খুলনার অপরাধজগৎ নিয়ে অনুসন্ধানে বারবার একটি নামই উঠে আসছে — তৈমুর ইসলাম। পদে তিনি খুলনা মহানগর পুলিশের (কেএমপি) গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) পরিদর্শক। কিন্তু ভুক্তভোগী, স্থানীয় সূত্র ও পুলিশের অভ্যন্তরীণ নথিতে তাঁর পরিচয় শুধু একজন পুলিশ সদস্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মামলায় ফাঁসানোর ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়, গ্রেপ্তার-বাণিজ্য, বিশ্ববিদ্যালয় দখলে সহায়তা এবং অপরাধী চক্রের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগে তিনি খুলনায় এক ক্ষমতাকেন্দ্রে পরিণত হয়েছেন।
বেনজীর-ঘনিষ্ঠ থেকে নতুন পরিচয়
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের ৩ নভেম্বর তৈমুর কেএমপিতে যোগ দেন। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় পুলিশের আলোচিত আইজিপি বেনজীর আহমেদের ‘ঘনিষ্ঠজন’ হিসেবে বাহিনীতে পরিচিত ছিলেন তিনি। স্থানীয়দের অভিযোগ, গোপালগঞ্জে বেনজীরের সাভানা ইকোরিসোর্টের জন্য জমি কেনার তত্ত্বাবধানে ছিলেন তৈমুর এবং ভয়ভীতি দেখিয়ে জমি বিক্রিতে বাধ্য করা হয়েছিল। আওয়ামী লীগের পতনের পর পরিচয় বদলে এখন তাঁকে বলা হচ্ছে খুলনা কমার্স কলেজের ‘ছাত্রদলকর্মী’, এবং স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতার সঙ্গে তাঁর নতুন সখ্যের কথাও আলোচনায় রয়েছে।

পুলিশের নিজস্ব প্রতিবেদনেই গুরুতর অভিযোগ
পুলিশের ইন্টারনাল ওভারসাইট (পিআইও) প্রতিবেদনে তৈমুরের বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ উঠে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে আটক করে টাকা দাবি, ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে উৎকোচ গ্রহণ, চিহ্নিত অপরাধীকে না ধরার বিনিময়ে অর্থ নেওয়া এবং মাদক ও জুয়ার আসর থেকে মাসিক চাঁদা আদায়।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, মাছবাজারের ব্যবসায়ী গোপাল বিশ্বাসকে দুটি হত্যা মামলায় ফাঁসানোর ভয় দেখিয়ে ৩০ লাখ টাকা দাবি করা হয়। দরকষাকষির পর ২২ লাখ টাকায় ছেড়ে দেওয়া হয়। লন্ডনপ্রবাসী তৌহিদুল ইসলামের বাড়িতে রাতে অভিযান চালিয়ে তাঁর স্ত্রীর মাথায় পিস্তল ঠেকানো হয়; পরে ৪৫ হাজার টাকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। আরেক মামলার আসামি নুর আজিমকে ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে ৩০ লাখ টাকা আদায় করা হয় বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় দখলে মামলাকারীকে তুলে নেওয়া
খুলনার প্রথম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নর্থ ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটি দখল নিয়েও তৈমুরের নাম জড়িয়েছে। আদালতে মামলা করা প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি পবিত্র কুমার সরকারকে শুনানির ঠিক আগে ৪ এপ্রিল রাতে বাড়ি থেকে তুলে ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয়। পবিত্র সরকারের অভিযোগ, সেখানে তৈমুর তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন, শারীরিকভাবে আঘাত করেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়-সংক্রান্ত মামলা প্রত্যাহারের চাপ দেওয়া হয়। ৩২ দিন কারাভোগের পর জামিনে মুক্ত হওয়া পবিত্র সরকার এখনো ভয়ে নিজ বাড়িতে থাকছেন না।
বদলির আদেশ দফায় দফায়, কার্যকর হয়নি একটিও
তৈমুরের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ পেয়ে কেএমপির অনুসন্ধান শেষে তাঁকে বদলির সুপারিশ করা হয়। গত বছরের ১৬ অক্টোবর ট্যুরিস্ট পুলিশে বদলির প্রজ্ঞাপন জারি হয়। কিন্তু তৈমুর আবেদন করলে ১৮ নভেম্বর তা নামঞ্জুর হয়। এর চার দিন পর ২৩ নভেম্বর ট্যুরিস্ট পুলিশের আদেশ বাতিল করে খুলনা রেঞ্জে বদলির নতুন আদেশ হয়। সেই আদেশও এ বছরের ১৫ মার্চ বাতিল করা হয়। পুলিশ সদর দপ্তরের সূত্র জানায়, বদলির আদেশের পর ‘বড় বড় জায়গা’ থেকে তদবির আসায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি।
চাকরিতে যোগদানের পর অন্তত আটবার বিভাগীয় শাস্তির মুখে পড়েছেন তৈমুর। অবৈধ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ২০২০ সালে পাঁচ বছরের জন্য নিম্ন বেতন গ্রেডে অবনমিত করা হয়েছিল তাঁকে। ২০২১ সালে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুদকের মামলাও হয়েছে; তদন্ত এখনো চলছে।
তৈমুর ইসলাম তাঁর বিরুদ্ধে আসা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, পিআইওর প্রতিবেদনের সব অভিযোগ মিথ্যা এবং দুদকের মামলাগুলো উদ্দেশ্যমূলক।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এত অভিযোগ, অভ্যন্তরীণ অনুসন্ধান ও বদলির আদেশের পরও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হলে সেটি শুধু ব্যক্তির দায়ের প্রশ্ন থাকে না — কর্তৃপক্ষের দায়ও তৈরি হয়। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সুরক্ষার বলয় না ভাঙলে সংগঠিত অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সূত্রঃ প্রথম আলো