ছবিঃ সংগৃহীত

গ্যাসের উপর ভাসছে ভোলা, তবু উন্নয়নের আলো পৌঁছায়নি ঘরে ঘরে

Share

ভোলা শহর থেকে মাত্র ১০ কিলোমিটার দূরে দক্ষিণ চরপাতা গ্রামে বছর তিনেক আগে নতুন একটি গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করে বাপেক্স। ইলিশা নামের এই গ্যাসক্ষেত্র উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত হলেও এখন পর্যন্ত উৎপাদন শুরু হয়নি। কারণটা বিস্ময়কর — ভোলায় বর্তমানে চাহিদার চেয়ে বেশি গ্যাস উত্তোলন হচ্ছে, অথচ সেই গ্যাসের পুরো সুবিধা পাচ্ছেন না জেলার বাসিন্দারা।

বাপেক্সের হিসাব অনুযায়ী, ভোলায় এখন ১ দশমিক ৭৫ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের মজুত রয়েছে, যা আরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ১৯৯৫ সালে শাহবাজপুর গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে ভোলার গ্যাস অধ্যায়ের সূচনা হয়। ২০০৯ সালে সেখান থেকে উৎপাদন শুরু হয়। এরপর ২০১৮ সালে ভোলা নর্থ এবং ২০২৩ সালে ইলিশা গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হলেও এ দুটি থেকে এখনো উৎপাদন শুরু হয়নি।

সুন্দরবন গ্যাস বিতরণ কোম্পানির তথ্য মতে, ভোলার গ্যাসক্ষেত্রগুলোর দৈনিক উৎপাদনক্ষমতা ১২২ মিলিয়ন ঘনফুট হলেও বর্তমান চাহিদা মাত্র ৭০ থেকে ৭৫ মিলিয়ন ঘনফুটের মধ্যে। অর্থাৎ উল্লেখযোগ্য পরিমাণ গ্যাস উদ্বৃত্ত থাকছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই গ্যাস দিয়ে পুরোদমে শিল্পায়ন হলে কমপক্ষে ৭০ বছরের চাহিদা মেটানো সম্ভব।

বিভিন্ন সরকার এই গ্যাস নিয়ে চারটি পরিকল্পনা করেছিল — পাইপলাইনে জাতীয় গ্রিডে নেওয়া, সিএনজি বা এলএনজিতে রূপান্তর করে বাইরে পাঠানো এবং ভোলাতেই ইপিজেড, শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন। কিন্তু কোনো সরকারই এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি।

তবে ধীরে ধীরে কিছু শিল্পকারখানা গড়ে উঠছে। ভোলা সদরের ভেদুরিয়া, ভেলুমিয়া, চরসামাইয়া ও শিবপুর এলাকায় গড়ে উঠছে গ্যাসভিত্তিক শিল্পের ছোট ছোট কেন্দ্র। শেলটেক সিরামিক কোম্পানি, সাগরিকা ফিড, অটো অ্যাডভান্স টেকসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে উৎপাদনে গেছে। প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ ৫৮ একর জমিতে নতুন শিল্পপার্ক নির্মাণে এরই মধ্যে প্রায় ৬০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। পুরোদমে চালু হলে সেখানে ২৫ হাজার কর্মসংস্থান তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।

তবে শিল্পায়নের পথে বাধাও কম নয়। ভোলা-বরিশাল সেতুর অভাবে পণ্য পরিবহনে বাড়তি খরচ গুনতে হচ্ছে। গ্যাস অনুমোদন জটিলতায় নতুন বিনিয়োগ আটকে থাকছে। রাজনৈতিক প্রভাব এবং নির্মাণসামগ্রীর বাজারে প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপও বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করছেন উদ্যোক্তারা।

শিল্পায়নের প্রভাবে ভোলায় জমির দাম গত ৩০ বছরে কোনো কোনো এলাকায় ৩০০ গুণ পর্যন্ত বেড়েছে। অথচ এত সম্পদের পাশে বসে থেকেও জেলাটি উন্নয়নের সূচকে পিছিয়ে। জাতীয় বহুমাত্রিক দারিদ্র্য সূচকে ভোলায় ৪০ শতাংশের বেশি মানুষ দারিদ্র্যের শিকার। সাক্ষরতার হার ৬৭ দশমিক ২১ শতাংশ, যা জাতীয় গড়ের চেয়ে অনেক কম।

গ্যাস রক্ষায় দক্ষিণাঞ্চলীয় নাগরিক আন্দোলনের আহ্বায়ক মোবাশ্বির উল্লাহ চৌধুরী বলেন, ভোলা গ্যাসের উপর ভাসছে অথচ উপকূলের গাছ কেটে রান্নার চুলার জ্বালানি জোগাতে হচ্ছে। জ্বালানিবিশেষজ্ঞ বদরূল ইমামও মনে করেন, শিল্পকারখানা বা বিদ্যুৎকেন্দ্র যা-ই হোক, ভোলাতেই করা যেতে পারে।

ঘরে ঘরে গ্যাস সংযোগ, ইপিজেড ও সার কারখানা স্থাপন, মেডিক্যাল কলেজ, ভোলা-বরিশাল সেতু এবং নদীভাঙন রোধ — এই পাঁচ দফা দাবিতে বছরের পর বছর আন্দোলন করে যাচ্ছেন ভোলার মানুষ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্প্রতি ডিসি সম্মেলনে ভোলার গ্যাস ভোলাতেই ব্যবহার করে শিল্পকারখানা ও সার কারখানা গড়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। এখন দেখার বিষয়, সেই প্রতিশ্রুতি কতটুকু বাস্তবে রূপ নেয়।