গ্রাম পুলিশ, ছবি: সংগৃহীত

রাষ্ট্রের প্রহরী, রাষ্ট্রেই অবহেলিত; গ্রাম পুলিশের জীবন সংগ্রাম 

Share

দিন কিংবা গভীর রাত- যেকোনো সময়েই ডাক পড়লে ছুটে যেতে হয়। ঝড়-বৃষ্টি, তীব্র শীত কিংবা যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ উপেক্ষা করে লাঠি হাতে পাহারা দিতে হয় গ্রামের পর গ্রাম। মাদক সেবন, জুয়া, ইভটিজিং ও যেকোনো অন্যায়-অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড দমন করতে তাঁদের নিয়মিত পুলিশ বাহিনীর সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে হয়। কিন্তু মাঠপর্যায়ের এতসব ঝুঁকিপূর্ণ ও হাড়ভাঙা খাটুনির পরও দেশের ৪৫ হাজার ৮৭০ জন গ্রাম পুলিশ সদস্যের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি। আধুনিক এই সময়ে এসেও তাঁরা এক প্রকার মানবেতর জীবন যাপন করছেন, যা দেশের তৃণমূল নিরাপত্তা ব্যবস্থার এক বড় বৈপরীত্য।

ভুক্তভোগী গ্রাম পুলিশ সদস্যরা বলছেন, দেশের আর সব খাতের কর্মচারীদের সুযোগ-সুবিধা ও বেতন-ভাতা বাড়লেও তাঁদের পাওনা ও নির্বাচনী ভাতা উল্টো কমছে। বছরের পর বছর ধরে তাঁরা এক প্রকার প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলার শিকার।

কাজের ঠিক নেই, জীবনের ঝুঁকি শতভাগ:

গ্রাম পুলিশ সদস্যদের কাজের কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা বা কর্মঘণ্টা নেই। সাধারণ মানুষ যখন রাতে শান্তিতে ঘুমান, প্রশাসনিক কাজে তখন তাঁদের কাটাতে হয় বিনিদ্র রজনী। সবচেয়ে বড় সংকটে তাঁরা পড়েন আদালতের গ্রেফতারি পরোয়ানা (ওয়ারেন্ট) তামিল করাতে গিয়ে। পলাতক আসামিরা বাড়ি ফিরলে থানা পুলিশকে খবর দেওয়া বা তাঁদের ধরিয়ে দেওয়ার মূল কাজটি করেন এই গ্রাম পুলিশরাই। আর এই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পরবর্তীতে তাঁরা মারাত্মক সামাজিক শত্রুতা ও শারীরিক আক্রমণের শিকার হন। অথচ এই বিশাল ও ২৪ ঘণ্টার ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্বের বিপরীতে তাঁদের প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ-সুবিধা একেবারেই নগণ্য।

ভাতার নামে নিষ্ঠুর পরিহাস:

মাঠপর্যায়ের গ্রাম পুলিশ সদস্যরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, অন্যান্য সরকারি কর্মচারীরা যে বাজারে কেনাকাটা করেন, তাঁদেরও একই বাজারে যেতে হয়। কিন্তু সবার বেতন বাড়লেও গ্রাম পুলিশের ভাতা জীবনযাত্রার ব্যয়ের তুলনায় অত্যন্ত অসংগতিপূর্ণ। উপরন্তু, আগের তুলনায় নির্বাচনী দায়িত্বের ভাতাও কমিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে তাঁদের অভিযোগ।
বর্তমানে তাঁরা মাসে যে সামান্য ভাতা বা বেতন পান (যা এলাকাভেদে সাড়ে সাত হাজার বা তার কিছু কম-বেশি), তা দিয়ে বর্তমানের আকাশছোঁয়া নিত্যপণ্যের বাজারে একটি পুরো সংসার চালানো একেবারেই অসম্ভব। মাস শেষে যে টাকা তাঁদের পকেটে আসে, তা দিয়ে তিন বেলা ঠিকমতো ভাত জোগানোই কঠিন, সেখানে উন্নত চিকিৎসা কিংবা সন্তানদের পড়াশোনার খরচ চালানো যেন এক আকাশকুসুম কল্পনা। সবচেয়ে বড় নির্মমতা প্রকাশ পায় তখন, যখন কোনো সদস্য দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আহত হন; চিকিৎসার পুরো ব্যয়ভার বহন করতে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ে তাঁদের দরিদ্র পরিবারগুলো।

গ্যাজেট আছে, বাস্তবায়ন নেই:

আন্দোলনকারীরা জানান, ২০১১ সালে গ্রাম পুলিশদের জাতীয় বেতন স্কেলের চতুর্থ শ্রেণীর সমমানের সময় স্কেল দেওয়ার একটি সরকারি গ্যাজেট প্রকাশ করা হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘ দেড় দশক পার হতে চললেও সেই গ্যাজেট অনুযায়ী পূর্ণাঙ্গ সুবিধা তাঁরা পাচ্ছেন না। সেই ২০১১ সালের গ্যাজেটটি পুরোপুরি পুনর্বহাল ও বাস্তবায়নের দাবিতেই মূলত তাঁরা মাঠপর্যায়ে ও রাজপথে লড়াই করে যাচ্ছেন।

অন্যান্য সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের মতো তাঁদের চাকরি এখনো জাতীয়করণ করা হয়নি। নেই কোনো পেনশন বা এককালীন উপযুক্ত অবসরকালীন ভাতার ব্যবস্থা। ফলে জীবনভর সমাজ ও রাষ্ট্রকে সেবা দিয়েও শেষ বয়সে এসে তাঁদের চরম দারিদ্র্য কিংবা ভিক্ষাবৃত্তির মুখে পড়তে হয়।

মানবাধিকার কর্মী ও সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, দেশের তৃণমূল পর্যায়ের আইনশৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে শক্তিশালী রাখতে হলে গ্রাম পুলিশকে এভাবে অবহেলা করে রাখা আর সম্ভব নয়। এটি শুধু তাঁদের প্রতি অন্যায় নয়, বরং পুরো রাষ্ট্রের জন্য একটি বড় সামাজিক বৈষম্য।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্রাম পুলিশকে কেবল ‘সহায়ক কর্মী’ হিসেবে দেখার মানসিকতা থেকে রাষ্ট্রকে বেরিয়ে আসতে হবে। প্রায় ৪৬ হাজার সদস্যের এই বিশাল বাহিনীকে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়ে চাকরি জাতীয়করণ করা এখন সময়ের দাবি। একই সাথে ২০১১ সালের গ্যাজেট অনুযায়ী তাঁদের চতুর্থ শ্রেণীর ন্যায় বেতন কাঠামো নিশ্চিত করা, নিয়মিত আধুনিক ও আইনি প্রশিক্ষণ এবং চিকিৎসা ও পেনশনের মতো মৌলিক অধিকারগুলো দেওয়া জরুরি। তবেই একদিকে যেমন তাঁদের জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে, অন্যদিকে গ্রামীণ আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাও আরও বেশি কার্যকর ও দায়বদ্ধ হয়ে উঠবে।