এশিয়া-আফ্রিকায় বিশ্বকাপ ট্রফি নেই কেন!

এশিয়া-আফ্রিকায় বিশ্বকাপ ট্রফি নেই কেন!

Share

বিশ্বকাপ ফুটবল ৯২ বছর ধরে দুই রেসের ঘোড়া—ইউরোপ (১২) ও লাতিন আমেরিকার (১০) বাইরে শিরোপা যায়নি। দীর্ঘ যাত্রায় ২০০২ সালে দক্ষিণ কোরিয়া ও ২০২২ সালের সেমিফাইনাল খেলা মরক্কোর মতো কিছু চমক দেখা গেছে। সেই চমক অদৃশ্য হতেও সময় লাগেনি। বর্তমান মরক্কো কি সেই চমকের পরবর্তী সংস্করণ হয়ে থাকবে, নাকি ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার আধিপত্য ভাঙার নিঃশব্দ পদক্ষেপ? উত্তর খুঁজতে গেলে প্রবেশ করতে হবে গভীরে।

২০০২ সালের দক্ষিণ কোরিয়া এখনো একমাত্র এশিয়ান হিসেবে সেমিফাইনাল খেলা দেশ। সেটা ছিল সাময়িক চমক। এখন এশিয়ার সবচেয়ে ধারাবাহিক দল কিন্তু জাপান। ১৯৯০ সালে ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনাকে হারানো ক্যামেরুন, ২০০২ সালে ফ্রান্সকে হারানো সেনেগালের মতো চমক ছিল দক্ষিণ কোরিয়া। ফিফা বিশ্বকাপে আফ্রিকার সর্বোচ্চ অর্জনের গল্প লেখা মরক্কোর গল্পটা কিন্তু ভিন্ন। কী কারণে, সেটা জানতে হলে রাবাতের অদূরে সালে শহরে গড়ে ওঠা রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদ ফুটবল একাডেমির দিকে তাকাতে হবে। ২০০৯ সালে ষষ্ঠ রাজা মোহাম্মদের ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রায় ১৬.৮ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগে গড়া হয় এ একাডেমি। এটি বর্তমান বিশ্বের অন্যতম আলোচিত ফুটবল পাঠশালা হিসেবে স্বীকৃত। স্থানীয় প্রতিভার অভাব দূর করার ঐতিহাসিক সমস্যার সমাধান খুঁজতে গড়া হয় প্রতিষ্ঠানটি। উন্নত অনুশীলন মাঠ, আবাসিক হোস্টেল, শিক্ষাকক্ষ ও মেডিকেল সুবিধায় সজ্জিত এ কমপ্লেক্স। যাকে তুলনা করা হয় ফ্রান্সের ক্লেয়ারফঁতেনের (জাতীয় ফুটবল একাডেমির) সঙ্গে। কাতার বিশ্বকাপ মাতানো ইউসেফ এন-নেসিরি, নায়েফ আগের্দ ও আজেদিন উনাহির মতো খেলোয়াড় এ একাডেমির পণ্য। প্রতিষ্ঠানটিকে কাতার বিশ্বকাপে মরক্কোর সাফল্যের চালিকাশক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছে ফিফা।

কাঠামোগত এ বিনিয়োগের ফল মহাদেশ ছাপিয়ে বিশ্বমঞ্চে ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। ২০২৪ সালের অলিম্পিক ব্রোঞ্জজয়ী মরক্কো পরে আফ্রিকান নেশন্স কাপ, ফিফা আরব কাপ, আফ্রিকান নেশনস চ্যাম্পিয়নশিপ, অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ, অনূর্ধ্ব-১৭ আফ্রিকান নেশন্স কাপ জয় করেছে। ২০২৪ ফুটসালে আফ্রিকার সেরার স্বীকৃতি পায় দেশটি। ২০২৫ সালে নারীদের আফ্রিকা সেরা আসরের ফাইনালও খেলেছে তারা। এ পরিসংখ্যান প্রমাণ করে, ২০২২ সালের সেমিফাইনাল কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না; বরং দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পের দৃশ্যমান ফসল। ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো বলেছিলেন, বিশ্ব এখানে, মরক্কোতে এসে একত্রিত হবে।

স্পেন, পর্তুগাল ও বেলজিয়ামকে হারিয়ে ২০২২ সালে সেমিফাইনালে ওঠা মরক্কো চলতি বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে ভাগ্যদোষে ব্রাজিলের বিপক্ষে জয় পায়নি! এটিই প্রমাণ করে, দলটি ‘চমকপ্রদ আন্ডারডগ’ মোড়ক থেকে বেরিয়ে প্রতিষ্ঠিত শক্তির পথে হাঁটছে। প্রশ্ন হলো, এ উত্থান কি ২০০২ সালের দক্ষিণ কোরিয়ার মতো বিচ্ছিন্ন বিস্ফোরণ?

