সাংবাদিক নিজের অধিকার নিয়ে কথা বললেই কেন এত ভয়?

Share

বাংলাদেশে এমন কিছু গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান আছে, যারা চায় না তাদের সাংবাদিকরা নিজেদের অধিকার নিয়ে কথা বলুক। আরও ভয়—সেই সাংবাদিক যদি পেশাজীবী সংগঠনের নেতৃত্বে আসে, সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধ করে অধিকার আদায়ের কথা বলে!

নিয়োগের সময়ই অনেক ক্ষেত্রে শর্ত দেওয়া হয়—পেশাজীবী সংগঠনের নির্বাচনে অংশ নেওয়া যাবে না, কোনো সংগঠনের নেতৃত্ব দেওয়া যাবে না। প্রশ্ন হলো, একজন সাংবাদিকের পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নিজের পেশার অধিকার নিয়ে কথা বলার স্বাধীনতাটুকুও কি থাকবে না?

কারণ সাংবাদিকরা যদি ঐক্যবদ্ধ হয়ে যায়, তাহলে সুবিধাবাদীদের অনেক হিসাবই বদলে যাবে।
কম বেতনে দিনের পর দিন সাংবাদিককে খাটানো, সময়মতো বেতন না দেওয়া, কমিশনের নামে বছরের পর বছর পাওনা আটকে রাখা, চাকরির ভয় দেখিয়ে অন্যায় মেনে নিতে বাধ্য করা—এসবের বিরুদ্ধে সাংবাদিকরা যদি একসঙ্গে দাঁড়ায়, তাহলে তো অনেকেরই সমস্যা হবে।
সাংবাদিকদের দুর্বল রাখলে তাদের ব্যবহার করা সহজ।
সাংবাদিকদের বিভক্ত রাখলে তাদের অধিকার কেড়ে নেওয়া সহজ।

আর সাংবাদিকরা সংগঠিত হয়ে গেলে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা কঠিন হয়ে যায় না—বরং অন্যায় করাটাই কঠিন হয়ে যায়।

গতকাল বরিশালের সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জির আত্মহত্যার খবর আমাদের আবারও ভাবিয়ে তুলেছে। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, তিনি আলাদা কাগজে পাঁচটি সুইসাইড নোট লিখে গেছেন। একটি নোটে লিখেছেন, তাঁর মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নন। অন্য চারটি নোট লিখেছেন স্ত্রী, ভাই, সমকালের আঞ্চলিক কার্যালয়ের প্রধান এবং বরিশাল প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদককে উদ্দেশ করে।

পুলক চ্যাটার্জি শুধু একজন সাংবাদিক ছিলেন না; তিনি সাংবাদিকদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনেও নেতৃত্ব দিয়েছেন। বরিশাল প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে সাংবাদিকদের পাশে দাঁড়িয়েছেন, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনেও সক্রিয় ছিলেন।
বরিশাল প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসেনের ভাষায়, পুলক সাংবাদিকদের অধিকার আদায়ে অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে নেতৃত্ব দিয়েছেন। জেলা মহিলা পরিষদের সভাপতি শাহ সাজেদাও তাঁকে বরিশালের সাংবাদিকতা অঙ্গনের একজন উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে স্মরণ করেছেন।একজন সাংবাদিকের এমন চলে যাওয়া শুধু শোকের বিষয় নয়—এটি আমাদের নিজেদের দিকেও তাকানোর সময়।

একজন সাংবাদিক কতটা চাপের মধ্যে থাকলে নিজের জীবন শেষ করার মতো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন—সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি।

তবে আত্মহত্যার কারণ নিয়ে কোনো অনুমান বা কাউকে দায়ী করার আগে তদন্তের ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করা উচিত। কিন্তু এই ঘটনা আমাদের অন্তত একটি প্রশ্ন করতেই পারে— সাংবাদিকদের আমরা শুধু খবর সংগ্রহ ও প্রচারের যন্ত্র হিসেবে দেখতে চাই, নাকি তাঁদেরও ন্যায্য অধিকার, মর্যাদা, নিরাপত্তা ও সংগঠিত হওয়ার স্বাধীনতা আছে—এটা মেনে নিতে চাই?

সাংবাদিকের কলম অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলে।
সেই সাংবাদিক যখন নিজের অধিকার নিয়ে কথা বলতে চায়, তখন তার কণ্ঠরোধের চেষ্টা কেন?
সাংবাদিকদের ঐক্য কোনো অপরাধ নয়।

পেশাজীবী সংগঠনে নেতৃত্ব দেওয়া কোনো অপরাধ নয়।
নিজের ন্যায্য অধিকার দাবি করাও কোনো অপরাধ নয়।
বরং একজন সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় শক্তি হওয়া উচিত—তার সততা, স্বাধীনতা এবং সহকর্মীদের পাশে দাঁড়ানোর সাহস।

নবীন হাসান
সহ-সাধারণ সম্পাদক ঠাকুরগাঁও প্রেসক্লাব।