দশ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত দেশের প্রথম নদীতলদেশ টানেল কর্ণফুলী টানেলে প্রত্যাশা অনুযায়ী যানবাহন চলাচল করছে না। ফলে দৈনিক আয়ের তুলনায় পরিচালনা ব্যয় হচ্ছে প্রায় দ্বিগুণ, যা টানেলটিকে রেখেছে বড় ধরনের লোকসানের মুখে।
টানেল-সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, সম্ভাব্যতা সমীক্ষা অনুযায়ী টানেল দিয়ে দৈনিক ১৭ হাজার ২৬০টি যানবাহন চলাচলের কথা থাকলেও বর্তমানে চলছে মাত্র তিন হাজার ৮৭৮টি, যা প্রাক্কলনের প্রায় সাত ভাগের এক ভাগ। এর ফলে টানেলে দৈনিক টোল আয় ১১ লাখ ২২ হাজার টাকা হলেও পরিচালনা ব্যয় দাঁড়াচ্ছে ২৩ লাখ টাকা। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর ব্যয় সংকোচন করে এই পরিমাণে নামিয়ে আনা হলেও, এর আগে দৈনিক ব্যয় ছিল ৩৭ লাখ টাকা পর্যন্ত।
২০২৩ সালের ২৯ অক্টোবর থেকে টানেলে যান চলাচল শুরুর পর চলতি বছরের ২৯ জুন পর্যন্ত প্রায় ৩৭ লাখ যানবাহন টানেল পার হয়েছে, অর্থাৎ দৈনিক গড়ে তিন হাজার ৮৭৮টি। এই সময়ে মোট আয় হয়েছে ১০৬ কোটি টাকা, যার দৈনিক গড় ১১ লাখ টাকার বেশি। তবে আয়ের তুলনায় ব্যয় থেকে গেছে দ্বিগুণ।
সোমবার সংসদ অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে সড়ক পরিবহন ও সেতু এবং রেলপথমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানান, টানেল পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে মাসিক ব্যয় টোল আয়ের দ্বিগুণেরও বেশি। তাঁর তথ্য অনুযায়ী, প্রতি মাসে টোল থেকে গড়ে তিন কোটি ৩৭ লাখ টাকা আয় হলেও ব্যয় হয় ছয় কোটি ৯৫ লাখ টাকা। বিদ্যুৎ সরবরাহ, আলোকসজ্জা, বায়ু চলাচল ব্যবস্থা, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, সিসিটিভি ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা পরিচালনার কারণে এই উচ্চ ব্যয় হচ্ছে বলে জানান মন্ত্রী। তিনি আরও বলেন, উদ্বোধনের পর দৈনিক পরিচালনা ব্যয় ছিল ৩৭ লাখ টাকা, যা সরকারের মিতব্যয়ী নীতি ও সেতু কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে কমিয়ে এখন ২৩ লাখ টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছে। পাশাপাশি টানেলকে লাভজনক করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও জানান তিনি।
চট্টগ্রামের পতেঙ্গা থেকে আনোয়ারা পর্যন্ত বিস্তৃত এই টানেল ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয় এবং পরদিন থেকে যান চলাচল শুরু হয়। চীনা ঋণ ও বাংলাদেশ সরকারের তহবিলের সমন্বয়ে নির্মিত এই টানেলের নির্মাণ কাজ করে চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না কমিউনিকেশন কনস্ট্রাকশন কোম্পানি (সিসিসিসি), যারা বর্তমানে টোল আদায় ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বও পালন করছে।
২০১৩ সালে পরিচালিত সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় ২০১৭ সালকে টানেল চালুর বছর ধরে প্রাক্কলন করা হয়েছিল, যদিও বাস্তবে টানেল চালু হয় ছয় বছর পর। সমীক্ষায় বলা হয়েছিল, চালুর বছরে দৈনিক গড়ে ১৭ হাজার ২৬০টি, ২০২০ সালে প্রায় ২১ হাজার এবং ২০২৫ সালের দিকে প্রায় ২৮ হাজার যানবাহন চলাচল করবে। কিন্তু বাস্তবে চলাচল করছে মাত্র তিন হাজার ৮৭৮টি যানবাহন, যা প্রকল্পটিকে বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখে ফেলেছে।
টানেলে বর্তমানে কার ও জিপের জন্য টোল ২০০ টাকা, মাইক্রোবাসের জন্য ২৫০ টাকা, ৩১ আসন পর্যন্ত বাসের জন্য ৩০০ টাকা এবং ৩২ আসন বা তার বেশি বাসের জন্য ৪০০ টাকা নির্ধারিত। তিন এক্সেলের বাসের টোল ৫০০ টাকা, আর ট্রাকের ক্ষেত্রে ওজনভেদে টোল ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত। ট্রাক বা ট্রেইলারের জন্য তিন এক্সেলে ৮০০ টাকা এবং চার এক্সেল বা তার বেশি হলে এক হাজার টাকা থেকে শুরু করে প্রতি অতিরিক্ত এক্সেলে আরও ২০০ টাকা যুক্ত হয়।
এ বিষয়ে কর্ণফুলী টানেল সাইট অফিসের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সৈয়দ রজব আলী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সমীক্ষার প্রাক্কলনের ধারেকাছেও যানবাহন চলাচল করছে না টানেল দিয়ে। মাসে টোল বাবদ প্রায় তিন কোটি ৩৭ লাখ টাকা আয় হলেও ব্যয় হচ্ছে ছয় থেকে সাত কোটি টাকা পর্যন্ত। তবে আগের তুলনায় ব্যয় এখন কিছুটা কমিয়ে আনা হয়েছে বলেও জানান তিনি।