উত্তরের জন্য এশিয়ার সাম্প্রতিক বিনিয়োগ-মডেল পরীক্ষা করাটা জরুরি। বর্তমানে এ মহাদেশের ফুটবলে আলোচিত দেশ সৌদি আরব। দেশটির পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড গত তিন বছরে ফুটবলে প্রায় দুই বিলিয়ন ডলার ঢেলেছে। একত্রিত করেছিল রোনালদো, নেইমার ও বেনজেমার মতো তারকা। ২০২৩ সালের গ্রীষ্মে এক মৌসুমেই সৌদি ক্লাবগুলো ৯৫৭ মিলিয়ন ডলার খরচ করে দলবদল বাজারে, যা ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগের বাইরে রেকর্ড। বিপুল বিনিয়োগ জাতীয় দলের পাইপলাইনে কোনো রূপান্তর আনতে পারেনি। ২০২৩ সালের এএফসি এশিয়ান কাপের সেমিফাইনালের আগেই দেশটির দর্শক বনে যাওয়ার পর নতুন প্রমাণ খুঁজতে যাওয়ার কারণ নেই। বিশ্লেষকরা বর্তমান সৌদি আরবকে তুলনা করছেন এক দশক আগের চীনের সঙ্গে। চায়নিজ সুপার লিগ একসময় প্রিমিয়ার লিগের চেয়েও বেশি অর্থ খরচ করেছিল, তা জাতীয় দলের মান বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত সেই প্রকল্প পরিত্যক্ত হয়। মরক্কো ও সৌদি আরবের মডেল একটি স্পষ্ট পার্থক্য তুলে ধরে—তারকা আমদানি আর প্রাতিষ্ঠানিক উৎপাদন এক বিষয় নয়। আমদানি করা গ্যালাকটিকো কখনোই দেশীয় প্রতিভার ভিত্তি গড়তে পারে না।

মরক্কোর পথ এখানে স্পষ্টভাবে ভিন্ন। মরক্কো বিদেশি তারকা কিনছে না। তারা নিজেরাই তা তৈরি করছে। ইউরোপের ক্লাব-প্রতিষ্ঠানে গড়ে ওঠা মরোক্কান বংশোদ্ভূত প্রতিভাদের জাতীয় দলে একত্রিত করছে। হাকিমি, আমরাবাত বা ব্রাহিম দিয়াজের মতো খেলোয়াড়রা ইউরোপীয় ক্লাব-সংস্কৃতিতে গড়ে উঠলেও দেশের প্রতি আনুগত্য দেখিয়েছেন। দেশটির ফুটবল ফেডারেশনের পরিকল্পিত কূটনীতিও ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি গভর্ন্যান্স সংস্কার—২০০৮ সালে রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদ যে আর্থিক জবাবদিহির কাঠামো তৈরির নির্দেশ দিয়েছিলেন, তা ফুটবল ফেডারেশনের স্বচ্ছতাকে পেশাদার রূপ দিয়েছে। একদিকে অবকাঠামো, অন্যদিকে গভর্ন্যান্স—এ দ্বিমুখী বিনিয়োগ মরক্কোকে এক টেকসই মডেলে পরিণত করেছে, যা স্রেফ অর্থ ঢালার চেয়ে অনেক গভীর।

সেনেগাল, ঘানা, নাইজেরিয়া ও আইভরি কোস্ট ‘রাইট টু ড্রিম’ একাডেমির মতো প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করেছে, যা ইউরোপের শীর্ষ লিগে খেলা ফুটবলারও তৈরি করছে। মিশর, সেনেগাল ও মরক্কো এখন আফ্রিকান ফুটবল ফেডারেশনের গভর্ন্যান্স মানদণ্ড নির্ধারণ করছে। চলতি বছরের অনূর্ধ্ব-১৭ মহাদেশীয় প্রতিযোগিতায় তানজানিয়ার উত্থান, সেনেগালের স্থিতিশীলতা, মিশরের কাঠামোগত শক্তি ও আলজেরিয়ার শৃঙ্খলা সবকিছু যখন এক রেখায় মিলে যায়, তখন আফ্রিকাকে নিয়ে নতুন করে ভাবতে হয়। আফ্রিকান ফুটবল সংস্থার প্রেসিডেন্ট প্যাট্রিস মতসেপে বলেছেন, সঠিক বিনিয়োগ ও গভর্ন্যান্স নিশ্চিত হলে এ মহাদেশ একদিন বিশ্বকাপজয়ী দল উপহার দিতে সক্ষম হবে।

কিন্তু এ আশাবাদের পাশে দাঁড়িয়ে থাকে কঠিন কিছু পরিসংখ্যানগত সত্য। ১৯৩০ সাল থেকে চালু হওয়া বিশ্বকাপের ইতিহাসে শিরোপা জিতেছে কেবল আট দেশ। এরা সবাই ইউরোপ কিংবা দক্ষিণ আমেরিকার দেশ। এশিয়া বা আফ্রিকার কোনো দল কখনো ফাইনালের মঞ্চে পা রাখতে পারেনি। এ ব্যবধান নিছক প্রতিভার নয়, কাঠামোগতও। ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবলের সংস্কৃতি, প্রতিযোগিতার ঘনত্ব এবং প্রতিদিনের উচ্চমানের অনুশীলনের পরিবেশ একটি চক্র গড়ে তুলেছে, যা এক রাতে তৈরি হয় না। এশিয়া বা আফ্রিকার খেলোয়াড়রা এ চক্রে প্রবেশ করতে পারেন, কিন্তু নিজ দেশে সেটা নির্মাণ করতে কয়েক দশক সময় লাগে।

এ ব্যবধানকে স্থায়ী ভাগ্য বলে মেনে নেওয়ার কোনো কারণ নেই। মরক্কোর মডেল প্রমাণ করেছে, সঠিক দিকনির্দেশনা, ধারাবাহিক বিনিয়োগ ও গভর্ন্যান্স সংস্কার একটি মাঝারি ফুটবল শক্তিকে বিশ্বমানে পৌঁছে দিতে পারে। সেটা এক দশকের কম সময়ে। পার্থক্যটা তৈরি হয় কৌশলে। সৌদি আরবের মতো আমদানিনির্ভর মডেলের মাধ্যমে চমকে দেওয়া যায়, টেকসই উন্নতির পথটা সংকীর্ণই থাকে। এশিয়ার মধ্যে জাপান ঘরোয়া লিগের গুণগত উন্নয়ন এবং তরুণ খেলোয়াড়দের ইউরোপে পাঠানোর দীর্ঘমেয়াদি কৌশল নিয়েছে। ২০২২ বিশ্বকাপে জার্মানি ও স্পেনকে হারানোর পথে তা হয়তো ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু দেশটির সফল মডেলগুলো এখনো বিচ্ছিন্ন, সমন্বিত আঞ্চলিক প্রবণতায় রূপ নেয়নি; যেমনটা আফ্রিকার ক্ষেত্রে মরক্কো-সেনেগাল-মিশরের ত্রিভুজ আকারে দেখা যাচ্ছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি তাই দাঁড়ায়, ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার প্রায় শতবর্ষী আধিপত্যের সামনে এশিয়া-আফ্রিকা কি কেবল দর্শক থেকে যাবে? নাকি প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠবে? উত্তরটা সম্ভবত উভয়ের মাঝামাঝি কোথাও। স্রেফ আবেগ বা একক প্রতিভার ওপর ভর করে কোনো মহাদেশ বিশ্বকাপ জিতবে না, এটা ইতিহাস বহুবার দেখিয়েছে। কিন্তু কাঠামো, গভর্ন্যান্স এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলা বিনিয়োগ যদি অব্যাহত থাকে, দূরত্ব ক্রমেই কমে আসবে। মরক্কো একাই বিশ্বকাপ জিতবে কি না, সেটা অনিশ্চিত। কিন্তু মরক্কো যে মডেল তৈরি করেছে, তা যদি মহাদেশজুড়ে অনুকরণযোগ্য হয়, তবে আগামী দশকগুলোয় আফ্রিকা বা এশিয়ার কোনো দেশের ট্রফি হাতে তোলার দৃশ্য আর কল্পবিজ্ঞান থাকবে না।

লেখক: মাহবুব সরকার, ক্রীড়া সাংবাদিক, কালবেলা

  • সূত্রঃ কালবেলা