এস এম হুমায়ুন কবির, প্রশিক্ষক ও নির্মাতা।

মাদক নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দেশ গড়ায় উদ্বুদ্ধ করতে হবে

Share

বর্তমান সামাজিক বাস্তবতায় মাদক অতি পরিচিত এবং বহুল প্রচলিত একটি সমস্যা। শুধু সমস্যা বললে হয়তো বিষয়টির ভয়াবহতা সে ভাবে প্রকাশ পায় না। বলতে হবে অন্যতম প্রধান সমস্যা। যা গ্রামে-গঞ্জেও এখন মারাত্মক আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। তরুণ সমাজ এই ভয়াবহতায় আষ্টে-পৃষ্টে জড়িয়ে গেছে। ইদানীং ছোট ছোট বাচ্চাদেরও অনেক সময় মাদকে আসক্ত হতে দেখা যাচ্ছে। আবার না বুঝে বা ক্ষতিকর দিকগুলো না জেনে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে তা নয়, জেনেশুনেই এই মরণফাঁদে আটকে যাচ্ছে যুবসমাজ। কখনও হতাশা, কখনও শ্রেফ কৌতূহলের ছলে এই জালে আটকা পড়ছে বহু সম্ভাবনাময় প্রাণ।

সভ্যতার অগ্রযাত্রায় মানুষ যখন নতুন নতুন প্রযুক্তি ও বৈজ্ঞানিক উৎকর্ষের শিখরে আরোহণ করছে, ঠিক তার আড়ালেই সমাজদেহের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মাদকের মতো নীরব ঘাতক বিষাক্ত শিকড় বিস্তার করে চলেছে। এটি এমন এক মরণব্যাধি, যা শুধু একজন ব্যক্তির জীবন ধ্বংস করে না, বরং তার পুরো পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেয়।

প্রতি বছর ২৬ জুন পালিত হয় মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস হিসেবে। মাদকের ভয়াবহ ছোবল থেকে তরুণ প্রজন্ম ও সমাজকে রক্ষা করা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধিই এই দিবসটির প্রধান লক্ষ্য। বর্তমান বিশ্বে মাদকের বিস্তার, গ্রহণ শুধুমাত্র স্বাস্থ্য সমস্যা নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে সংঘবদ্ধ অপরাধ সংগঠনের সাথেও এর সম্পৃক্ততা রয়েছে। বাংলাদেশে এর প্রভাব গভীর এবং বহুমুখী। দেশের বিপুল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী তথা ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডকে সম্পদে রূপান্তর করার প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে এই মাদকাসক্তি। ২৬ জুনের এই বিশেষ প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে মাদকের বৈশ্বিক ও দেশীয় চিত্র, এর বিধ্বংসী স্বাস্থ্য ঝুঁকি এবং এর ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক রক্তক্ষরণের উপায় নিয়ে ভাববার সময় এসেছে। একই সাথে তরুণ সমাজকে আলোর পথে ফেরাতে সমাজ, রাষ্ট্র ও পরিবারকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসার বিকল্প নেই, সেটা আমাদেরকে গভীরভাবে অনুধাবন করতে হবে।

মাদক গ্রহণকারী

মাদকমুক্ত বিশ্ব গড়ার প্রত্যয় নিয়ে প্রতি বছর আন্তর্জাতিক এই দিবসটি উদযাপিত হয়ে আসছে। এর পেছনে রয়েছে এক ঐতিহাসিক পটভূমি। ১৯৮৭ সালের ৭ থেকে ২৭ জুন অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এই সম্মেলনের সুপারিশের ওপর ভিত্তি করে, ১৯৮৭ সালের ৭ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের এক ঐতিহাসিক সভায় প্রতি বছরের ২৬ জুনকে ‘মাদকবিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস’ হিসেবে পালনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

