আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ভারতের নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে টানা ৩৬ দিন ধরে অবস্থান করা হাজারো শিক্ষার্থী, স্বেচ্ছাসেবী ও বিক্ষোভকারী অবশেষে বাড়ির পথে রওনা হয়েছেন। গত শনিবার ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ এবং ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) মূল দাবিগুলো কেন্দ্রীয় সরকার মেনে নেওয়ার পর বিক্ষোভস্থল ধীরে ধীরে খালি হতে শুরু করে।
বিহারের গয়ার বাসিন্দা ৩০ বছর বয়সী বিদ্যাভূষণ কুমার ইউপিএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়ার পাশাপাশি স্কুল ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার্থীদের পড়ান। গত ২০ জুলাই বিক্ষোভকারীদের ‘সংসদ চলো’ কর্মসূচি সহিংস রূপ নেওয়ার পর থেকে তিনি আন্দোলনস্থলেই অবস্থান করছিলেন। ২০১৭ ও ২০১৮ সালে দিল্লি থেকে ইউপিএসসি মেইনস পরীক্ষায় অংশ নেওয়া এই শিক্ষার্থী আর্থিক সংকটে গয়ায় ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। সম্প্রতি বিহারে সহকারী শিক্ষা উন্নয়ন কর্মকর্তা পদের নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার পর প্রশ্নপত্র ফাঁসের কারণে তা বাতিল হওয়ার তিক্ত অভিজ্ঞতাও তাঁর রয়েছে। গত ২০ জুন থেকে যন্তর মন্তরের একটি তাঁবুতে রাত কাটিয়ে আসা বিদ্যাভূষণ বলেন, সরকারকে জবাবদিহির আওতায় আনতেই তিনি সেখানে অবস্থান করছিলেন।
উত্তর প্রদেশের বেরেলির ২০ বছর বয়সী নিট পরীক্ষার্থী দেবাশীষও ছিলেন আন্দোলনকারীদের একজন। তাঁর প্রথম নিট পরীক্ষা বাতিল হওয়ার পর পুনঃপরীক্ষায় প্রত্যাশার চেয়ে অনেক কম নম্বর পাওয়ায় তিনি প্রতিবাদে যোগ দেন। মন্ত্রীর পদত্যাগের খবরে উচ্ছ্বসিত দেবাশীষ এখন বাড়ি ফিরে ফের পরীক্ষার প্রস্তুতি শুরু করবেন বলে জানান।
শুধু পরীক্ষার্থীরাই নন, আন্দোলনের সংহতি জানাতে ছুটে এসেছিলেন নানা বয়সী মানুষ। কেরালার কোঝিকোড় থেকে আসা ৭৬ বছর বয়সী অজিথা কে বলেন, আন্দোলনের উদ্দীপনা অনুভব করতেই তিনি সেখানে গিয়েছিলেন। গুরগাঁওয়ের গৃহিণী মালিকা তাঁর ১১ বছর বয়সী ছেলেকে নিয়ে যন্তর মন্তরে গিয়েছিলেন তরুণ প্রজন্মের প্রতি সমর্থন জানাতে। তিনি বলেন, এই আন্দোলন কোনো দল বা সরকারকেন্দ্রিক নয়, বরং জবাবদিহির প্রশ্ন।
২০ জুলাই পুলিশি অভিযানে আহত হয়ে চারটি সেলাই লাগে মোহাম্মদ নাভেদ খানের। চিকিৎসা নেওয়ার দুই ঘণ্টার মধ্যেই তিনি ফিরে এসে বিক্ষোভের মঞ্চ পুনর্নির্মাণের কাজে যোগ দেন। বিক্ষোভস্থলের স্বেচ্ছাসেবী চিকিৎসাশিবিরে কাজ করা নিট পরীক্ষার্থী কৃষ্ণ বিশ্বাস আশা প্রকাশ করেন, এই আন্দোলন ভারতের শিক্ষাব্যবস্থায় সংস্কারের পথ খুলে দেবে।
জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ার পিএইচডি গবেষক ও স্টুডেন্টস ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ার দিল্লি রাজ্য সভাপতি সুরজ এলামন আন্দোলনের প্রথম দিন থেকেই যন্তর মন্তরে ছিলেন। তিনি বলেন, একটি ছাত্র আন্দোলন কতটা পরিবর্তন আনতে পারে, এই ঘটনা তারই বাস্তব উদাহরণ।
শনিবার বিকেলে মন্ত্রীর পদত্যাগের খবরে উল্লাসে ফেটে পড়েন আন্দোলনকারীরা। তবে সন্ধ্যা নামতেই দৃশ্যপট বদলাতে শুরু করে। মধ্যপ্রদেশের ২৮ বছর বয়সী স্বেচ্ছাসেবক মানবীরের মতো অনেকে লাউডস্পিকারে ঘোষণা দিয়ে বিক্ষোভস্থল ছাড়ার আহ্বান জানাতে থাকেন। এরপর ব্যাকপ্যাক, বিছানাপত্র, প্ল্যাকার্ড ও পতাকা নিয়ে সারিবদ্ধভাবে যন্তর মন্তর ছাড়তে দেখা যায় বিক্ষোভকারীদের। ইতিমধ্যে মেট্রো চলাচল স্বাভাবিক হয়ে গেছে, বন্ধ থাকা সড়কগুলোও খুলে দেওয়া হয়েছে এবং নিরাপত্তাকর্মীরাও ধীরে ধীরে এলাকা ছাড়তে শুরু করেছেন।