এইচএসসি পদার্থবিজ্ঞান প্রশ্ন: সৃজনশীলতার নামে জুলুম নাকি প্রকৃত মূল্যায়ন?

Share

আজকের এইচএসসি পদার্থবিজ্ঞান পরীক্ষার প্রশ্নপত্র নিয়ে যে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে, তা আসলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার একটা গভীর সংকটের প্রতিচ্ছবি। প্রশ্নটা যতটা না কঠিন, তার চেয়ে বেশি অস্বস্তিকর এই কারণে যে, এটা আমাদের প্রকৃত প্রস্তুতির সাথে খাপ খায়নি।

বাংলাদেশের অধিকাংশ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে টাইপভিত্তিক অঙ্ক আর বিগত বছরের বোর্ড প্রশ্ন বিশ্লেষণ করে। এটা তাদের দোষ নয়– এটাই আমাদের প্রচলিত পদ্ধতি, যা শিক্ষকরাই শিখিয়ে এসেছেন বছরের পর বছর। পদার্থবিজ্ঞান এমনিতেই বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের কাছে আতঙ্কের বিষয়। তার ওপর যখন প্রশ্নটা একটু ঘুরিয়ে, সৃজনশীলভাবে করা হয়, তখন সেই ভীতি আরও বহুগুণ বেড়ে যায়।

সমস্যাটা প্রশ্নে নয়, সমস্যাটা প্রস্তুতিতে। আমাদের দেশের বেশিরভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমন সৃজনশীল শিক্ষকের সংখ্যা হাতে গোনা। শিক্ষার্থীদের মৌলিক ভিত্তি এতটা মজবুত নয় যে তারা প্রথাগত ধরনের বাইরে গিয়ে একটা প্রশ্নের সমাধান করতে পারবে। ফলাফল যা হওয়ার তাই হয়েছে– যারা সত্যিকার অর্থে পড়ুয়া এবং যাদের বোঝার ক্ষমতা প্রখর, তারা ছাড়া বাকি সবার কনফিডেন্স তলানিতে ঠেকেছে। অনেক শিক্ষার্থীর স্বপ্ন আজ একরকম ভেঙে পড়ল।

নটরডেম কলেজের মতো প্রতিষ্ঠানের প্রশ্নমান আর সারাদেশের গড় প্রস্তুতির মান এক নয়– এটা গুলিয়ে ফেললে যে সর্বনাশ হতে পারে, আজ তারই বাস্তব প্রমাণ পাওয়া গেল। এর আগে ২০১৮ সালে সারাদেশে একই প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়ার পরীক্ষা-নিরীক্ষাও একইরকম বিপর্যয় ডেকে এনেছিল।

শিক্ষামন্ত্রীর নকলমুক্ত পরীক্ষা নিশ্চিত করার আন্তরিকতা প্রশংসনীয়। কিন্তু সেই একই মাত্রার আন্তরিকতা যদি শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সৃজনশীল করে তোলা এবং শিক্ষাব্যবস্থার সামগ্রিক মান উন্নয়নে ব্যয় করা হতো, তাহলে আজকের এই ফলাফল হতো ভিন্ন। প্রশ্নের ধরন বদলে দেওয়ার আগে শিক্ষকদের প্রস্তুত করা, শ্রেণিকক্ষের পাঠদান পদ্ধতি বদলানো জরুরি ছিল– আগে বীজ বোনা, তারপর ফসলের প্রত্যাশা করা।

প্রস্তুতি ছাড়া হঠাৎ প্রত্যাশার মান বাড়িয়ে দেওয়া, আর তার ফল দিয়ে একঝাঁক শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ বিচার করা– এটা মূল্যায়ন নয়, এক ধরনের স্পষ্ট জুলুম ছাড়া আর কিছু নয়।

লিখেছেন: রেজাউল সরকার রনি,
সাবেক শিক্ষার্থী, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।