Photo: Civitatis

কুরাসাও: ক্যারিবীয় দ্বীপরাষ্ট্র যার ফুটবল রূপকথা মাতিয়েছে ২০২৬ বিশ্বকাপ

Share

দক্ষিণ ক্যারিবীয় সাগরে ভেনেজুয়েলার উপকূলের কাছে অবস্থিত ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র কুরাসাও। আরুবা ও বোনেয়ারের সঙ্গে মিলে এটি পরিচিত ‘এবিসি দ্বীপপুঞ্জ’ নামে। নেদারল্যান্ডস রাজ্যের একটি স্বায়ত্তশাসিত অঙ্গরাজ্য হিসেবে গণ্য হয় কুরাসাও— অর্থাৎ এর নিজস্ব সরকার থাকলেও প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতির দায়িত্ব থাকে নেদারল্যান্ডসের হাতে। দ্বীপে দুটি ডাচ নৌঘাঁটিও রয়েছে।

দীর্ঘদিন ‘নেদারল্যান্ডস অ্যান্টিলিস’ নামের যৌথ ডাচ ক্যারিবীয় ভূখণ্ডের অংশ ছিল কুরাসাও। ২০১০ সালে সাংবিধানিক পুনর্গঠনের মাধ্যমে নেদারল্যান্ডস অ্যান্টিলিস বিলুপ্ত হলে কুরাসাও নেদারল্যান্ডস রাজ্যের অভ্যন্তরে একটি পৃথক দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। রাজধানী উইলেমস্টাডের ঔপনিবেশিক স্থাপত্যের জন্য জায়গাটি ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের তালিকাভুক্ত।

২০২৬ সালের হিসাবে কুরাসাওয়ের জনসংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৮৫ হাজারের কিছু বেশি— অর্থাৎ এটি বিশ্বের অন্যতম ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর দেশ।

অর্থনীতি

কুরাসাওয়ের অর্থনীতি মূলত পর্যটন, আন্তর্জাতিক আর্থিক সেবা, বাণিজ্য ও জাহাজ চলাচলনির্ভর। বিশ্বব্যাংকের সংজ্ঞা অনুযায়ী এটি একটি উচ্চ আয়ের অর্থনীতি। উইলেমস্টাড বন্দরে রয়েছে একটি মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল এবং বড় তেল ট্যাংকার নোঙর করার মতো প্রাকৃতিক বন্দর, যা ঐতিহাসিকভাবে দ্বীপের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

একসময় ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি পিডিভিএসএ পরিচালিত ইসলা তেল শোধনাগার হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের উৎস ছিল, তবে পরিবেশগত লঙ্ঘন, আর্থিক সংকট ও কার্যক্রমগত ব্যর্থতার কারণে ২০১৯ সালে শোধনাগারটি বন্ধ হয়ে যায়— যা অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা দেয়। এরপর থেকে সরকার নতুন পরিচালক খুঁজে শোধনাগারটি পুনরায় চালুর চেষ্টা করছে, যদিও এখনো তা অনিশ্চিত।

বর্তমানে পর্যটনই অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি, যা মোট জিডিপির প্রায় অর্ধেক এবং ২০ হাজারের বেশি কর্মসংস্থান তৈরি করে। হারিকেন বেল্টের বাইরে অবস্থানের কারণে দ্বীপটি সারা বছর পর্যটনের জন্য তুলনামূলক নিরাপদ এবং বিমা খরচও কম। করোনা মহামারির পর পর্যটন খাত দ্রুত ঘুরে দাঁড়িয়েছে এবং ২০২৪ সালে অর্থনীতিতে প্রায় ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। তবে বেশিরভাগ ভোগ্যপণ্য ও মূলধনী পণ্য আমদাননির্ভর হওয়ায় দ্বীপের অর্থনীতি বাইরের বিশ্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত, আর দুর্বল মাটি ও পানির সীমাবদ্ধতার কারণে কৃষিতে তেমন অগ্রগতি নেই।

ফুটবলে ইতিহাস গড়া ‘ব্লু ওয়েভ’

কুরাসাওয়ের সবচেয়ে বড় সাম্প্রতিক গর্বের জায়গা তাদের জাতীয় ফুটবল দল, যাদের ডাকনাম ‘দ্য ব্লু ওয়েভ’। মাত্র দেড় লাখের কিছু বেশি জনসংখ্যা নিয়ে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে জায়গা করে নিয়ে তারা ইতিহাস গড়ে— বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে ছোট জনসংখ্যার দেশ হিসেবে মূলপর্বে খেলার নজির স্থাপন করে কুরাসাও, যা আগে ছিল আইসল্যান্ডের (২০১৮ সালে, প্রায় সাড়ে তিন লাখ জনসংখ্যা নিয়ে) দখলে।

কনকাকাফ বাছাইপর্বে জ্যামাইকার বিপক্ষে কিংস্টনে শেষ ম্যাচে গোলশূন্য ড্র করেই গ্রুপ শীর্ষে থেকে বিশ্বকাপ নিশ্চিত করে দলটি— যে ম্যাচে ভিএআরের সিদ্ধান্তে জ্যামাইকা একটি ইনজুরি টাইমের পেনাল্টিও হারায়। এই ফলাফল পুরো ক্যারিবীয় ও কনকাকাফ অঞ্চলে সাড়া ফেলে দেয়। দলের প্রধান কোচ ডাচ কিংবদন্তি ডিক অ্যাডভোকাট, যিনি ৭৮ বছর বয়সে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বয়স্ক কোচ হিসেবে মাঠে নামার রেকর্ড গড়েন, আগের রেকর্ডটি ছিল ২০১০ সালে গ্রিসকে নেতৃত্ব দেওয়া অটো রেহাগেলের (৭১ বছর)।

বিশ্বকাপে গ্রুপ ‘ই’-তে জার্মানি, আইভরি কোস্ট ও ইকুয়েডরের সঙ্গে পড়ে কুরাসাও। জুন মাসে অনুষ্ঠিত গ্রুপ পর্বে জার্মানির কাছে ৭-১ গোলে বড় ব্যবধানে হারলেও পরের ম্যাচে ইকুয়েডরের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র করে তারা— যা তাদের প্রথম বিশ্বকাপ পয়েন্ট এনে দেয়। তবে শেষ ম্যাচে আইভরি কোস্টের কাছে ২-০ গোলে হেরে মাত্র এক পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপের তলানিতে থেকে বিদায় নেয় দলটি।

হার-জিতের হিসাব ছাপিয়ে বিশ্বকাপে অংশগ্রহণই কুরাসাওয়ের জন্য ছিল ঐতিহাসিক এক অর্জন। অধিনায়ক লিয়ান্দ্রো বাকুনা ও তাঁর ছোট ভাই জুনিনহো বাকুনার নেতৃত্বে, নেদারল্যান্ডসে খেলা বা বেড়ে ওঠা একঝাঁক খেলোয়াড় নিয়ে গড়া এই দল বিশ্ব ফুটবলে ক্যারিবীয় অঞ্চলের সম্ভাবনার এক নতুন উদাহরণ তৈরি করেছে।