গ্যারিসন লুটেলের ফেইসবুক থেকে নেওয়া...

সন্তান ও স্ত্রীর খোঁজে আদালতের বারান্দায় মার্কিন নাগরিক গ্যারিসন: দীর্ঘ লড়াই ও আইনি জটিলতার চিত্র

Share

স্ত্রী ও সন্তানদের ফিরে পেতে এবং পিতৃত্বের অধিকার প্রতিষ্ঠায় দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার দুয়ারে দুয়ারে ঘুরছেন মার্কিন নাগরিক ও ব্যবসায়ী গ্যারিসন লুটেল (Garrison Luttrell)। বিবাহবিচ্ছেদের কোনো বৈধ আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন না করেই সন্তান লুকিয়ে রাখা, ভুয়া তালাক নোটিশ পাঠানো এবং পরবর্তীতে আরেক ব্যক্তির সঙ্গে বসবাস শুরু করার অভিযোগ উঠেছে তাঁর বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত স্ত্রী ফারহানা করিমের বিরুদ্ধে।

ঘটনার নেপথ্য ও ব্যাকগ্রাউন্ড

গ্যারিসন লুটেল ও ফারহানা করিমের বিবাহ সম্পন্ন হয় ২০১৮ সালে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরি (Missouri) অঙ্গরাজ্যের আইন অনুযায়ী। উভয়েই যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করতেন এবং তাঁদের একটি বড় ছেলে রয়েছে—ফাতমির ওয়াল ইকরাম লুটেল (Fatmir Wal Ikraam Luttrell)। ২০২৩ সালের শুরুর দিকে ফারহানা পুনরায় অন্তঃসত্ত্বা হন। গর্ভকালীন সময়ে মা ও বোনের সান্নিধ্যে থাকার অজুহাত দেখিয়ে ২০২৩ সালের জুন মাসে তিনি বাংলাদেশে আসেন।

বাংলাদেশে আসার পর প্রথম দিকে গ্যারিসন নিয়মিত খরচের টাকা পাঠালেও ধীরে ধীরে ফারহানা গ্যারিসনের সঙ্গে সব ধরণের যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে গ্যারিসন বাংলাদেশে ছুটে আসেন।

ঢাকায় এসে চাঞ্চল্যকর তথ্য

বাংলাদেশে আসার পর গ্যারিসন দেখতে পান, উত্তরা থানা পুলিশ ও স্থানীয় সহায়তায় ফারহানার উত্তরার বাসায় গিয়ে তিনি জানতে পারেন ফারহানা করিম এক কানাডিয়ান নাগরিকের সঙ্গে বসবাস করছেন এবং তাঁকে বিয়ে করেছেন বলে দাবি করছেন। শুধু তা-ই নয়, জন্ম নেওয়া দ্বিতীয় সন্তান গ্যারিসনের নয় বলে দাবি করে হাসপাতালের কাগজপত্র দেখান ফারহানা।

গ্যারিসনের আইনজীবীরা জানান, ফারহানা ও গ্যারিসনের বিয়ে হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের আইনে। কোনো চূড়ান্ত ডিভোর্স না হওয়া সত্ত্বেও পুরান ঢাকার এক কাজীর মাধ্যমে একটি অবৈধ তালাক নোটিশ পাঠানো হয়, যখন ফারহানা অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। মুসলিম পারিবারিক আইন ও গর্ভবতী অবস্থায় এই নোটিশ পাঠানোর প্রক্রিয়া আইনিভাবে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন গ্যারিসনের আইনজীবী ব্যারিস্টার সজীব মাহমুদ আলম।

আইনি লড়াই ও আদালতের নির্দেশ

সন্তানদের দেখতে না পেরে গ্যারিসন হাইকোর্টে ‘হেবিয়াস কর্পাস’ (Habeas Corpus) রিট এবং বিবাহবিচ্ছেদের নোটিশ চ্যালেঞ্জ করে দেওয়ানি মামলা করেন। এছাড়া শিশুদের জিম্মা (কাস্টডি) চেয়ে পারিবারিক আদালতে মামলা করা হয়।

হাইকোর্টের নির্দেশনায় পুলিশ ও সংশ্লিষ্টদের সহায়তায় শিশুদের উপস্থিতির আদেশ দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে বিচারপতি নাইমা হায়দার ও বিচারপতি কাজী জিনাত হকের হাইকোর্ট বেঞ্চ পারিবারিক আদালতের জিম্মা সংক্রান্ত মামলাটি ৬ মাসের মধ্যে নিষ্পত্তির নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে গ্যারিসনকে সপ্তাহে দুই দিন শিশুদের সঙ্গে দেখা করার অনুমতি দেওয়া হয়।

এছাড়া ছোট সন্তানদের পিতৃত্ব নির্ধারণের ক্ষেত্রে ডিএনএ (DNA) পরীক্ষার প্রয়োজনীয়তা থাকলেও সন্তানদের লুকিয়ে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ গ্যারিসনের। মামলা তদন্তে ও অনুসন্ধানে পিবিআই-এর (PBI) কাছে ‘খুঁজে বের ও উদ্ধার’ (Search and Recovery) আদেশ থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘদিনে তার কোনো কার্যকর ফল মেলেনি।

বাবার মানবিক আকুতি

দীর্ঘদিন ধরে ঢাকার দায়রা জজ আদালত, সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন এবং আইনজীবীদের কক্ষের করিডোরে ঘুরছেন এই মার্কিন বাবা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের আকুতি প্রকাশ করে গ্যারিসন জানান, তিনি প্রায় হাজার দিনের কাছাকাছি সময় ধরে ঢাকায় অবস্থান করছেন এবং দীর্ঘ সময় ধরে নিজের বড় ছেলেকে কাছে পাননি বা চোখে দেখেননি।

গ্যারিসন লুটেল জানান, আদালতের মাধ্যমে সব আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তিনি তাঁর সন্তান ও স্ত্রীসহ পরিবারকে পুনরায় যুক্তরাষ্ট্রে ফেরত নিয়ে যেতে চান এবং ন্যায়বিচারের আশায় লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।