ছবিঃ কালবেলা

র‌্যাবের রূপান্তর

Share

র‌্যাবকে বিলুপ্ত করে নতুন নামে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন বা এসআরবি গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বিষয়টি দেশের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। দীর্ঘ দুই দশক ধরে র‌্যাব বাংলাদেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থার একটি আলোচিত বাহিনী। একই সঙ্গে এটি ছিল সবচেয়ে বেশি সমালোচিত বাহিনীগুলোর একটি। তাই নতুন এ উদ্যোগ স্বাভাবিকভাবেই জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

র‌্যাব প্রতিষ্ঠার সময় এর উদ্দেশ্য ছিল সন্ত্রাস, অস্ত্র ও মাদক দমন। শুরুতে বাহিনীটি কিছু উল্লেখযোগ্য সাফল্যও দেখিয়েছিল। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে তারা আলোচনায় আসে। সাধারণ মানুষের মধ্যেও এক ধরনের আস্থা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু একপর্যায়ে সে আস্থায় চিড় ধরে। ক্রসফায়ার, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ বারবার উঠে আসে। দেশীয় মানবাধিকার সংগঠনগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করে। আন্তর্জাতিক মহলেও সমালোচনা বাড়তে থাকে। জাতিসংঘ, মানবাধিকার সংগঠন এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান র‌্যাবের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তোলে। এমনকি কয়েকজন কর্মকর্তার ওপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করা হয়। এ বাস্তবতায় সরকার নতুন একটি বাহিনী গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। এটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হতে পারে। তবে এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে। শুধু নাম পরিবর্তন করলেই কি সমস্যার সমাধান হবে? বাস্তবতা হলো, কোনো বাহিনীর পরিচয় তার নাম দিয়ে নির্ধারিত হয় না। পরিচয় নির্ধারিত হয় তার কাজ, আচরণ এবং জবাবদিহির মাধ্যমে। র‌্যাবের জায়গায় এসআরবি নাম এলেই জনগণের আস্থা ফিরে আসবে না। নতুন পোশাক পরালেও অতীতের বিতর্ক মুছে যাবে না। মানুষের প্রত্যাশা অন্য জায়গায়। মানুষ চায় একটি পেশাদার বাহিনী। মানুষ চায় একটি মানবিক বাহিনী। মানুষ চায় এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যার ক্ষমতার সঙ্গে জবাবদিহিও থাকবে।

খসড়া আইনে জবাবদিহির বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে বিশেষ ক্ষমতা থাকে। তাদের তল্লাশি, গ্রেপ্তার এবং অভিযান পরিচালনার ক্ষমতা দেওয়া হয়। এ ক্ষমতা যদি কার্যকর নজরদারির আওতায় না থাকে, তাহলে অপব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি হয়। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কোনো প্রতিষ্ঠান আইনের ঊর্ধ্বে নয়। নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি নাগরিকের অধিকার রক্ষা করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একটি বাহিনী অপরাধ দমন করবে। কিন্তু সেই কাজ করতে গিয়ে আইন লঙ্ঘন করলে রাষ্ট্রেরই ক্ষতি হবে। এতে জনগণের আস্থা নষ্ট হবে। আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতাও প্রশ্নবিদ্ধ হবে।

এসআরবিকে সফল করতে হলে কয়েকটি বিষয় নিশ্চিত করতে হবে। বাহিনীর প্রতিটি কর্মকাণ্ডের স্বচ্ছতা থাকতে হবে। অভিযোগ তদন্তের স্বাধীন ব্যবস্থা থাকতে হবে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এলে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে। অপরাধী যে-ই হোক, তাকে বিচারের আওতায় আনতে হবে। সংসদীয় ও প্রশাসনিক তদারকি শক্তিশালী করতে হবে। একই সঙ্গে গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের যৌক্তিক সমালোচনাকে গুরুত্ব দিতে হবে। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষার জন্য বিশেষায়িত বাহিনীর প্রয়োজন রয়েছে। এ বিষয়ে দ্বিমত নেই। তবে সেই বাহিনীকে হতে হবে জনগণের বন্ধু। ভয় নয়, হতে হবে আস্থার প্রতীক।

সরকার যদি সত্যিই একটি আধুনিক, পেশাদার এবং গণমুখী বাহিনী গঠন করতে চায়, তাহলে নাম পরিবর্তনের পাশাপাশি বেশি গুরুত্ব দিতে হবে জবাবদিহিকে। কারণ জবাবদিহি ছাড়া কোনো সংস্কার টেকসই হয় না। স্বচ্ছতা ছাড়া আস্থা তৈরি হয় না। আর জনগণের আস্থা ছাড়া কোনো বিশেষ বাহিনী তার মূল লক্ষ্য অর্জন করতে পারে না।

-কালবেলা