার ২৩ সদস্যের নবম জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করে, যার নেতৃত্বে ছিলেন সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খান। এ বছরের ২১ জানুয়ারি তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয় কমিশন। প্রতিবেদনে বিদ্যমান ২০টি গ্রেড অপরিবর্তিত রেখে বেতন-ভাতা ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়। সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়।
কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী ও ৯ লাখ পেনশনভোগীর পেছনে বছরে ব্যয় হয় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। নতুন কাঠামো চালু হলে অতিরিক্ত আরও ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে নাসিমুল গনি কমিটি প্রথমে তিন অর্থবছর এবং পরে দুই অর্থবছরের একটি খসড়া পরিকল্পনা তৈরি করে। শেষ পর্যন্ত কমিটি চলতি অর্থবছরে মূল বেতন এবং পরের অর্থবছরে ভাতা প্রদানের সিদ্ধান্তে একমত হয়।
গত ১১ জুন জাতীয় সংসদে বাজেট পেশের সময় অর্থমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, ১ জুলাই থেকে ধাপে ধাপে নতুন বেতনকাঠামো কার্যকর হবে। তিনি উল্লেখ করেন, প্রায় ১১ বছর ধরে একই কাঠামোতে বেতন পাচ্ছেন সরকারি কর্মচারীরা, এই দীর্ঘ সময়ে মূল্যস্ফীতির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয়ও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় খুব একটা বেশি নয়। তবে বাজেটের জনপ্রশাসন-নিট খাতে মোট বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বরাদ্দের চেয়ে ৫৪ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা বেশি। অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এই বাড়তি অর্থের অন্তত ৪৪ হাজার কোটি টাকা সরকারি কর্মচারী, এমপিওভুক্ত শিক্ষক ও পেনশনভোগীদের জন্য নির্ধারিত রাখা হয়েছে।