ব্যাংক। প্রতীকী ছবি

দেশের ব্যাংক খাতে চরম বৈষম্য: মোট আমানতের ৯৬ শতাংশই লাখপতি-কোটিপতিদের দখলে

Share

দেশের ব্যাংকিং খাতে জমা মোট অর্থের প্রায় দুই-পঞ্চমাংশই কেন্দ্রীভূত হয়ে আছে কোটিপতিদের হিসাবে। অর্থাৎ প্রতি ১০০ টাকার আমানতের মধ্যে ৪০ টাকাই থাকছে কোটি টাকার বেশি জমাকারীদের অ্যাকাউন্টে। এর সঙ্গে লাখপতিদের হিসাবে থাকা আরও ৫৬ শতাংশ যোগ করলে দেখা যায়, মোট আমানতের ৯৬ শতাংশই কুক্ষিগত মাত্র লাখপতি ও কোটিপতি শ্রেণির হাতে। বিপরীত চিত্রে, মোট ব্যাংক হিসাবের প্রায় ৯০ শতাংশই হাজার টাকার ছোট অঙ্কের হিসাব হলেও এসব হিসাবে জমা রয়েছে সর্বসাকল্যে মাত্র ৪ শতাংশ অর্থ—অথচ কোটিপতি হিসাবের সংখ্যা সামগ্রিক হিসাবের ১ শতাংশেরও কম।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের এই পরিসংখ্যানে ব্যক্তিগত হিসাবের পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হিসাবও অন্তর্ভুক্ত থাকায় প্রাতিষ্ঠানিক খাতে বড় অঙ্কের জমা থাকাটা স্বাভাবিক ঘটনা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ শেষে দেশের সামগ্রিক ব্যাংক আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২১ লাখ ৫৮ হাজার ২৫ কোটি টাকায়। এর মধ্যে ১ কোটি টাকার বেশি জমা থাকা হিসাবগুলোতে রয়েছে ৮ লাখ ৫৯ হাজার ১৬২ কোটি টাকা, যা মোট আমানতের প্রায় ৩৯ দশমিক ৮ শতাংশ। অন্যদিকে ১ লাখ থেকে ৯৯ লাখ টাকা পর্যন্ত জমাকারীদের হিসাবে রয়েছে ১২ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকা, যা মোট আমানতের প্রায় ৫৬ শতাংশ। বিপরীতে, ১ টাকা থেকে ৯৯ হাজার টাকা পর্যন্ত জমা থাকা হিসাবগুলোতে সঞ্চিত হয়েছে মাত্র ৮৯ হাজার ৪৭১ কোটি টাকা, যা সামগ্রিক আমানতের মাত্র ৪ শতাংশ।

সংখ্যাগত বিচারেও এই বৈষম্য স্পষ্ট। দেশের ব্যাংক খাতে মোট আমানত হিসাবের সংখ্যা ১৮ কোটি ২৬ লাখ ১২ হাজার ১৫টি হলেও এর মধ্যে কোটি টাকার বেশি জমা থাকা হিসাবের সংখ্যা মাত্র ১ লাখ ৩৬ হাজার ৪৮৫টি। ১ লাখ থেকে ১ কোটি টাকার নিচে জমা থাকা হিসাব ১ কোটি ৯১ লাখ ১৮ হাজার ১৮০টি, আর ১৬ কোটি ৩৩ লাখ ৫৭ হাজার ৩৫০টি হিসাবেই জমা রয়েছে ১ লাখ টাকার নিচে।

সাম্প্রতিক তিন মাসের প্রবণতা বিশ্লেষণ করলেও একই চিত্র উঠে আসে। গত ডিসেম্বরে কোটিপতি হিসাবে জমা অর্থ ছিল ৮ লাখ ৩৬ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা, যা মার্চ নাগাদ বেড়ে দাঁড়ায় ৮ লাখ ৫৯ হাজার ১৬২ কোটিতে—অর্থাৎ তিন মাসে বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ২২ হাজার ৭৯২ কোটি টাকা। একই সময়ে সামগ্রিক আমানত বৃদ্ধি পেয়েছে ৫৭ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা এবং নতুন হিসাব খোলা হয়েছে প্রায় ৪৭ লাখ। এর অর্থ, এই তিন মাসে ব্যাংকে আসা নতুন আমানতের প্রায় অর্ধেকই গিয়ে জমা হয়েছে কোটিপতিদের হিসাবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক আমানতকে জমার পরিমাণ অনুযায়ী মোট ২৪টি শ্রেণিতে ভাগ করেছে, যার মধ্যে সর্বোচ্চ শ্রেণি হলো ৫০ কোটি টাকার বেশি জমাকারীরা। মার্চ শেষে এই শ্রেণির হিসাবের সংখ্যা ছিল মাত্র ২ হাজার ৭৪টি, অথচ এসব হিসাবে জমা ছিল ৩ লাখ ৬ হাজার ৮৬৪ কোটি টাকা—গড়ে প্রতিটি হিসাবে প্রায় ১৪৮ কোটি টাকা, যা ইঙ্গিত দেয় এই শ্রেণির বেশির ভাগই শতকোটি টাকার মালিক।

সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কে মুজেরী প্রথম আলোকে ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেন, এই পরিসংখ্যানে ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক—উভয় ধরনের হিসাবই অন্তর্ভুক্ত থাকে। সরকারি বড় প্রতিষ্ঠান বা বেসরকারি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের হিসাবে শত শত কোটি টাকা জমা থাকাটা স্বাভাবিক, তাই ব্যক্তিগত হিসাবের সংখ্যা বেশি হলেও অর্থের পরিমাণে কোটিপতি হিসাবই এগিয়ে থাকে।

কোটিপতি হিসাব বাড়লেও কিছু শ্রেণিতে কমেছে জমা

তবে সব শ্রেণিতে সমানভাবে প্রবৃদ্ধি ঘটেনি। ডিসেম্বরে ৫০ কোটি টাকার বেশি জমাকারীর হিসাব ছিল ১ হাজার ৯৯৭টি, যেখানে জমা ছিল ২ লাখ ৮১ হাজার ৮৭৭ কোটি টাকা—মার্চ নাগাদ যা যথাক্রমে ২ হাজার ৭৪টি ও ৩ লাখ ৬ হাজার ৮৬৪ কোটি টাকায় দাঁড়ায়, অর্থাৎ তিন মাসে বৃদ্ধি ২৪ হাজার ৯৮৭ কোটি টাকা—যা পুরো কোটিপতি শ্রেণির প্রবৃদ্ধির সিংহভাগ।

তবে মাঝারি মাত্রার কোটিপতি শ্রেণিতে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। যেমন ১৫ থেকে ২০ কোটি টাকা জমাকারীদের হিসাবে ডিসেম্বরে ছিল ৩৯ হাজার ১০ কোটি টাকা, যা মার্চে কমে দাঁড়ায় ৩৭ হাজার ১৫০ কোটিতে—অর্থাৎ কমেছে ১ হাজার ৮৬০ কোটি টাকা। একই রকম হ্রাস দেখা গেছে ২০-২৫ কোটি, ২৫-৩০ কোটি, ৩৫-৪০ কোটি এবং ৪০-৫০ কোটি টাকা জমাকারীদের শ্রেণিতেও।

এ প্রসঙ্গে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থের প্রবাহ বেড়ে যাওয়ার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। বছরের প্রথম তিন মাসে নির্বাচন ও ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে বহু অর্থ ব্যাংক থেকে বেরিয়ে যায়, পাশাপাশি ব্যাংক খাতের প্রতি আমানতকারীদের আস্থা এখনো পুরোপুরি ফিরে না আসায় অনেকে টাকা তুলে অন্য খাতে বিনিয়োগ করছেন।

অসংখ্য হিসাব, তবু জমা নগণ্য

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যে আরও দেখা যায়, ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা জমা থাকা হিসাবের শ্রেণিতে সবচেয়ে কম অর্থ জমা রয়েছে—মার্চ শেষে যা ছিল ৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা, ডিসেম্বরের তুলনায় সামান্য কম। এই শ্রেণির হিসাবসংখ্যাও কমে ৬৩ লাখ ৩৮ হাজার ৭৫১-তে দাঁড়িয়েছে, যা ডিসেম্বরে ছিল ৬৩ লাখ ৪১ হাজার ৬১৮টি।

তবে সংখ্যার বিচারে সবচেয়ে বড় শ্রেণি হলো ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত জমাকারীদের, যাদের হিসাবসংখ্যা মার্চ শেষে দাঁড়িয়েছে ১৩ কোটি ৭৭ লাখ ৯৩ হাজার ৫১২টিতে, যেখানে মোট জমা ৭ হাজার ৩৯৮ কোটি টাকা। বিশ্লেষকদের মতে, এই বিপুলসংখ্যক ছোট হিসাবের অধিকাংশ ধারকই শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী বা স্বল্প আয়ের মানুষ, যাঁরা মূলত দৈনন্দিন লেনদেন বা বেতন গ্রহণের জন্য ব্যাংক ব্যবহার করেন এবং সাধারণত বড় অঙ্কের সঞ্চয় গড়েন না।