একীভূত হওয়া পাঁচটি ইসলামি ধারার ব্যাংকের আমানতকারীদের জন্য স্বস্তির বার্তা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তাঁর ভাষ্যে, আলোচিত ‘হেয়ারকাট’ পদ্ধতি প্রয়োগ করা হবে না, বরং গ্রাহকরা তাঁদের জমাকৃত অর্থ সুদসহ ফেরত পাবেন—যদিও এ জন্য কিছুটা ধৈর্য ধরতে হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
বুধবার জাতীয় সংসদে জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণের বিধিতে দেওয়া এক নোটিশের জবাবে অর্থমন্ত্রী এসব কথা বলেন। নোটিশটি দিয়েছিলেন বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সাংসদ রেহানা আক্তার রানু। তিনি অভিযোগ করেন, এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকসহ একাধিক ব্যাংকে অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের কারণে সাধারণ আমানতকারীরা নিজেদের কষ্টার্জিত টাকা তুলতে পারছেন না, অথচ দায়ী মালিকপক্ষ বিদেশে পালিয়ে নিরাপদে জীবনযাপন করছে। প্রায় ৭৫ লাখ গ্রাহকের ন্যায়বিচারের দাবির কথা তুলে ধরে তিনি অভিযুক্তদের সম্পত্তি নিলামে বিক্রি করে গ্রাহকের অর্থ ফেরত দেওয়ার পাশাপাশি হেয়ারকাট ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বাতিলের দাবি জানান।
জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, এটি নিঃসন্দেহে একটি হৃদয়বিদারক পরিস্থিতি, এবং একটি নির্বাচিত সরকার এ নিয়ে নীরব থাকতে পারে না। তিনি জানান, আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতা ফেরাতে সরকার একটি সুসংগঠিত রেজল্যুশন কাঠামো গড়ে তুলেছে, যার আইনি ভিত্তি হিসেবে প্রণয়ন করা হয়েছে ব্যাংক রেজল্যুশন আইন। এই কাঠামোর আওতায় সমস্যাগ্রস্ত পাঁচটি ব্যাংককে একীভূত করে গঠন করা হয়েছে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি, যার ফলে পুরোনো পাঁচ ব্যাংকের সব আমানত দাবি ও স্বার্থ সংরক্ষিত থাকছে নতুন প্রতিষ্ঠানে। বাংলাদেশ ব্যাংকের রেজল্যুশন স্কিম অনুযায়ী ইতিমধ্যে ধাপে ধাপে আমানত ফেরত পাচ্ছেন গ্রাহকরা।
অনিয়মে জড়িতদের চিহ্নিত করতে বর্তমানে বিশেষ ফরেনসিক অডিট চলমান আছে বলে জানান মন্ত্রী, যার প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তীতে নেওয়া হবে সম্পদ পুনরুদ্ধারের পদক্ষেপ। তিনি আরও জানান, অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ১১টি মামলার মধ্যে প্রথম পর্যায়ে সাইফুজ্জামান চৌধুরী, এস আলম, বেক্সিমকো, শিকদার, নাসা ও অরিয়ন গ্রুপ সংক্রান্ত ছয়টি মামলায় দেওয়ানি কার্যক্রম শুরু হয়েছে, এবং এই পুনরুদ্ধার কার্যক্রম আরও সম্প্রসারিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
হেয়ারকাট প্রসঙ্গে দৃঢ়তার সঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, এই পদ্ধতি প্রয়োগ করা হবে না এবং আমানতকারীরা নিশ্চিতভাবেই সুদসহ তাঁদের টাকা ফেরত পাবেন, তবে এর জন্য কিছুটা অপেক্ষা করতে হবে। এই বিলম্বের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ব্যাংকগুলো বর্তমানে লোকসানে চলছে এবং প্রতিদিনই সেই লোকসান বাড়ছে—এমন পরিস্থিতিতে মূল আমানত ফেরত দেওয়াই যেখানে কঠিন, সেখানে সুদ প্রদান আরও জটিল একটি বিষয়।
ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ নিয়েও উত্তাপ
একই অধিবেশনে জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণের আলোচনায় এনসিপির সাংসদ আখতার হোসেন অভিযোগ করেন, গত দেড় দশকে প্রশাসন, পুলিশ, সেনাবাহিনী ও বিচার বিভাগের মতো স্পর্শকাতর দপ্তরে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় জালিয়াতির মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া একটি বিশাল চক্র এখনো সক্রিয় রয়েছে, যারা পতিত ফ্যাসিবাদী শক্তিকে পুনরায় ক্ষমতায় ফেরাতে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। তিনি প্রথম আলোর একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে জানান, মুক্তিযোদ্ধা কোটায় নিয়োগপ্রাপ্ত ৯০ হাজার ৫২৭ জনের সনদ যাচাইয়ে ইতিমধ্যে অন্তত ৮ হাজার জনের সনদে জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়া গেছে—অর্থাৎ প্রতি ১০০ জনের মধ্যে ৭ থেকে ৮ জনের তথ্যেই মিলছে গুরুতর অসংগতি।
আখতার হোসেন সতর্ক করে বলেন, জালিয়াতির মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া এই চক্রকে দ্রুত চাকরিচ্যুত করে আইনের আওতায় না আনা হলে তারা রাষ্ট্রের গোপন তথ্য পাচার করতে পারে বা ১৯৯৬ সালের ধাঁচে কোনো ক্যু-জাতীয় পরিস্থিতির উসকানি দিয়ে বড় সংকট তৈরি করতে পারে। জবাবে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আজম খান জানান, জালিয়াতির মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধা কোটার সুবিধা নেওয়া ব্যক্তি ও তাঁদের ওয়ারিশদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে।