ঝিনাইদহে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের নামে নির্মাণাধীন অবস্থায় পড়ে থাকা সেই ভাস্কর্য অপসারণের কাজ শুরু হয়েছে। ২০১৯ সালে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের পর নির্মাণকাজ শুরু হলেও ভাস্কর্যটির সঙ্গে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের প্রকৃত অবয়ব ও ছবির সাদৃশ্য না থাকায় সেটি অপসারণ করা হচ্ছে।
ভাস্কর্যটির আংশিক নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পরই সড়ক নিরাপত্তার ঝুঁকি বিবেচনায় বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই কাজ বন্ধ করে দেয়া হয়। পরে জেলা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির একাধিক সভায়ও স্থাপনাটি অপসারণের বিষয়ে আলোচনা হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি স্থাপনাটি অপসারণের কাজ পরিচালনা করছে জেলা পরিষদ।
জানা গেছে, ২০১৯ সালের ২৬ মার্চ ঝিনাইদহ পৌরসভার উদ্যোগে ‘বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান চত্বর’-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। তৎকালীন পৌর মেয়র সাইদুল করিম মিন্টু ও জেলা প্রশাসক সরোজ কুমার নাথ ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। পরে ভাস্কর্যটির নির্মাণকাজ শুরু হয়।
তবে স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের অভিযোগ, নামেই কেবল ‘বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান চত্বর’ রাখা হয়েছিল। ভাস্কর্যের নামে সেখানে এবড়োখেবড়ো পাথরসদৃশ একটি অবয়ব নির্মাণ করা হয়। কয়েক মাস কাজ চলার পর অজ্ঞাত কারণে নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে যায়। এরপর অসম্পূর্ণ অবস্থায় দীর্ঘদিন অযত্ন-অবহেলায় পড়ে থাকে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের নামে নির্মিত ওই স্থাপনাটি।
সাংস্কৃতিক কর্মী আবু সাঈদ বলেন, ‘বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান আমাদের গর্ব। দলমতনির্বিশেষে আমরা তাকে সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা করি। কিন্তু তার নামে ভাস্কর্য নির্মাণের নামে এখানে আসলে কী স্থাপন করা হয়েছিল, তা স্পষ্ট ছিল না। ভাস্কর্যটির কোনো নান্দনিকতা ছিল না। একটি উঁচু পাথর এবড়োখেবড়ো আকারে বসিয়ে সেটিকে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের নামে ব্যবহার করা হয়েছে। অথচ বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের প্রকৃত ছবি ও অবয়বের নিদর্শন রয়েছে।’
দূরপাল্লার বাসচালক মিজানুর রহমান বলেন, ‘ঢাকা-ঝিনাইদহ ও যশোর-কুষ্টিয়া মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল এটি। এখানে মহাসড়কের মাঝখানে প্রায় ৬ থেকে ৭ ফুট উঁচু একটি বেদি ছিল। বেদির এক পাশে গাড়ি থাকলে অন্য পাশের যানবাহন দেখা যেত না। প্রায়ই দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হতো। ভাস্কর্য হোক বা অন্য কোনো স্থাপনা, সেটি উপযুক্ত স্থানে নির্মাণ করা উচিত ছিল।’
তিনি আরও বলেন, ‘অপরিকল্পিতভাবে এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নির্মাণ কাম্য নয়।’
এ বিষয়ে ঝিনাইদহ পৌরসভার ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদ আলী খান জানান, ২০১৯ সালে তৎকালীন জেলা প্রশাসক সরোজ কুমার নাথ ও তৎকালীন পৌর মেয়র ৩২ লাখ টাকা ব্যয়ে এটি নির্মাণের উদ্যোগ নেন। প্রাথমিকভাবে ১১ লাখ টাকা উত্তোলন করে কাজ শুরু করা হলেও পরে কী কারণে কাজটি বন্ধ হয়ে যায়, তা জানা নেই।
বর্তমানে ভাস্কর্য নির্মাণ প্রকল্প-সংক্রান্ত ফাইলটি পৌরসভার প্রকৌশল বিভাগেও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানান তিনি।
জেলা প্রশাসন ও পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ই ভাস্কর্যটির নির্মাণকাজ অজানা কারণে অসমাপ্ত অবস্থায় পড়ে থাকে। দীর্ঘদিন অযত্ন-অবহেলায় ভাস্কর্য চত্বরটি ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়।
ভাস্কর্যটির নান্দনিকতা না থাকায় মাঝপথে নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে যায় বলেও নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে জেলা পরিষদের প্রশাসক এম এ মজিদ বলেন, ‘বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান দেশের গর্ব, ঝিনাইদহবাসীরও গর্ব। কিন্তু তার ভাস্কর্য তৈরির নামে অসুন্দর কিছু স্থাপন করা বীরশ্রেষ্ঠকে অসম্মান করার শামিল। দুটি মহাসড়কের সংযোগস্থলের ব্যস্ততম একটি ইন্টারসেকশনের ওপর ৬ থেকে ৭ ফুট উঁচু বেদির ওপর ওই স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছিল।’
তিনি বলেন, ‘বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের প্রকৃত অবয়ব ও ছবির আদলে নান্দনিক ভাস্কর্য নির্মাণ করা হলে আজ এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো না। এ ছাড়া আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই মহাসড়কের ওপর এ ধরনের স্থাপনা নির্মাণ করে অর্থ লুটপাট করা হয়েছে। সড়ক নিরাপত্তার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।’
সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার কামালুজ্জামান বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্য ভেঙে ফেলার খবর দেখেছি। আমার জানা মতে, সেখানে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের কোনো ভাস্কর্য ছিল না। একজন বীরশ্রেষ্ঠের ভাস্কর্য নির্মিত হলে জেলার মুক্তিযোদ্ধারা অবশ্যই জানতেন। আমরা এ বিষয়ে কিছুই জানতাম না।’
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মো. নোমান হোসেন বলেন, ‘স্থাপনাটি আদৌ বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্য ছিল কি না, আমরা নিশ্চিত হতে পারিনি। সেখানে নান্দনিক কোনো স্থাপনা ছিল না; বরং সেটি আবর্জনার স্তুপে পরিণত হয়েছিল। বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের নামে যে ভাস্কর্য নির্মাণের দাবি করা হয়েছিল, সেটির সঙ্গে তার প্রকৃত ছবির কোনো মিল ছিল না। এ ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ ইন্টারসেকশনের মাঝখানে স্থাপনাটি দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি করেছিল।’
জেলা প্রশাসক আরও বলেন, ‘স্থাপনাটি অপসারণ এবং বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের প্রকৃত ছবির আদলে নান্দনিক ভাস্কর্য নির্মাণের সিদ্ধান্ত অনেক আগেই জেলা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটিতে নেওয়া হয়েছিল। আগামী রোববার এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে।’
তথ্যসূত্রঃ স্টার নিউজ