কোস্টগার্ডের বিশেষ অভিযানে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় আটক হওয়ার পর অবশেষে কারাগারে পাঠানো হয়েছে সুন্দরবনের কথিত বনদস্যু দল ‘দুলাভাই বাহিনী’র প্রধান রবিউল ইসলামকে। এক সময় আত্মসমর্পণের আগ্রহ প্রকাশ করা এই দস্যু নেতার সেই সুযোগ শেষ পর্যন্ত আর হয়নি।
গত ২৫ জুন রাতে বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের অভিযানে গুলিবিদ্ধ হয়ে আটক হন রবিউল। ওই অভিযানে নিহত হন বাহিনীর সদস্য শওকত সরদার এবং পরে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় আটক হন আরেক সদস্য ইসরাফিল হাওলাদার। কোস্টগার্ডের দাবি, এই অভিযানের পর বাহিনীটি কার্যত ছত্রভঙ্গ হয়ে গেছে।
গত ২৯ জুন খুলনার কয়রা আমলি আদালতে হাজির করা হলে গুলিবিদ্ধ রবিউলকে দেখতে ভিড় করেন উৎসুক জনতা, যাদের অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেন। কয়রা থানার ওসি মো. শাহ আলম জানান, কোস্টগার্ডের দায়ের করা দুটি মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে এবং তিনি বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন।
আত্মসমর্পণের আগ্রহ থেকে ফের দস্যুতায়
চলতি বছরের জানুয়ারিতে সুন্দরবনের গহিনে বাহিনীর আস্তানায় গিয়েছিলেন এই প্রতিবেদক। সেখানে রবিউল জানিয়েছিলেন, পরিস্থিতির কারণেই তিনি ফের দস্যুতায় জড়িয়েছেন এবং সরকার সুযোগ দিলে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চান। তার নামে থাকা মামলার সংখ্যা নিজেও জানেন না বলে জানিয়েছিলেন তিনি। বাহিনীর দ্বিতীয় শীর্ষ সদস্য আফজাল হোসেনও একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছিলেন, যিনি আগে একবার আত্মসমর্পণ করেও পরে ফের বনে ফিরে যান।
তবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সুন্দরবনে অভিযান শিথিল হয়ে পড়লে আত্মসমর্পণের আলোচনা থেমে যায় এবং বনজীবীদের জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগ ফের বাড়তে থাকে বাহিনীটির বিরুদ্ধে।
অভিযান ও গ্রেপ্তার
নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে গত ২২ ফেব্রুয়ারি খুলনা সার্কিট হাউসে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের পর কোস্টগার্ড শুরু করে ‘অপারেশন ম্যানগ্রোভ শিল্ড’। এই অভিযানের ধারাবাহিকতায় ২৫ জুন রাতে সুন্দরবনে দস্যুদের নৌকা থামার সংকেত অমান্য করে গুলি চালালে কোস্টগার্ডও পাল্টা গুলি চালায় বলে জানান কোস্টগার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লে. কমান্ডার সাব্বির আলম। এতে দস্যুদের একটি নৌকায় আগুন ধরে যায় এবং আরেকটি ডুবে যায়। ঘটনাস্থলে কোস্টগার্ডের দুই সদস্য আহত হন এবং উদ্ধার করা হয় ৬টি একনলা বন্দুক ও ৬৯টি কার্তুজ।
উদ্বেগ কাটেনি বনজীবীদের
রবিউল কারাগারে গেলেও সুন্দরবনের বনজীবীদের মধ্যে স্বস্তি ফেরেনি সম্পূর্ণভাবে। কয়রার জেলে আসাদুল ইসলাম, যিনি একসময় দুলাভাই বাহিনীর হাতে জিম্মি হয়ে ২০ হাজার ৪০০ টাকা মুক্তিপণ দিয়ে মুক্তি পেয়েছিলেন, দাবি করেন সুন্দরবনকে সম্পূর্ণ দস্যুমুক্ত করতে বাকি সক্রিয় দলগুলোকেও আইনের আওতায় আনা হোক।
‘উপকূল ও সুন্দরবন সংরক্ষণ আন্দোলনের’ সভাপতি মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, একজন-দুজন দস্যুকে গ্রেপ্তার করলেই স্থায়ী সমাধান হবে না; বরং ধারাবাহিক অভিযান, দ্রুত বিচার এবং দস্যুদের অর্থের উৎস ও সহযোগী নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে পারলেই সুন্দরবন স্থায়ীভাবে দস্যুমুক্ত হতে পারে।