ঐতিহাসিকভাবে ২৬ জুন তারিখটি নির্ধারণের পেছনে একটি বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। চীনের কিং রাজবংশের আমলে, প্রথম আফিম যুদ্ধের ঠিক প্রাক্কালে, ১৮৩৯ সালের ২৫ জুন লিন জেরু নামক একজন দেশপ্রেমিক চীনা কর্মকর্তা ক্যান্টন (বর্তমানে গুয়াংজু) এলাকায় ব্রিটিশ বণিকদের অবৈধ আফিম ব্যবসা নির্মূলের উদ্দেশ্যে ব্যাপক অভিযান শুরু করেন। ২৬ জুনের মধ্যে তিনি বিপুল পরিমাণ আফিম ধ্বংস করতে সক্ষম হন। সাম্রাজ্যবাদ ও মাদক পাচারকারীদের বিরুদ্ধে সেই ঐতিহাসিক প্রতিরোধকে স্মরণ করেই মূলত এই তারিখটি বেছে নেওয়া হয়েছিল। বর্তমান একবিংশ শতাব্দীতে এসে এই দিবসের গুরুত্ব আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, কারণ মাদকের আধুনিক রূপগুলো পূর্বের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি মারাত্মক ও সহজলভ্য হয়ে উঠেছে।

মাদক গ্রহণকারী

বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মাদক হলো গাঁজা, যার ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ২৪ কোটি ৪০ লাখ। তবে বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে বড় আতঙ্কের নাম সিন্থেটিক ড্রাগ বা ল্যাবরেটরিতে তৈরি রাসায়নিক মাদক। ওপিওড, মেথামফেটামিন, ফেন্টানিল এবং বিভিন্ন ধরনের অ্যামফিটামিন জাতীয় ড্রাগের অবৈধ উৎপাদন ও পাচার আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্যকে

চরম ঝুঁকিতে ফেলেছে। বিশেষ করে উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এই কৃত্রিম মাদকের সহজলভ্যতা কিশোর ও তরুণদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা ও মানসিক ভারসাম্যহীনতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে বাংলাদেশ মাদক চোরাচালানের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ একটি দেশ হিসেবে পরিচিত। গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল (মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, লাওস) এবং গোল্ডেন ক্রিসেন্ট (পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ইরান)-এর মধ্যবর্তী অঞ্চলে অবস্থান হওয়ায় এবং ভারতের সাথে দীর্ঘ তিন হাজার কিলোমিটারের বেশি স্থল সীমান্ত থাকার কারণে বাংলাদেশ মাদক কারবারিদের অন্যতম প্রধান ট্রানজিট রুট ও বড় বাজারে পরিণত হয়েছে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী মাদক ব্যবহারকারীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে ৩১৬ মিলিয়নে (প্রায় ৩১ কোটি ৬০ লাখ) পৌঁছেছে, যা বৈশ্বিক প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার প্রায় ৬ শতাংশ। বিশ্বজুড়ে মাদক ব্যবহারের কারণে সৃষ্ট জটিলতায় প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন।

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (BMU) এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (DNC) যৌথ উদ্যোগে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত জাতীয় গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৮২ লাখ মানুষ কোনো না কোনো অবৈধ মাদক ব্যবহার করছেন, যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪.৮৮ শতাংশ। দেশের মাদক ব্যবহারকারীদের মধ্যে প্রায় ৬১ লাখ মানুষই গাঁজায় আসক্ত, এবং একটি বড় অংশ ইয়াবা ও ক্রিস্টাল মেথ (আইস) এর মতো মারাত্মক সিন্থেটিক মাদকের জালে বন্দী। গবেষণার সবচেয়ে উদ্বেগজনক ও পিলে চমকানো তথ্য হলো, বাংলাদেশে মাদক গ্রহণকারীদের ৬০ শতাংশই ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই, অর্থাৎ কৈশোরকালেই প্রথম মাদক সেবন শুরু করে। কৌতুহল, সঙ্গদোষ, পারিবারিক অশান্তি এবং ইন্টারনেটের অপব্যবহারের কারণে স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীরা এই চোরাবালিতে পা দিচ্ছে।

দেশে মাদক ব্যবহারকারীদের মধ্যে প্রায় ৬১ লাখ মানুষই গাঁজায় আসক্ত। তবে গত এক দশকে ইয়াবা এবং সাম্প্রতিক সময়ে ক্রিস্টাল মেথ বা ‘আইস’-এর মতো ভয়ংকর সিন্থেটিক মাদকের আগ্রাসন যুবসমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করেছে। মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে আসা ইয়াবা ও আইস টেকনাফ থেকে শুরু করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের গ্রামগঞ্জেও ছড়িয়ে পড়ছে।

