‘বাবার পরিচয় জানে না ৭২ শতাংশ সুইডিশ’ —ছাত্রশিবির সভাপতির দাবিটি ভিত্তিহীন

Share
গত ১৫ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সেমিনারে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেন, “সুইডেনের ৭২ শতাংশ মানুষ জানে না তার বাবার পরিচয়টা কী।”

একই বক্তব্যে তিনি বলেন, “ব্রাজিলে ফ্রি লিভ টুগেদার প্রথা চালু থাকার কারণে, জার্মানিতে এই জিনিসগুলো চালু থাকার কারণে ছেলেরা ছেলেদের বিয়ে করে, মেয়েরা মেয়েদের বিয়ে করে। …তাদের জনসংখ্যা কমে যাচ্ছে…মুসলিম দেশগুলো থেকে জনসংখ্যা আমদানি করতে হচ্ছে। ফ্রি মিক্সিং ব্যবস্থাগুলো তাদের ধ্বংস করে ছাড়ছে। ফ্রি সেক্স, লিভ টুগেদার কাঠামো তাদের সামাজিক কাঠামো ভেঙে দিচ্ছে।”

বক্তব্যের ভিডিও দেখুনএখানে এবংএখানে

তবে দ্য ডিসেন্টের যাচাইয়ে সুইডেনের ৭২ শতাংশ মানুষ তাদের বাবার পরিচয় জানেন না—এমন কোনো নির্ভরযোগ্য সরকারি পরিসংখ্যান বা গবেষণার তথ্য পাওয়া যায়নি। বরং সুইডেনের পারিবারিক কাঠামো, জন্মসংক্রান্ত পরিসংখ্যান ও পিতৃত্ব নিয়ে করা গবেষণায় ভিন্ন চিত্র পাওয়া যায়।

সুইডেনে নথিভুক্ত বাবার সঙ্গে জৈবিক পিতৃত্বের অমিল কতটা ঘটে, তা নিয়ে ২০২১ সালে দেশব্যাপী একটি গবেষণা করেন কারোলিনস্কা ইনস্টিটিউটের গবেষকেরা।

কারোলিনস্কা ইনস্টিটিউটের প্রতিবেদন দেখুনএখানে

জার্নাল অব ইন্টারনাল মেডিসিন-এ প্রকাশিত ওই গবেষণায় ১৯৩০ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া শিশুদের তথ্য ব্যবহার করে প্রায় ২০ লাখ পরিবারের রক্তের গ্রুপ ও পারিবারিক নিবন্ধনের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়।

গবেষণায় দেখা যায়, সুইডেনে ‘misattributed paternity’—অর্থাৎ নথিতে যাঁকে বাবা হিসেবে দেখানো হয়েছে, জৈবিকভাবে তিনি বাবা নন—এমন ঘটনার গড় হার ছিল প্রায় ১.৭ শতাংশ। ১৯৩০-এর দশকে এই হার প্রায় ৩ শতাংশ থাকলেও সময়ের সঙ্গে তা কমেছে। বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এসে তা প্রায় ১ শতাংশে নেমে আসে।

তবে এই ১.৭ শতাংশের হিসাব এবং ‘বাবার পরিচয় জানা নেই’—এক বিষয় নয়। গবেষণাটি কতজন মানুষ নিজের বাবাকে চেনেন না বা কতজনের বাবা অজ্ঞাত, তা পরিমাপ করেনি। বরং নথিভুক্ত বাবা ও জৈবিক বাবার মধ্যে অমিলের হার পরিমাপ করেছে।

ফলে এই গবেষণা থেকে সুইডেনের ৭২ শতাংশ মানুষের বাবা অজ্ঞাত—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর কোনো সুযোগ নেই। একইভাবে ১.৭ শতাংশের বিপরীতে সরাসরি ৯৮.৩ শতাংশ মানুষের ‘পিতৃপরিচয় জানা আছে’—এমন সিদ্ধান্তও টানা ঠিক হবে না।

তবে ইউরোপে ‘বিয়ের বাইরে জন্ম’ নিয়ে আলাদা একটি পরিসংখ্যান রয়েছে। এই পরিসংখ্যানকে ‘বাবার পরিচয় নেই’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হলে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের সরকারি পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের Marriage and divorce statistics–এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে সুইডেনে মোট জীবিত জন্মের ৫৭.১ শতাংশ হয়েছে বিয়ের বাইরে। অর্থাৎ, শিশুটির জন্মের সময় তার মা-বাবা আইনগতভাবে বিবাহিত ছিলেন না।

