আজ থেকে প্রায় ২৫ বছর আগে এক দুপুরে চলন্ত ট্রেন থেকে নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার মেথিকান্দা রেলস্টেশনে নেমেছিলেন বাক্প্রতিবন্ধী এক নারী, নাম ববি বেগম। এরপর আর কোথাও যাওয়া হয়নি তাঁর—সেই স্টেশনই হয়ে ওঠে তাঁর একমাত্র ঠিকানা। বিনিময়ে কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই প্ল্যাটফর্ম ঝাড়ু দেওয়া, শৌচাগার পরিষ্কার রাখাসহ নানা কাজ করে গেছেন তিনি এত বছর ধরে।
এখন প্রায় সত্তর ছুঁইছুঁই বয়সের ববি বেগমকে মানবিক দিক বিবেচনায় স্টেশনের একটি পরিত্যক্ত কক্ষে থাকার সুযোগ দিয়েছিল কর্তৃপক্ষ। স্টেশন এলাকার মানুষ ও নিয়মিত যাত্রীদের কাছে তিনি সুপরিচিত মুখ—কেউ খাবার দিতেন, কেউবা সামান্য কিছু টাকা। বছরের পর বছর সেই সামান্য অর্থই খরচ না করে জমিয়ে রেখেছিলেন তিনি প্রায় দুই থেকে আড়াই দশক ধরে।
কিন্তু গত শনিবার রাতে সেই দীর্ঘদিনের সঞ্চয়ের জন্যই আক্রমণের শিকার হন তিনি। মেথিকান্দা স্টেশনের ওই পরিত্যক্ত কক্ষে ঢুকে একদল দুর্বৃত্ত তাঁকে মারধর করে জমানো সব টাকা লুটে নিয়ে যায়। ঘটনাটি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়—অনেকেই দাবি তোলেন জড়িতদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার ও কঠোর শাস্তির। এরই মধ্যে ববি বেগমের পাশে দাঁড়িয়েছে স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ এবং একাধিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন।
স্টেশন সূত্রে জানা গেছে, গত দুই দশকের বেশি সময় ধরে মেথিকান্দা স্টেশনের পরিচ্ছন্নতার দায়িত্বে ছিলেন ববি বেগম। পরিবার-পরিজন কেউ না থাকায় স্টেশনের একটি ছোট্ট কক্ষেই কাটত তাঁর দিন-রাত। শারীরিক বয়স ও প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও নিয়মিত কাজ চালিয়ে যেতেন তিনি, আর স্থানীয় মানুষ ও যাত্রীদের সহায়তায় জুটত তাঁর খাবার। যাত্রীদের দেওয়া অর্থ তিনি জমিয়ে রাখতেন নিজের কক্ষেই।
ঘটনার রাতে, প্রায় রাত দুইটার দিকে ঘুমন্ত অবস্থায় থাকা ববি বেগমের কক্ষে ঢুকে কয়েকজন দুর্বৃত্ত তাঁর কাছে জমানো টাকা দাবি করে। টাকা দিতে রাজি না হওয়ায় তাঁকে বেধড়ক মারধর করা হয়, চোখ-মুখেও আঘাত করা হয়। এরপর কক্ষ তল্লাশি করে বছরের পর বছরের সঞ্চয় খুঁজে বের করে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। পরদিন সকালে বিষয়টি জানাজানি হয়।
মেথিকান্দা স্টেশনের স্টেশনমাস্টার এস এম জসিম জানান, ঘটনাটি ইতিমধ্যে পুলিশ ও প্রশাসনকে অবহিত করা হয়েছে এবং পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শনসহ সিসিটিভি ফুটেজও সংগ্রহ করেছে। প্রশাসনের পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনও তাঁর সহায়তায় এগিয়ে এসেছে বলে জানান তিনি।
রায়পুরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মজিবুর রহমান বলেন, সংগ্রহ করা সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে তিন-চারজন মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যারা ঘটনার পর থেকেই পলাতক। তাদের ধরতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে জানান তিনি।
রায়পুরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাসুদ রানা জানান, স্টেশনে বসবাসরত এই বৃদ্ধার পূর্ণ দায়িত্ব নিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। তাঁকে ইতিমধ্যে চাল-ডালসহ শুকনা খাবার ও আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে, পাশাপাশি চিকিৎসারও ব্যবস্থা করা হয়েছে। জীবনের বাকি সময়টা তিনি যেন স্টেশনের সেই কক্ষেই নিরাপদে কাটাতে পারেন, তা নিশ্চিত করারও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।