মাদকের অপব্যবহার মানবদেহের প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে ধীরে ধীরে অকেজো করে দেয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, বর্তমান বাজারে প্রচলিত মাদকগুলোর রাসায়নিক গঠন এতটাই জটিল ও ক্ষতিকর যে, এগুলো গ্রহণের সাথে সাথেই মানুষের কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের ওপর স্থায়ী আঘাত হানে।

বাংলাদেশে ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক (যেমন- হেরোইন, প্যাথিডিন) গ্রহণকারীর সংখ্যাও কম নয়। একই সুচ বা সিরিঞ্জ একাধিক ব্যক্তি ব্যবহার করার ফলে হেপাটাইটিস বি, হেপাটাইটিস সি এবং এইচআইভি/এইডস-এর মতো প্রাণঘাতী ও সংক্রামক রোগ জ্যামিতিক হারে ছড়িয়ে পড়ছে। জাতিসংঘের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইনজেকশনে মাদক গ্রহণকারীদের একটি বিশাল অংশ এই মরণঘাতী ভাইরাসগুলোর বাহক।

ক্রিস্টাল মেথ (আইস) বা ইয়াবা সরাসরি মস্তিষ্কের নিউরোট্রান্সমিটার ধ্বংস করে দেয়। ফলে মাদকাসক্ত ব্যক্তি চরম হ্যালুসিনেশন (ভ্রম), তীব্র বিষণ্ণতা, সিজোফ্রেনিয়া এবং প্যারানয়ায় আক্রান্ত হয়। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া অনেক নির্মম পারিবারিক হত্যা কান্ডের পেছনে মাদকজনিত মানসিক বিকৃতি ও হ্যালুসিনেশন সরাসরি দায়ী বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। ক্রিস্টাল মেথ বা ইয়াবার মতো সিন্থেটিক ড্রাগ সরাসরি মানুষের কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র বা মস্তিষ্ক ধ্বংস করে দেয়। ফলে স্থায়ী মানসিক বিকৃতি, বিষণ্ণতা, লিভার-কিডনি অকেজো হওয়া এবং অকাল হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু ঝুঁকি বাড়ছে।

দীর্ঘ মেয়াদে মাদক সেবনের ফলে মানবদেহের লিভার সিরোসিস, কিডনি বিকল হওয়া, ফুসফুসের ক্যানসার এবং হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দেয়। যুবসমাজের একটি বড় অংশ অকাল বার্ধক্য ও স্থায়ী পঙ্গুত্বের শিকার হচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্য খাতের ওপর এক বিশাল বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।

মাদকের কারণে একটি দেশের অর্থনীতি কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, তা সাধারণ মানুষের ধারণার বাইরে। এটি ব্যক্তি পর্যায় থেকে শুরু করে সামষ্টিক অর্থনীতিতে এক বিশাল ক্ষত বা ‘অর্থনৈতিক রক্তক্ষরণ’ তৈরি করছে।

মাদক ব্যবসা সম্পূর্ণ অবৈধ এবং এর লেনদেন অধিকাংশ ক্ষেত্রে হুন্ডি বা অবৈধ ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা (UNCTAD)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, অবৈধ মাদক চোরাচালান ও ব্যবসার কারণে বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর প্রায় ৪৮১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (যা দেশীয় মুদ্রায় প্রায় ৫ হাজার ৯০০ কোটি টাকারও বেশি) বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। মাদকজনিত অর্থ পাচারের এই বৈশ্বিক তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান বর্তমানে পঞ্চম। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ যদি দেশের মূল অর্থনীতিতে থাকত, তবে তা জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে বিশাল অবদান রাখতে পারত।

মাদকাসক্তি একটি পরিবারকে কীভাবে পথে বসিয়ে দেয়, তার প্রমাণ মেলে অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানে। গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তি তার নেশার টাকা জোগাড় করতে বছরে গড়ে ৭০৭ থেকে ১,১৩৫ মার্কিন ডলার (যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৮৫ হাজার থেকে ১ লাখ ৩৫ হাজার টাকা) অপচয় করে। মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত পরিবারের জন্য এই খরচ বহন করা অসম্ভব। ফলে পরিবারের সঞ্চয় শেষ হয়ে যায়, জমিজমা বিক্রি করতে হয় এবং পরিবারটি চরম দারিদ্র্যরে মুখে পড়ে। শুধু তাই নয়, এই অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে আসক্ত তরুণরা চুরি, ছিনতাই ও মাদক ব্যবসার খুচরা বিক্রেতা হিসেবে অপরাধ জগতে জড়িয়ে পড়ে। অনেকে নিজের কিডনি বিক্রি করতেও পিছপা হয় না।

