সরকারের পক্ষ থেকে বারবার ‘মব কালচার’ বা গণপিটুনি ও মব সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে এসেছে বলে দাবি করা হলেও বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন চিত্রই তুলে ধরছে। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা ও মানবাধিকার সংস্থার পরিসংখ্যান বলছে, দেশে মব সহিংসতা এখনো উদ্বেগজনক হারে অব্যাহত রয়েছে।
সর্বশেষ সোমবার (৮ জুন) মাদারীপুর সদর থানা ঘেরাও করে দুই আসামিকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টার ঘটনা আবারও আলোচনায় এনেছে মব সহিংসতার ইস্যু।
মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) তথ্য অনুযায়ী, গত মে মাসে দেশে মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ৬৬টি ঘটনায় ৩১ জন নিহত এবং ৬৮ জন আহত হয়েছেন।
অন্যদিকে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত পাঁচ মাসে মব সহিংসতায় প্রাণ হারিয়েছেন ৮৯ জন।
সংস্থাগুলোর এই পরিসংখ্যান সামনে আসার পর প্রশ্ন উঠেছে—মব সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে নেওয়া উদ্যোগগুলো কতটা কার্যকর।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, সরকারের নির্দেশনায় মব সহিংসতা প্রতিরোধে কাজ চলছে। তবে জনগণের মধ্যে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা অব্যাহত থাকলে এ ধরনের ঘটনা পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন হবে।
জাতীয় সংসদে একাধিকবার দেওয়া বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দাবি করেন, দেশে ‘মব কালচার শেষ’। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ সেই দাবির সঙ্গে বাস্তবতার ব্যবধান তুলে ধরছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, চুরি, ছিনতাই, ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগ, ব্যক্তিগত বিরোধ ও সামাজিক উত্তেজনাকে কেন্দ্র করে গণপিটুনির ঘটনা বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই প্রাণহানি ঘটছে, আবার কোথাও উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।
বিশ্লেষকদের মতে, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, রাজনৈতিক মেরুকরণ, সামাজিক অসহিষ্ণুতা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো গুজব—এই চারটি কারণ মব সহিংসতা বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখছে। তাঁদের মতে, শুধু আইন প্রয়োগ নয়, বিচার ব্যবস্থার প্রতি আস্থা পুনর্গঠন ও গুজব প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, মব ভায়োলেন্স কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় এবং প্রতিটি ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত করে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
অন্যদিকে এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, মব সহিংসতা মানবাধিকার পরিস্থিতি ও সামাজিক সম্প্রীতির জন্য গুরুতর হুমকি। তিনি সরকারের কঠোর আইনি পদক্ষেপের পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
আসকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে সবচেয়ে বেশি মব সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে ঢাকা বিভাগে, এরপর চট্টগ্রাম, খুলনা এবং অন্যান্য বিভাগে। এসব ঘটনায় মোট ৮৯ জনের মৃত্যু হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, জনগণ আইন মেনে চললে এবং সচেতন হলে মব সহিংসতা অনেকাংশে কমে আসবে। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতাই এসব ঘটনার মূল কারণ।
এদিকে সরকার জানিয়েছে, প্রয়োজনে মব সহিংসতা মোকাবিলায় নতুন আইন বা বিদ্যমান আইনের সংশোধন আনা হতে পারে।
সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন