১২ দলীয় জোটে ভাঙন: প্রধানমন্ত্রীর নৈশভোজ ঘিরে বিতর্ক, দুই শরিক বহিষ্কারের পথে

Share

বিএনপির সমমনা ১২ দলীয় জোটে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাম্প্রতিক এক নৈশভোজ অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রগতিশীল জাতীয়তাবাদী দল (পিএনপি) ও বাংলাদেশ এলডিপিকে (বিলুপ্ত) জোট থেকে বহিষ্কারের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন জোটের শীর্ষ নেতারা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দুই-এক দিনের মধ্যে জরুরি সভা ডেকে এই সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হবে।

বিতর্কের সূত্রপাত

গত সোমবার (২০ জুলাই) রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় যুগপৎ আন্দোলনের সমমনা মিত্র দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের সম্মানে নৈশভোজের আয়োজন করা হয়। অভিযোগ উঠেছে, ওই আয়োজনে বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন বিতর্কিত ব্যক্তি অংশ নেন, যা জোটের ভেতরে ক্ষোভের জন্ম দেয়।

বিশেষভাবে সমালোচনার কেন্দ্রে রয়েছেন বাংলাদেশ এলডিপির যুগ্ম মহাসচিব পরিচয়ধারী কামাল প্রধান, যার বিরুদ্ধে ব্যাংক জালিয়াতি, ভুয়া দলিল তৈরি, ভূমি দখল, মানব পাচার, ভুয়া আইডি খুলে চরিত্রহনন ও চাঁদাবাজির অভিযোগে একাধিক মামলা রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একাধিক মামলায় তিনি সাজাপ্রাপ্তও।

এ ছাড়া পিএনপির চেয়ারম্যান ফিরোজ মো. লিটনের বিরুদ্ধেও বিগত সরকারের দোসর হওয়ার অভিযোগ উঠেছে, যার প্রেক্ষিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তার একাধিক ছবি সামাজিক মাধ্যমে আলোচনার জন্ম দেয়। এ বিষয়ে ফিরোজ মো. লিটন কালবেলাকে বলেন, তিনি সে সময় শেখ হাসিনার সংলাপে অংশ নিলেও নির্বাচনে অংশ নেননি।

জোট সমন্বয়কের বক্তব্য

১২ দলীয় জোটের সমন্বয়ক ও বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান শামসুদ্দিন পারভেজ জানান, নৈশভোজে অংশগ্রহণের জন্য প্রতিটি দলের কাছে পাঁচজনের নামের তালিকা চাওয়া হয়েছিল। তালিকা জমা দেওয়ার পর অনুষ্ঠানের দিন সকালে সাংবাদিকরা ডকুমেন্টসহ জানান যে, বাংলাদেশ এলডিপির চিঠিপ্রাপ্ত কামাল প্রধান প্রকৃতপক্ষে আওয়ামী লীগের দোসর এবং তার বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও মরহুমা খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে কুৎসা রটানোর নথিপত্র রয়েছে।

তিনি জানান, বিষয়টি জোট প্রধান মোস্তফা জামাল হায়দারকে অবহিত করার পর বাংলাদেশ এলডিপির চেয়ারম্যানকে ফোনে জানানো হয় যে কামাল প্রধানকে নিয়ে অনুষ্ঠানে প্রবেশ করলে গেটে আটকে দেওয়া হবে। শেষ পর্যন্ত তিনি অনুষ্ঠানে প্রবেশ করেননি। শামসুদ্দিন পারভেজ আরও বলেন, জোট প্রধান মৌখিকভাবে দুই দলকে জোট থেকে বাদ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

‘গণদল’ পরিচয়ে অংশগ্রহণ

প্রতিবেদন অনুযায়ী, কামাল উদ্দিন সাংবাদিক বা নাগরিক প্রতিনিধি হিসেবে নয়, বরং ‘গণদল’ নামে একটি দলের ভাইস চেয়ারম্যান পরিচয়ে অনুষ্ঠানে অংশ নেন। গণদলের চেয়ারম্যান গোলাম মাওলা চৌধুরী বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, কামাল উদ্দিন তাদের দলের ভাইস চেয়ারম্যান এবং জাতীয়তাবাদী সমমনা জোটের প্রতিনিধি হিসেবে বৈঠকে অংশ নেন। সৈনিক লীগ পরিচয়ের প্রশ্নে তিনি দাবি করেন, কামাল উদ্দিনকে অনিচ্ছাসত্ত্বেও বিগত আওয়ামী সরকার চট্টগ্রাম মহানগর সৈনিক লীগের আহ্বায়ক বানিয়েছিল।

বিএনপির অভ্যন্তরে ক্ষোভ

ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর বিএনপির একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা ও মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদার নেতা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাদের বক্তব্য, দীর্ঘ দেড় দশকের জেল-জুলুম ও রক্তদানের পর সাবেক শাসকদলের দোসরদের প্রধানমন্ত্রীর সামনে নৈশভোজে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া বিষয়টিকে তারা প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক বলে মনে করেন।

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে যুগপৎ আন্দোলনের লক্ষ্যে বিএনপির সমমনা ১২টি দল নিয়ে ২০২২ সালের ২২ ডিসেম্বর এই জোট গঠিত হয়, যা পূর্ববর্তী বিশ দলীয় জোট ভেঙে তৈরি হয়েছিল। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আগে বাংলাদেশ এলডিপির চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন সেলিম ও বাংলাদেশ জাতীয় দলের চেয়ারম্যান সৈয়দ এহসানুল হুদা জোট ছেড়ে যান।