ইউরোস্ট্যাটের প্রতিবেদন দেখুনএখানে

ইউরোস্ট্যাটের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ‘births outside marriage’ বা বিয়ের বাইরে জন্মের মধ্যে অবিবাহিত কিন্তু একসঙ্গে বসবাসকারী দম্পতি, একক অভিভাবক এবং নিবন্ধিত পার্টনারশিপে থাকা দম্পতির সন্তানও অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।

২০২৪ সালে সুইডেন ছাড়াও ফ্রান্স, পর্তুগাল, বুলগেরিয়া, স্লোভেনিয়া ও এস্তোনিয়ায় বিয়ের বাইরে জন্ম নেওয়া শিশুর সংখ্যা বিয়ের মধ্যে জন্ম নেওয়া শিশুর চেয়ে বেশি ছিল।

সুইডেনে বিয়ে না করে একসঙ্গে বসবাসকারী দম্পতিদের ক্ষেত্রে ‘sambo’ শব্দটি প্রচলিত। দেশটির জাতীয় পরিসংখ্যান সংস্থা স্ট্যাটিসটিক্স সুইডেন বা SCB-এর সংজ্ঞায়, বিবাহিত বা নিবন্ধিত পার্টনার না হয়েও একই ঘরে দাম্পত্য সম্পর্কের মতো করে বসবাসকারী ব্যক্তিদের ‘cohabitant’ হিসেবে গণনা করা হয়। একই ঘরে বসবাসকারী এবং যৌথ সন্তান রয়েছে—এমন অবিবাহিত ব্যক্তিরাও এর অন্তর্ভুক্ত।

অর্থাৎ, কোনো শিশুর জন্মের সময় তার বাবা-মা বিবাহিত ছিলেন না—এমন তথ্যের অর্থ এই নয় যে শিশুটির বাবা কে, তা জানা নেই।

সুইডেনের আইনেও বিষয় দুটি আলাদা।

দেশটির Parental Code বা Föräldrabalk (1949:381) অনুযায়ী, শিশুর জন্মের সময় তার মা কোনো পুরুষের সঙ্গে বিবাহিত থাকলে সাধারণভাবে ওই ব্যক্তিকে শিশুটির বাবা হিসেবে গণ্য করা হয়। মা বিবাহিত না থাকলে পিতৃত্ব আলাদাভাবে নিশ্চিত বা প্রতিষ্ঠার ব্যবস্থা রয়েছে।

আইনটি দেখুনএখানে

সুইডিশ কর কর্তৃপক্ষ Skatteverket-এর নির্দেশনা অনুযায়ী, অবিবাহিত বাবা-মায়ের ক্ষেত্রে সন্তানের পিতৃত্ব বা parenthood তাদের ডিজিটাল সেবার মাধ্যমে নিশ্চিত করা যায়। শিশুর জন্মের ১৪ দিনের মধ্যে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সম্ভব। তা না হলে সংশ্লিষ্ট পৌরসভার Social Welfare Board বা ‘socialnämnd’-এর মাধ্যমে পিতৃত্ব নিশ্চিত করার ব্যবস্থা রয়েছে। প্রয়োজন হলে আদালতের মাধ্যমেও পিতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা যায়।

Skatteverket-এর নির্দেশিকা দেখুনএখানে

সুইডিশ আইনে আরও বলা হয়েছে, কোনো শিশুর বাবা বিবাহসূত্রে নির্ধারিত না থাকলে এবং শিশুটি সুইডেনে বসবাস করলে সংশ্লিষ্ট Social Welfare Board-এর দায়িত্ব হলো পিতৃত্ব নির্ধারণে প্রয়োজনীয় অনুসন্ধান করা এবং তা প্রতিষ্ঠার ব্যবস্থা নেওয়া।

ফলে সুইডেনে বিয়ে না করে একসঙ্গে বসবাস করা কিংবা বিয়ের বাইরে সন্তান জন্ম নেওয়াকে ‘বাবার পরিচয় নেই’ বলে ব্যাখ্যা করা সঠিক নয়।

‘৭২ শতাংশ’ সংখ্যাটির উৎস সম্পর্কে জানতে নুরুল ইসলাম সাদ্দামের সঙ্গে যোগাযোগ করে দ্য ডিসেন্ট। তিনি বলেন, “কোনো একটা লেখাতে পড়েছিলাম। এখন সোর্সটা মনে নেই। তবে তথ্যটা হয়তো সঠিক ছিল না। মিসটেক (ভুল) হয়েছে।”

তথ্যসূত্র: দ্যা ডিসেন্ট