ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ থেকে সহজে বেরিয়ে আসার কোনো পথ খুঁজে পাচ্ছেন না মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। দুই দেশের মধ্যে ফের শুরু হওয়া পাল্টাপাল্টি হামলায় সংঘাত নিরসনের সব প্রচেষ্টা নতুন করে বাধাগ্রস্ত হয়েছে, আর এর মধ্য দিয়ে ভেঙে পড়েছে দুই পক্ষের মধ্যকার ইতিমধ্যে ভঙ্গুর হয়ে থাকা যুদ্ধবিরতিও।
কৌশলগত হরমুজ প্রণালিতে একটি তেলবাহী জাহাজে হামলার প্রতিক্রিয়ায় সম্প্রতি ইরানি স্থাপনায় বিমান হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র, যার জবাবে বাহরাইন ও কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে পাল্টা আঘাত হানে ইরান। এই ঘটনাপ্রবাহের পর সংঘাত অবসানে হওয়া অন্তর্বর্তী সমঝোতাকে অকার্যকর ঘোষণা করেন ট্রাম্প, এমনকি বুধবার ইরানে নতুন করে হামলার নির্দেশও দেন তিনি।
উল্লেখ্য, দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধবিরতির লক্ষ্যে একটি প্রাথমিক সমঝোতা হয়েছিল, কিন্তু চুক্তি সইয়ের মাত্র তিন সপ্তাহের মাথায়ই নতুন করে উত্তেজনা মাথাচাড়া দিল—যার ফলে ট্রাম্পের জন্য মর্যাদা রক্ষা করে এই যুদ্ধ থেকে সরে আসা আরও কঠিন হয়ে পড়েছে, পাশাপাশি সংকটে পড়েছে একটি পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তির সম্ভাবনাও।
বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ, বর্তমান পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের সামনে খোলা পথ সীমিত এবং প্রতিটি পথই মোটামুটি ঝুঁকিপূর্ণ। নতুন করে বড় ধরনের সংঘর্ষ শুরু হলে তা আবারও পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নিতে পারে—যদিও ট্রাম্প নিজে দাবি করেছেন উত্তেজনা শিগগিরই প্রশমিত হবে। তবে ইতিমধ্যে নতুন হামলার জেরে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে প্রায় ৭ শতাংশ। অন্যদিকে বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্র সামান্য পিছু হটলেই সেই সুযোগে হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের প্রভাব আরও জোরালোভাবে জাহির করবে ইরান।
সামরিক চাপ প্রয়োগ করে ইরানকে ফের আলোচনায় ফেরানোর কৌশল নিয়েছেন ট্রাম্প—যার মূল লক্ষ্য ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ। তবে বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন, ট্রাম্প যতটা ছাড় প্রত্যাশা করছেন, ইরান ততটা দেবে বলে মনে হচ্ছে না। ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান—উভয় প্রশাসনের হয়ে মধ্যপ্রাচ্যে কাজ করা সাবেক মধ্যস্থতাকারী অ্যারন ডেভিড মিলারের ভাষায়, ট্রাম্প নিজেই এখন এমন এক পরিস্থিতিতে আটকা পড়েছেন, যেখান থেকে সামরিক কিংবা কূটনৈতিক—কোনো পথেই ইরানের কাছ থেকে বাড়তি কিছু আদায় করা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। এ প্রসঙ্গে হোয়াইট হাউসের প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
নির্বাচনের চাপে ট্রাম্প
আগামী নভেম্বরে মার্কিন কংগ্রেসের অন্তর্বর্তী নির্বাচনের আগেই এই যুদ্ধ স্থায়ীভাবে থামানোর জোরালো চাপে আছেন ট্রাম্প। এই সংঘাতে ইতিমধ্যে কয়েক হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অর্থনীতি, আর একই সঙ্গে কমে গেছে তাঁর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তাও। গত ২৩ জুনের রয়টার্স/ইপসোস জরিপ অনুযায়ী তাঁর জনসমর্থন নেমে এসেছে ৩৪ শতাংশে, যা তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদে এ পর্যন্ত সর্বনিম্ন—এই প্রবণতা কংগ্রেসে রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার সম্ভাবনাকেও ম্লান করে দিচ্ছে।
তুরস্কে চলমান ন্যাটো সম্মেলনে ট্রাম্প অংশ নেওয়ার মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে এই পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটল। গত ১৭ জুন দুই দেশের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক সই হলেও নতুন সংঘাতের কারণে চূড়ান্ত শান্তিচুক্তির আশা এখন প্রায় ধূলিসাৎ। উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলার মধ্য দিয়েই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এই যুদ্ধ শুরু করেছিল।
