রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় পিস্তল হাতে মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়া মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনকে পদ ছাড়তে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সরকারের ঊর্ধ্বতন একাধিক সূত্র প্রথম আলোকে এ কথা জানিয়েছে। তবে রোববার রাত পর্যন্ত সরকারের কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তি বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেননি।
বৈঠকের পর ডেকে নেওয়া
সূত্রগুলোর ভাষ্য, রোববার বিকেলে সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষ হলে প্রধানমন্ত্রী ইশরাককে আলাদা করে ডেকে নেন। সেখানেই তাঁকে সরে দাঁড়ানোর কথা জানানো হয়।
শনিবার গেন্ডারিয়ার ঘটনার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই বিএনপি ও সরকারের অভ্যন্তরে অস্বস্তি দেখা দেয়। দলের নেতা ও সরকারসংশ্লিষ্টদের অনেকের বক্তব্য, মাদকের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া দোষের নয়; কিন্তু একজন প্রতিমন্ত্রী প্রশাসনকে কাজে লাগানোর বদলে নিজেই অস্ত্র হাতে মাঠে নামবেন, এটা মেনে নেওয়া যায় না। বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির এক সদস্য বলেন, বিষয়টি আর ইশরাকের ব্যক্তিগত পরিসরে নেই। এতে প্রধানমন্ত্রীসহ গোটা মন্ত্রিসভা বিব্রত, ফলে দায়ও সবাইকে বইতে হবে।
সময়টাও সরকারের জন্য অস্বস্তিকর ছিল। ওই দিনই সকাল থেকে দুপুরের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী নিজে রাজধানীর ১৩টি জায়গায় আকস্মিক পরিদর্শনে গিয়েছিলেন। হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি আবাসিক এলাকায় পরিচ্ছন্নতা ও সেবার মান নিয়ে নির্দেশ দেন, কিছু জায়গায় সংশোধনের সময়সীমাও ঠিক করে দেন। দলের কয়েকজনের মতে, বিকেলের অস্ত্রকাণ্ডে সেই উদ্যোগের আলোচনা প্রায় চাপা পড়ে যায়। সরকারের ভেতরে অনেকে তাই এই সিদ্ধান্তকে মন্ত্রীদের আচরণ ও জবাবদিহি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কড়া বার্তা হিসেবে দেখছেন।
ভিডিওতে যা ধরা পড়েছে
ইশরাকের নিজের ফেসবুক পেজে দেওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, গাড়ি থেকে নেমেই তিনি পিস্তল তুলে কয়েকজনকে ধরতে বলছেন। পাশ থেকে একজনকে গুলি করার হুমকি দিতে শোনা যায়, যাঁর পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। দেহরক্ষীরা কয়েকজনের পেছনে ছোটেন, একজন এক তরুণকে লাথি মারেন। আটক কয়েকজনকে বলতে শোনা যায়, তাঁরা নির্দোষ ও গরিব মানুষ। আরেকটি ভিডিওতে আটকদের পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার দৃশ্য আছে।
প্রথম আলোর তথ্য অনুযায়ী, প্রতিমন্ত্রীর ব্যক্তিগতভাবে রাখা দুই দেহরক্ষী তোফাজ্জল হোসেন ও লাভলু এবং একজন সরকারি নিরাপত্তারক্ষী সেখানে ছিলেন। ব্যক্তিগত দেহরক্ষীদের কাছেও অস্ত্র ছিল। ভিডিওর কোনো কোনো অংশে ইশরাকের হাতের পিস্তল ঝাপসা করা হলেও অন্য অংশে তা পরিষ্কার দেখা গেছে।
তদন্ত চলছে
ডিএমপির গোয়েন্দা প্রধান শফিকুল ইসলাম রোববার সংবাদ সম্মেলনে জানান, ঘটনাটি তদন্তের ভার পেয়েছেন ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনার। আইন ভাঙা হয়েছে কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে; প্রমাণ মিললে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের আগ্নেয়াস্ত্র লাইসেন্স নীতিমালার ২৫ অনুচ্ছেদে আত্মরক্ষার জন্য বৈধ অস্ত্র বহনের সুযোগ আছে। তবে এমনভাবে অস্ত্র দেখানো যাবে না, যাতে অন্যের মনে ভীতি বা বিরক্তি তৈরি হয়।
ইশরাকের বক্তব্য
রোববার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া বিবৃতিতে ইশরাক জানান, পুলিশ এবং স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতাদের সম্মিলিত সিদ্ধান্তে নেওয়া একটি সামাজিক প্রতিরোধ কর্মসূচিতে অংশ নিতেই তিনি সেখানে গিয়েছিলেন। তাঁর দাবি, গেন্ডারিয়ায় মাদক কারবারের অভিযোগ পেয়ে তিনি আগে থেকেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে কথা বলছিলেন, জনবল বাড়ানো ও স্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ি বসানোর উদ্যোগও নিয়েছিলেন, কিন্তু কাজ হয়নি।
তিনি বলেন, অভিযানের আগে খবর আসে, মাদক কারবারিরা ছাদ থেকে গুলি ছুড়তে পারে। এক অস্থায়ী আস্তানার কাছে গেলে ৩০ থেকে ৩৫ জন চিৎকার করতে করতে তাঁদের গাড়িবহরের দিকে তেড়ে আসে। হামলার আশঙ্কায় তিনি ও সরকারি নিরাপত্তারক্ষীরা কিছুক্ষণের জন্য অস্ত্র তোলেন এবং পরিস্থিতি শান্ত হলে নামিয়ে ফেলেন। তাঁর দাবি, অস্ত্রটি বৈধ ও লাইসেন্সকৃত, আইনের কোনো লঙ্ঘন হয়নি।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, অভিযানে চার-পাঁচটি অস্থায়ী আস্তানা ভাঙা হয়েছে। মাদক, অস্ত্র, নগদ টাকা ও ছিনতাইয়ের মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়েছে এবং ছয়জনকে আটক করে পুলিশে দেওয়া হয়েছে। এসব তথ্য বাদ দিয়ে কিছু গণমাধ্যম ঘটনার একাংশ প্রচার করেছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। মাদকবিরোধী তৎপরতা চালিয়ে যাওয়ার কথাও জানান তিনি।
পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় নিয়ে প্রশ্ন
পুলিশ সমন্বয়ের বিষয়ে ইশরাকের দাবি অবশ্য পুলিশের বক্তব্যের সঙ্গে মেলে না। শনিবার ওয়ারী বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার মাসুদ রানা সাংবাদিকদের বলেন, প্রতিমন্ত্রী আগে থেকে পুলিশকে কিছু জানাননি, পরে তাঁরা ঘটনা জেনেছেন। ইশরাক নিজেও সেদিন বলেছিলেন, স্পটে পৌঁছানোর প্রায় ১০ মিনিট পর তিনি পুলিশকে আসতে বলেন।
আড়াই সপ্তাহে দ্বিতীয় ঘটনা
এর আগে একই ধরনের পরিস্থিতিতে পদ ছাড়তে হয়েছে বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে। ২৫ সেপ্টেম্বর মিরপুরের রাড্ডা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে হামলা, লুটপাট ও ভবন ভাঙচুরের ঘটনায় তাঁর ঘনিষ্ঠ স্থানীয় বিএনপি ও যুবদল নেতাদের নাম আসে। তিনি জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পর ১ অক্টোবর তিনি স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র দেন এবং সংসদ সচিবালয় পরে আসনটি শূন্য ঘোষণা করে।