স্বল্প সময়ের মধ্যে চট্টগ্রামের অপরাধজগতে আলোচিত নাম হয়ে ওঠেন মোবারক হোসেন, যিনি পরিচিত ডেভিড ইমন নামে। ব্যবসায়ী, প্রবাসী ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মালিকদের কাছে বিদেশি নম্বর থেকে ফোন করে কোটি কোটি টাকা চাঁদা দাবি, একের পর এক হত্যাকাণ্ড, অস্ত্রবাজি ও সন্ত্রাসী তৎপরতার অভিযোগে বারবার উঠে এসেছে তাঁর নাম। গত মঙ্গলবার রাতে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টাকালে যশোর সীমান্ত এলাকা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক নাজিমুল হক জানান, চার দিন আগে যশোর সীমান্ত দিয়ে দেশে প্রবেশ করেছিলেন ইমন। পুলিশি অভিযানের খবর পেয়ে তিনি ফের ভারতে পালানোর চেষ্টা করছিলেন, তখনই তাঁকে ধরা হয়। নাজিমুল হক আরও জানান, ইমনের কাছে দুটি দেশি-বিদেশি পাসপোর্ট থাকার তথ্য পুলিশের কাছে রয়েছে এবং তিনি প্রায়ই দুই দেশের মধ্যে যাতায়াত করতেন।
মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে ইমনের বিরুদ্ধে দায়ের হয়েছে ১৫টি মামলা। পুলিশের ভাষ্যমতে, বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলীর হয়ে বর্তমানে চট্টগ্রামে অপরাধ কর্মকাণ্ড পরিচালনায় নেতৃত্বদানকারী দুজনের একজন তিনি, অন্যজন মোহাম্মদ রায়হান। পুলিশের দাবি অনুযায়ী, সাজ্জাদের বাহিনীতে অন্তত ৫০ জন শুটার ও সহযোগী সক্রিয় রয়েছেন।
চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর এলাকার বাসিন্দা ইমন চার ভাইবোনের মধ্যে সবার বড়। তাঁর বাবা মো. মুসা ওমানপ্রবাসী ছিলেন, কয়েক বছর আগে মারা যান। স্থানীয়দের ভাষ্যে, স্কুলজীবন থেকেই ক্রিকেটে আগ্রহী ছিলেন ইমন। সাইকেলে করে ফটিকছড়ি কলেজ মাঠে অনুশীলনে যেতেন, পরে নগরের অক্সিজেন এলাকায় খালার বাসায় থেকে নিয়মিত ক্রিকেট প্রশিক্ষণ শুরু করেন এবং চট্টগ্রাম ব্রাদার্স একাডেমিতে খেলতেন। চট্টগ্রাম ব্রাদার্স একাডেমির সাবেক কোচ আমিনুল হক জানান, বাঁহাতি লেগ স্পিনার হিসেবে ভালো পরিচিতি ছিল ইমনের এবং জাতীয় দলের খেলোয়াড়েরা চট্টগ্রামে এলে তাঁর সঙ্গে নেট অনুশীলন করতেন। তবে ২০২০ সালের পর হঠাৎই খেলার জগৎ থেকে হারিয়ে যান তিনি। কাঞ্চননগর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ও ইমনের প্রতিবেশী হান্নান চৌধুরী জানান, ভালো ক্রিকেটার হয়ে এলাকার সুনাম বাড়ানোর সম্ভাবনা থাকলেও এখন এলাকাটি সন্ত্রাসপ্রবণ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে, যা দুঃখজনক।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, নগরের রহমানিয়া উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাসের পর কলেজে ভর্তি হলেও এইচএসসি পরীক্ষা দেননি ইমন। ২০২০ সালে করোনা মহামারির পর পুরোপুরি ছাত্রলীগের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন এবং চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবু তৈয়বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে তাঁর। ২০২২ সালে ওমানে পাড়ি জমান, বছরখানেক পর দেশে ফেরেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আত্মগোপনে চলে যান এবং নগরের বায়েজীদ বোস্তামীর আতুরার ডিপো এলাকায় অবস্থান নেন। সেখানেই সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদের সঙ্গে তাঁর সখ্য তৈরি হয়। পুলিশের তথ্যমতে, ৫ আগস্টের পর অক্সিজেন এলাকায় ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘর্ষে সক্রিয় ভূমিকা রাখার মধ্য দিয়েই বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদের নজরে আসেন তিনি।
পুলিশি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩০ মার্চ বাকলিয়ায় জোড়া খুন, একই বছরের ২৩ মে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত এলাকায় সন্ত্রাসী ঢাকাইয়া আকবর হত্যা, হাটহাজারীতে জোড়া খুন এবং চান্দগাঁওয়ে আফতাব হত্যা মামলাসহ বিভিন্ন ঘটনায় ইমনের বিরুদ্ধে দায়ের হয়েছে ১৫টি মামলা। ৫ আগস্টের পর থানা থেকে লুট হওয়া ১৫ থেকে ২০টি অস্ত্র হাতে তাঁর একটি ছবিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল। পুলিশ জানায়, অস্ত্র চালনায় তিনি যথেষ্ট দক্ষ এবং বাকলিয়ার জোড়া খুনের ঘটনায় মোটরসাইকেল ভাড়া ও সন্ত্রাসীদের সমন্বয়ের দায়িত্বও পালন করেছিলেন তিনি। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে বায়েজীদ থানার একটি দস্যুতা মামলায় কক্সবাজার থেকে গ্রেপ্তার হলেও মাত্র ২২ দিনের মাথায় জামিনে মুক্তি পান তিনি, এরপর তাঁর অপরাধ কর্মকাণ্ড আরও বিস্তৃত হয় বলে জানায় পুলিশ।
পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, ব্যবসায়ী, প্রবাসী ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে নিয়মিত চাঁদা দাবিতে ফোন করতেন ইমন নিজেই। চলতি বছরের জানুয়ারিতে নগরের বায়েজীদ বোস্তামী থানা শ্রমিক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আজিজ উদ্দিনকে ফোনে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। এ ছাড়া ভয়ংকর ভাষায় হুমকি দিয়ে বিদেশি নম্বর থেকে ফোন করে চাঁদা দাবির একাধিক অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। গত ১৩ জুলাই নগরের বাকলিয়া অ্যাকসেস রোড এলাকার একটি ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে হামলার অভিযোগ রয়েছে তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে, যার দুই দিন আগে প্রতিষ্ঠানের মালিকের কাছে বিদেশি নম্বর থেকে ফোন করে দুই কোটি টাকা চাঁদা দাবি করা হয়েছিল।
গ্রেপ্তারের আগে গত শনিবার মুঠোফোনে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছিলেন ইমন। সন্ত্রাসের পথ বেছে নেওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি জানান, ছোটবেলা থেকে বড় ক্রিকেটার অথবা বড়লোক হওয়ার স্বপ্ন ছিল তাঁর, আর বড়লোক হওয়ার লক্ষ্যেই এই পথ বেছে নিয়েছেন তিনি। চট্টগ্রাম জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (হাটহাজারী সার্কেল) কাজী মো. তারেক আজিজ বলেন, ফোনে কথা বলার সময় ইমনের ভয়ংকর উপস্থাপনায় সাধারণ মানুষ সহজেই আতঙ্কিত হয়ে পড়ে এবং অস্ত্র চালনাতেও তিনি যথেষ্ট দক্ষ।