সমঝোতা স্মারকে চূড়ান্ত চুক্তির জন্য ৬০ দিন সময় বেঁধে দেওয়া হলেও অধিকাংশ বিশ্লেষকের ধারণা, জটিল বিষয়গুলো এড়িয়ে যাওয়ায় এই সময়ের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ সমাধানে পৌঁছানো কঠিন হবে। আলোচনায় এখনো তেমন অগ্রগতি দেখা যায়নি, বরং পরবর্তী ধাপের আলোচনা নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।
যুদ্ধের প্রভাবে ইরানের অর্থনীতি ও সামরিক সক্ষমতা যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, আর ওয়াশিংটন ইতিমধ্যে বাতিল করেছে ইরানকে দেওয়া তেল বিক্রির বিশেষ ছাড়—যা অন্তর্বর্তী চুক্তিতে ইরানের সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিল। তা সত্ত্বেও নতুন করে হামলা মোকাবিলায় প্রস্তুত বলেই মনে হচ্ছে তেহরানের নেতৃত্ব। কিছু বিশ্লেষকের মতে, চলতি সপ্তাহের এই পাল্টাপাল্টি হামলা মূলত ভবিষ্যৎ আলোচনার টেবিলে নিজ নিজ অবস্থান শক্তিশালী করার একটি কৌশল হতে পারে।
ওয়াশিংটনের গবেষণা প্রতিষ্ঠান আটলান্টিক কাউন্সিলের সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা জনাথন প্যানিকফ মনে করেন, আগামী দিনগুলোতেও এই ধারা বজায় থাকতে পারে। তাঁর ভাষায়, পরিস্থিতি হয়তো পুরোদমে যুদ্ধে রূপ নেবে না, তবে এটি একধরনের নিয়ন্ত্রিত অস্থিতিশীলতায় পরিণত হবে—কোনো স্থায়ী সমাধান ছাড়াই বারবার সহিংসতার পুনরাবৃত্তি ঘটবে।
দ্বিতীয় মেয়াদের নির্বাচনী প্রচারে বিদেশে যুদ্ধ এড়িয়ে অর্থনীতিতে মনোযোগ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ট্রাম্প। তিনি ইরানের সঙ্গে হওয়া অন্তর্বর্তী চুক্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের বড় বিজয় হিসেবে তুলে ধরলেও ইরানও একই দাবি করছে নিজেদের পক্ষে। বেশির ভাগ বিশ্লেষকের মূল্যায়ন, শুরুতে ইরানের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ চাওয়া ট্রাম্প বারবার নিজের অবস্থান পরিবর্তন করায় এখন নিজেই কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন।
হরমুজ প্রণালিই মূল বিরোধের কেন্দ্রবিন্দু
এই সাম্প্রতিক সংঘাতের কেন্দ্রে রয়েছে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্দ্ব, যা নিয়ে দুই পক্ষের ব্যাখ্যাও ভিন্ন। যুদ্ধের সময় ইরান প্রমাণ করেছে যে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ বন্ধ করে দেওয়ার সক্ষমতা তাদের রয়েছে। ইরানের অবস্থান, ভবিষ্যতে এই জলপথ পরিচালনায় তাদের বড় ভূমিকা থাকা উচিত, এমনকি এ পথ দিয়ে চলাচলকারী জাহাজ থেকে ফি আদায়েরও পরিকল্পনা করছে তারা। বিপরীতে ট্রাম্প ও তাঁর আরব মিত্ররা চান এই জলপথ সবার জন্য অবাধ ও নিরাপদ থাকুক।
ওয়াশিংটনের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের বিশ্লেষক জন অলটারম্যানের মতে, ইরান বুঝে গেছে যে ট্রাম্প দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে জড়াতে আগ্রহী নন, আর তাঁর আরব মিত্ররাও এখন স্থিতিশীলতা ফিরে পেতে চাইছে। তাঁর ভাষ্য, ট্রাম্প হয়তো কিছুদিন সামরিক তৎপরতা চালিয়ে যাবেন, কিন্তু একপর্যায়ে পরিস্থিতি শান্ত করতে আরব দেশগুলোই তাঁর ওপর চাপ সৃষ্টি করবে—আর এটিই ইরানের জন্য সবচেয়ে বড় বাজি।
নভেম্বরের অন্তর্বর্তী নির্বাচনও ট্রাম্পের জন্য বড় দুশ্চিন্তার কারণ। যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি তেলের দাম আরও বাড়লে ভোটাররা রিপাবলিকান পার্টির বিপক্ষে চলে যেতে পারেন বলে আশঙ্কা রয়েছে। জনস হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষজ্ঞ লরা ব্লুমেনফেল্ডের পর্যবেক্ষণ, মহামন্দার সময়কার প্রেসিডেন্ট হার্বার্ট হুভারের অর্থনৈতিক ব্যর্থতার ইতিহাস যেন তাড়া করে বেড়াচ্ছে ট্রাম্পকে, আর তিনি নিজেও ভালোভাবেই জানেন যে এখন তাঁর মূল মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন অর্থনীতির দিকে। প্রসঙ্গত, ট্রাম্প নিজেই একবার মন্তব্য করেছিলেন, এই যুদ্ধ চালিয়ে গেলে তাঁর পরিণতিও হুভারের মতো হতে পারে।
-রয়টার্স, ওয়াশিংটন