অর্থনীতিবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, বাংলাদেশে মাদকের এই অবৈধ ব্যবহার, চোরাচালান এবং এর ফলে সৃষ্ট অপরাধ সম্পূর্ণ রোধ করা সম্ভব হলে জাতীয় বাজেটে প্রতি বছর প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় করা সম্ভব হতো। এই বিশাল সাশ্রয়কৃত অর্থ দিয়ে দেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনা সম্ভব ছিল। এছাড়া, দেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সিংহভাগ (যাদের ৮০ শতাংশই তরুণ) মাদকের কবলে পড়ায় কর্মক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পাচ্ছে। কর্মক্ষম মানুষ যখন উৎপাদনের পরিবর্তে রাষ্ট্রের চিকিৎসার ওপর বোঝা হয়ে দাঁড়ায়, তখন অর্থনৈতিক উন্নয়ন স্থবির হয়ে পড়তে বাধ্য।

মাদকের প্রভাব কেবল সংখ্যা বা অর্থনৈতিক হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়: এর মানবিক ও সামাজিক মূল্য অপরিসীম। মাদকাসক্ত ব্যক্তি সমাজে তার সম্মান হারায়, পারিবারিক বন্ধন ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যায়। বাংলাদেশে বিবাহবিচ্ছেদ, পারিবারিক সহিংসতা এবং নারী নির্যাতনের অন্যতম প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করে এই মাদকাসক্তি। মাদকাসক্ত সন্তানের কারণে বাবা-মায়ের সামাজিক মর্যাদা ক্ষুন্ন হয়, অনেক ক্ষেত্রে প্রবীণ বাবা-মা সন্তান কর্তৃক শারীরিক নির্যাতনেরও শিকার হন। সমাজে কিশোর গ্যাং কালচার বা কিশোর অপরাধের যে ভয়াবহ উত্থান আমরা লক্ষ্য করছি, তার মূল কারণ এই মাদক। পাড়া-মহল্লায় মাদকের সিন্ডিকেটগুলো কিশোরদের সা মাদকের লোভ দেখিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করছে।

মাদকের এই বহুমাত্রিক সংকট থেকে মুক্তি পেতে হলে সনাতন পদ্ধতির বাইরে এসে একটি সমন্বিত, আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত কৌশল গ্রহণ করতে হবে। কেবল পুলিশি অভিযান বা কঠোর আইন দিয়ে এই সমস্যার টেকসই সমাধান সম্ভব নয়।
প্রতিরোধ শুরু হতে হবে ঘর থেকে। সন্তানদের গুণগত সময় দেওয়া, তাদের বন্ধু-বান্ধবদের সম্পর্কে খোঁজ রাখা এবং ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের শিক্ষা দেওয়া জরুরি। এছাড়া, কিশোর ও তরুণদের সুস্থ বিনোদনের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র এবং পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সৃজনশীল কাজে যুক্ত হতে পারে।

মাদক চোরাচালানের রুটগুলো বন্ধ করতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (BGB), কোস্ট গার্ড এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করতে হবে। সীমান্ত এলাকায় আধুনিক স্ক্যানার ও ড্রোন প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে মাদকের প্রবেশ সম্পূর্ণ রুখে দিতে হবে। মাদক কারবারের মূল হোতা বা গডফাদারদের রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয় বিবেচনা না করে আইনের আওতায় আনতে হবে।

মাদকাসক্তদের অপরাধী হিসেবে না দেখে তাদের অসুস্থ’ বা রোগী হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। দেশে সরকারি উদ্যোগে আধুনিক চিকিৎসাসংবলিত পুনর্বাসন কেন্দ্রের (Rehabilitation Center) সংখ্যা বাড়াতে হবে, যেখানে স্বল্প খরচে বা বিনামূল্যে উন্নত মানসিক ও শারীরিক চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হবে। চিকিৎসা শেষে তাদের সমাজের মূল স্রোতে ফেরাতে বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
মাদকবিরোধী প্রচারণাকে একটি জাতীয় আন্দোলনে রূপ দিতে হবে। গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং ধর্মীয় উপাসনালয়গুলোকে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য কাজে লাগাতে হবে। মাদক প্রতিরোধে সরকারি ও বেসরকারি খাতে আর্থিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা অপরিহার্য, কারণ আজকের বিনিয়োগই আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করবে।

মাদকের অপব্যবহার রোধে শক্তিশালী সামাজিক আন্দোলন গড়েতোলা জরুরি। কিছু কিছু জায়গায় এই আন্দোলন শুরু হয়েছে। কিন্তু সেটা একধরনের মব জাস্টিস। আপনি আপনার নিকটস্থ মাদককারবারিকে চেনেন তাই বলে তাকে ধরে এনে আইন নিজে প্রয়োগ কররেন সেটাতো সঠিক সিদ্ধান্ত নয়। তাকে আইনের হাতে তুলে দিন। অনেক সময় বললে ভুল হবে, বেশীরভাগ সময় মাদককারবারিরা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সহযোগীতায় ব্যবসা পরিচালনা করে ফলে তাদেরকে ধরা সহজ হয় না। এখানে আমাদেরকে বিচক্ষণতার সাথে পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হবে।

স্থানীয় প্রশাসনের সাথে জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করে এই প্রাণঘাতি সমস্যা থেকে বের হবার করনীয়গুলো ঠিক করতে হবে। সন্তান বা আসক্ত ব্যক্তিকে কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে তার অন্ধকার/উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ সম্মন্ধে পরিষ্কার ধারণা দিতে হবে। তাকে বোঝাতে হবে কোনটা সঠিক রাস্তা। এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, রাষ্ট্রের ভূমিকা! রাষ্ট্র নাগরিকের জন্য আসলে কি করে? কেনো নাগরিক রাষ্ট্রকে ভালো না বেসে রাষ্ট্রের ক্ষতি করতে জীবন বাজিধরে। রাষ্ট্রকে নাগরিকের জন্য দৃশ্যমান উন্নয়নের রূপরেখা প্রনয়ণ করতে হয়। রাষ্ট্রের পাশাপাশি তার সেবকদেরও একটু আধটু সৎ এবং বিচক্ষণ হতে হয়, তা না হলে মানবিক রাষ্ট্র গড়ে উঠবে কি করে। ধরুন একজন জেলা প্রশাসকের কাজ কি? সে নিজে যদি কেবল রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ পাওয়ার সুফল নিয়ে মত্ত থাকেন তাহলে ওই জেলার কি অবস্থা হবে। তরুণরা জাতির প্রাণশক্তি এটা কি জেলা প্রশাসক মহোদয় জানেন না। জানেন। তাহলে তাদেরকে রক্ষা করার জন্য তার গৃহীত পদক্ষেপগুলোইতো যথেষ্ঠ, কিন্তু বাস্তবে তার প্রতিফলন আমরা দেখতে পাই না।

আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি সমাজ থেকে কেবল মাদক নামের একটি অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেই অন্যসব অপরাধ প্রায় ৭০/৮০ ভাগ কমে যাবে। আমরা নিজের হাতে আমাদের ভবিষৎ প্রজনন্মকে খুন করছি। এখনই যদি মাদকের অপব্যবহার নির্মূল করা না যায় তাহলে আমাদের জাতীয় জীবনে এর জন্য চরম মূল্য দিতে হবে।

এবারের ২৬ জুনের অঙ্গীকার কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাক, বাস্তবে প্রতিফলিত হোক। মুখরিত হোক এই স্লোগানে ‘মাদকের বিরুদ্ধে কোনো ছাড় নয়’। সুস্থ-মানবিক জাতি গঠনে এর কোনো বিকল্প নেই। তরুণ প্রজন্মকে মাদকের প্রতি আসক্তির পরিবর্তে দেশের প্রতি ভালোবাসায় আসক্ত করে তুলতে হবে। তাহলেই একটি উন্নত সমৃদ্ধ অপরাধমুক্ত মানবিক রাষ্ট্র বিনির্মাণে অনেকদূর এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ।

  • লিখেছেন: এস এম হুমায়ুন কবির,
    প্রশিক্ষক ও নির্মাতা।