বাংলাদেশ কেন বারবার জ্বালানি সংকটে পড়ে?

Share

অনু মুহাম্মদ-এর সাক্ষাৎকার ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০ সাক্ষাৎকার গ্রহণে: খাইরুল হাসান জহিন। সাক্ষাৎকারটি ডেইলি স্টার পত্রিকা থেকে অনূদিত।

জ্বালানি খাতে কয়েক দশকের বিনিয়োগ সত্ত্বেও বাংলাদেশ কেন ক্রমাগত গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র ঘাটতিতে আটকা পড়ে আছে? এই সংকটের পেছনের নীতি নির্ধারণী সিদ্ধান্ত, আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরতা এবং কেন তিনি মনে করেন দেশীয় গ্যাস, শক্তিশালী জাতীয় প্রতিষ্ঠান ও নবায়নযোগ্য শক্তি একটি ভিন্ন পথ দেখাতে পারে—এ নিয়ে দ্য ডেইলি স্টার-এর সাথে কথা বলেছেন অর্থনীতিবিদ ও জ্বালানি আন্দোলনকর্মী প্রফেসর অনু মুহাম্মদ।

দ্য ডেইলি স্টার (টিডিএস): বাংলাদেশ বর্তমানে একই সাথে তীব্র গ্যাস সংকট ও লোডশেডিংয়ের মুখোমুখি। এই দ্বৈত সংকট দেশের জ্বালানি ব্যবস্থা সম্পর্কে আমাদের কী বার্তা দেয়?

অনু মুহাম্মদ (এএম): দিনের পর দিন গ্যাস থাকছে না। পাশাপাশি প্রতিদিন চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা লোডশেডিং সইতে হচ্ছে। গ্যাস ও বিদ্যুৎ—উভয় খাতেই একসাথে এমন সংকট এর আগে আমি কখনও দেখিনি।

এটি সত্য যে এই সংকটের সূচনা বর্তমান সরকারের সময়ে নয়। যে নীতিগুলোর কারণে আজ এই পরিস্থিতি, তার গোড়াপত্তন হয়েছিল ১৯৯০-এর দশকে। নব্বইয়ের দশকে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবি এবং জাইকার (JICA) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় এক নব্য-উদারবাদী কাঠামোর ওপর ভর করে এই নীতিগুলো তৈরি হয়। এর মূল লক্ষ্য ছিল সম্পূর্ণ খাতটিকে বেসরকারি, বিশেষ করে বিদেশি কোম্পানির জন্য উন্মুক্ত করা এবং মূলত মুনাফার সম্ভাবনা দিয়েই যেকোনো বিনিয়োগ বিবেচনা করা।

এই নীতিগত কাঠামোতে জাতীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর খুব কমই জোর দেওয়া হয়েছে। নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে ‘প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট’ (পিএসসি) ব্যবস্থার মাধ্যমে বিদেশি কোম্পানিগুলোর আগমন ঘটে, কিন্তু সেই গতিতে আমাদের জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকাশ ঘটেনি। জনস্বার্থকে পেছনে ফেলে বেসরকারি মুনাফাকেই সেখানে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল।

শেখ হাসিনার শাসনামলে এই নীতি আরও এক ধাপ এগিয়ে যায়। ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পরপরই তার সরকার ‘কনকোফিলিপস’ (ConocoPhillips)-এর সাথে চুক্তি সইয়ের উদ্যোগ নেয়। বাংলাদেশের বঙ্গোপসাগরে বেশ কয়েকটি আশাব্যঞ্জক অফশোর (সমুদ্র) ব্লক রয়েছে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ মিয়ানমার ও ভারত একই ধরণের ভূতাত্ত্বিক এলাকায় প্রচুর গ্যাস পেয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশ আজ পর্যন্ত নিজস্ব সামুদ্রিক সম্পদ সঠিকভাবে অনুসন্ধানই করতে পারল না। তৎকালীন সরকার তীব্র লোডশেডিংয়ের অজুহাত দেখিয়ে দ্রুত সমাধানের কথা বলে চুক্তিটি সই করতে চেয়েছিল। এরপর থেকে প্রতিটি বড় ও বিতর্কিত সিদ্ধান্ত ঢাকার জন্য এই “দ্রুত সমাধান”-এর যুক্তিকেই বারবার ব্যবহার করা হয়েছে।

আমরা এই চুক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিলাম কারণ এটি বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী ছিল। সরকার শক্তির প্রয়োগ ঘটিয়ে সে আন্দোলন দমন করে এবং চুক্তি সই করে। পরবর্তীতে দেখা গেল কনকোফিলিপস নিজে সব কাজ করছেই না; তারা একটি চীনা কোম্পানিকে সাব-কন্ট্রাক্ট দিল। চীনা কোম্পানিটি এসে কিছু প্রাথমিক কাজ করে চলে গেল। সেই কাঙ্ক্ষিত “দ্রুত সমাধান” আর কখনোই এলো না।

তবে কনকোফিলিপস ঠিকই লাভবান হলো; চুক্তিটি সই হওয়ার পর বাজারে তাদের শেয়ারের দাম বেড়ে যায়। সেটি ছিল ২০০৯ সালের কথা, আর আজ ২০২৬ সাল। সরকার যদি সেদিন আমাদের প্রস্তাবিত বিকল্প পথ অবলম্বন করত, তবে আজ আমাদের সমুদ্রের গ্যাস জাতীয় নিয়ন্ত্রণে থেকে দেশের ব্যবহারে আসতে পারত।

টিডিএস: ২০১০ সালের পাওয়ার সেক্টর মাস্টার প্ল্যান (PSMP) বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের দীর্ঘমেয়াদী দিকনির্দেশনা দেওয়ার কথা ছিল এবং এর বড় অংশ বাস্তবায়িতও হয়েছে। আজকের পরিস্থিতি দেখে সেই নির্বাচিত দিকনির্দেশনা সম্পর্কে কী মূল্যায়ন করবেন?

অনু মুহাম্মদ: ২০১০ সালে দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে: একটি হলো জ্বালানি খাতের জন্য দায়মুক্তি আইন (ইন্ডেমনিটি) পাস এবং অন্যটি জাইকা (JICA) কর্তৃক প্রস্তুতকৃত পাওয়ার সেক্টর মাস্টার প্ল্যান। সবচেয়ে তাজ্জব বিষয় হলো—বাংলাদেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের এই মাস্টার প্ল্যান প্রণয়নকারী কমিটিতে একজন বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞকেও রাখা হয়নি!

সেই প্ল্যানে বাংলাদেশকে তিনটি পথ দেখানো হয়েছিল: তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ এবং পারমাণবিক বিদ্যুৎ। সেখানে নবায়নযোগ্য শক্তি ছিল একেবারে প্রান্তিক পর্যায়ে, আর জাতীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির দিকে কোনো নজরই দেওয়া হয়নি। সেই পথ ধরে সরকার যুক্তরাষ্ট্রসহ বিদেশি কোম্পানির সাথে এলএনজি টার্মিনাল বানাল, এলপিজির ব্যবহার বাড়াল, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি করল এবং পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ শুরু করল। আর এসব প্রকল্পের জন্য নেওয়া হলো বিপুল অঙ্কের বৈদেশিক ঋণ।

আজ কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি হয়েছে, এলএনজি আমদানি করা হচ্ছে এবং পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজও এগিয়েছে। অথচ বাংলাদেশ আজ গ্যাস ও বিদ্যুৎ উভয় খাতেই তীব্র সংকটে। ঠিক এই কারণেই মাস্টার প্ল্যানের পেছনের মৌলিক ধারণাগুলোকে নতুন করে খতিয়ে দেখা দরকার। এই প্রকল্পগুলোকে আমাদের জ্বালানি সমস্যার একমাত্র সমাধান হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল, কিন্তু কোটি কোটি টাকা ঢালার পরও সংকট পিছু ছাড়েনি।

আমাদের আরও প্রশ্ন তোলা দরকার—কেন কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো প্রাক্কলন অনুযায়ী চলতে পারছে না এবং পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কেন বারবার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে? নিরাপত্তা ও কারিগরি ত্রুটি নিয়ে অনেক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, যার মধ্যে সেফটি ভালভ সংক্রান্ত সমস্যাও রয়েছে। আমরা শুরু থেকেই পারমাণবিক প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলাম, কিন্তু সমালোচনার কোনো সুযোগ রাখা হয়নি। এমনকি গণমাধ্যমের একটি অংশও এটিকে “জাতীয় গর্বের” প্রতীক বানিয়ে ফেলায় প্রশ্ন তুলতে দ্বিধাবোধ করেছিল।

কয়লা প্রকল্প নীতিমালার সবচেয়ে বড় ও স্পষ্ট উদাহরণ হলো রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র। সুন্দরবনের সন্নিকটে প্রস্তাবিত এই বিদ্যুৎকেন্দ্র কেন্দ্র করে দেশে-বিদেশে দীর্ঘস্থায়ী আন্দোলন, ধর্মঘট ও বিক্ষোভ হয়। আমরা বারবার যুক্তি দিয়েছিলাম যে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বহু বিকল্প আছে, কিন্তু আমাদের সুন্দরবনের কোনো বিকল্প নেই। অথচ সরকার শোনেনি; ফলস্বরূপ বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন ও ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট সুন্দরবন মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।

টিডিএস: গ্যাস সংকট মেটাতে এলএনজিকে প্রায়শই একটি “দ্রুত সমাধান” হিসেবে তুলে ধরা হয়। কিন্তু আমদানিকৃত এলএনজিকে জ্বালানি কাঠামোর মূল ভিত্তি বানানোর দীর্ঘমেয়াদী পরিণতি কী হতে পারে?

অনু মুহাম্মদ: হ্যাঁ, এলএনজিকে প্রায়ই একটি সাময়িক পথ হিসেবে দেখানো হয় যা স্বল্পমেয়াদী সংকট মেটাতে পারে। কিন্তু এর দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক, পরিবেশগত এবং জ্বালানি-নিরাপত্তাজনিত ক্ষতির দিকটি আমাদের ভাবতেই হবে। দশকের পর দশক আমদানিকৃত গ্যাসের ওপর নির্ভর করে চলা কোনো যুক্তিসঙ্গত বা টেকসই কৌশল হতে পারে না।

প্রথমত, আমাদের নিজস্ব গ্যাসের তুলনায় এলএনজির খরচ অতিরিক্ত বেশি; নিজস্ব উৎস থেকে গ্যাস অনুসন্ধানের খরচের তুলনায় আমদানিকৃত এলএনজির পেছনে প্রায় ৬০ গুণ বেশি খরচ হয়। এটি অর্থনৈতিকভাবে পুরোপুরি অসমর্থনযোগ্য। দ্বিতীয়ত, এলএনজির অবকাঠামো স্থানীয় পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করে। তৃতীয়ত, এলএনজি নির্ভরতার কারণে বাংলাদেশকে বিশ্ববাজারের ওঠানামার ওপর জিম্মি থাকতে হয়, যা নিয়ন্ত্রণে আমাদের কোনো হাত নেই।

এর কারিগরি দুর্বলতাও প্রকট। বাংলাদেশে বর্তমানে মাত্র দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল রয়েছে। এর একটি নষ্ট হলে মেরামত করতে এক থেকে দেড় মাস সময় লেগে যায়। ‘এক্সেলরেট এনার্জি’র টার্মিনাল যদি বারবার বিকল হয়, তবে সরকারের উচিত এর সঠিক কারণ অনুসন্ধান করা এবং দীর্ঘ মেরামত প্রক্রিয়ার জন্য তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা। কিন্তু আমরা কী দেখছি? তাদেরকেই শাস্তি না দিয়ে উল্টো সেই কোম্পানির সাথেই আরও নতুন চুক্তি সইয়ের তোড়জোড় চলছে!

সুতরাং, আমদানিভিত্তিক এলএনজি ব্যবস্থা অত্যন্ত ব্যয়বহুল, পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর এবং কারিগরিভাবে অত্যন্ত ভঙ্গুর। এই ব্যবস্থার সম্প্রসারণ বাংলাদেশের জন্য গভীর অনিশ্চয়তা ও বিপুল আর্থিক বোঝার কারণ হবে।

টিডিএস: বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তন হলেও জ্বালানি নীতির মূল কাঠামো অপরিবর্তিত থাকে কেন?

অনু মুহাম্মদ: কারণ সরকার পরিবর্তন হলেও পেছনের কায়েমি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীগুলো একই থেকে যায়। অনেকেই ভাবেন শেখ হাসিনার সরকার শুধু ভারতকে তোষণ করার চেষ্টা করেছে। তথ্যটি পুরোপুরি ঠিক নয়। তার শাসনামলে চীনা প্রকল্প ও বিনিয়োগ অভূতপূর্ব মাত্রায় পৌঁছেছিল, আবার যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানির সাথে বেশিরভাগ এলএনজি চুক্তিও তার সময়েই হয়েছিল।

ক্ষমতা পরিবর্তনের পর অনেকে আশা করেছিলেন যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই প্রকল্পগুলো পুনর্বিবেচনা করবে এবং নীতির গতিপথ পরিবর্তন করবে। কিন্তু তা হয়নি। নীতি নির্ধারণের কলকাঠি যারা নাড়ে—সেই আমলাতন্ত্র, বড় ব্যবসায়ী এবং বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবি ও জাইকার মতো সংস্থাগুলো আগের মতোই সক্রিয় রয়ে গেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকার সেই পুরনো নীতিগুলোকেই আরও কঠোরভাবে সামনে ঠেলে দিয়েছে।

আমরা শেখ হাসিনার শাসনকে স্বৈরাচারী বলি, তবে এই স্বৈরাচারের একটি শক্ত অর্থনৈতিক ভিত্তিও ছিল। কে রাষ্ট্রীয় চুক্তি পাবে, কোন ব্যবসা রাজনৈতিক সুরক্ষা পাবে এবং কারা ক্ষমতার কাছাকাছি থেকে সুবিধা ভোগ করবে—সবকিছুই এর সাথে যুক্ত ছিল। সেই অর্থনৈতিক কাঠামো রক্ষা করার জন্যই প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করা হয়েছিল এবং জবাবদিহিতা তুলে নেওয়া হয়েছিল। শেখ হাসিনার আমলে যা ঘটেছে গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ, ভিন্নমত দমন, গ্রেপ্তার, গুম ও হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে।

তার পতনের পর মানুষের প্রত্যাশা শুধু সরকার বদল ছিল না, পুরো ব্যবস্থার অবসান ছিল। কিন্তু সেই অর্থনৈতিক কাঠামো ভাঙতে অন্তর্বর্তী সরকার ব্যর্থ হয়েছে, আর বর্তমান সরকারও যে তা থেকে বের হয়ে আসছে—এমন কোনো লক্ষণ আমি দেখছি না। আশঙ্কা হচ্ছে, কোনো গণতান্ত্রিক উত্তরণের বদলে কেবল এক দলভুক্ত ব্যবসায়িক এলিটদের জায়গায় অন্য দলভুক্ত এলিটদের প্রতিস্থাপন ঘটছে।

টিডিএস: বাংলাদেশ কয়েক দশক ধরে দেশীয় সক্ষমতার অভাবের অজুহাত দেখিয়ে বিদেশি কোম্পানির ওপর নির্ভর করে আসছে। কিন্তু এতদিন পরও দেশ নিজের সক্ষমতা কেন তৈরি করতে পারল না?

অনু মুহাম্মদ: আমার জানা মতে, বাপেক্স (BAPEX) ও পেট্রোবাংলা বারবার বাপেক্সকে শক্তিশালী করা এবং কারিগরি সক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। অথচ এই প্রতিষ্ঠানগুলোর ভেতরে যেসব কর্মকর্তা নিজস্ব সক্ষমতা তৈরির পক্ষে কথা বলেন, তাদের প্রায়ই কোণঠাসা করা হয় কিংবা বদলি করে দেওয়া হয়। পরিশেষে এটি একটি রাজনৈতিক সদিচ্ছার বিষয়। জ্বালানি নীতি যদি শক্তিশালী করপোরেট স্বার্থ দ্বারা পরিচালিত হয়, তবে জাতীয় প্রতিষ্ঠান তৈরি করা কখনোই সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় থাকবে না।

আশির দশক থেকে প্রতিটি সরকার একই কথা আওড়ে আসছে: “আমাদের সক্ষমতা নেই, তাই বিদেশি কোম্পানি লাগবে।” কিন্তু অলস বসে থেকে অপেক্ষায় থাকলে সক্ষমতা নিজে থেকে তৈরি হয় না; এটি গড়ে তুলতে হয়।

নরওয়ের দিকে তাকান। ষাটের দশকের শেষের দিকে যখন তারা তেল পেল, শুরুতে তারা প্রযুক্তি ও জ্ঞানের জন্য বিদেশি কোম্পানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু সেই সময়টিকে তারা নিজেদের প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তিগত জ্ঞান এবং মানবসম্পদ গড়ে তুলতে ব্যবহার করেছিল। ভারত গড়ে তুলেছে ওএনজিসি (ONGC), মালয়েশিয়া গড়েছে পেট্রোনাস (Petronas), আর চীন গড়ে তুলেছে বিশ্বমানের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি কোম্পানি। এদের কারোরই শুরুতেই সব সক্ষমতা ছিল না। সময়ের সাথে সাথে তারা তা তৈরি করেছে।

অথচ বাংলাদেশে “সক্ষমতার অভাব”-কে চিরস্থায়ী পরাধীনতার বাহানা বানিয়ে ফেলা হয়েছে। শাসকগোষ্ঠীর মুখে প্রায়ই শুনি বাংলাদেশ নাকি “পরবর্তী সিঙ্গাপুর” হবে; কিন্তু সিঙ্গাপুর নিজের প্রতিষ্ঠান তৈরিতে নিজেদের অক্ষম মনে করে বসে থাকেনি, বরং শক্তিশালী ভিত্তি গড়ে তুলেছিল।

বুয়েটের (BUET) একজন শিক্ষকও যখন বলেন যে বাংলাদেশের এই সক্ষমতা তৈরির সুযোগ নেই, তখন আমার প্রশ্ন জাগে—তবে বুয়েট কেন আছে? এত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় কেন আছে? দেশের প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও বিশেষজ্ঞ তৈরি করাও এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম কাজ। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না কেন?

সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, “আমাদের সক্ষমতা নেই”—এটি একটি অন্ধবিশ্বাসে পরিণত হয়েছে। অনেক শিক্ষিত মানুষও না ভেবেই এটি মেনে নিচ্ছেন যে কেন বছরের পর বছর হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের পরও জাতীয় সক্ষমতা তৈরি হলো না। এটি আমাদের মধ্যে এক ধরনের হীনমন্যতা তৈরি করে এবং বিদেশি-পরিচালিত প্রকল্পের পথ সুগম করে দেয়।

টিডিএস: বছরের পর বছর ক্ষতিকর জ্বালানি প্রকল্পের বিরোধিতা করার পর ২০১৭ সালে আপনারা একটি ‘বিকল্প মাস্টার প্ল্যান’ প্রণয়ন শুরু করেন। বাংলাদেশের জ্বালানি ভবিষ্যতের জন্য আপনারা কী বিকল্প প্রস্তাব করেছিলেন?

অনু মুহাম্মদ: ফুলবাড়ী, কনকোফিলিপস কিংবা রামপালের মতো প্রকল্পের আমরা প্রতিবাদ করেছিলাম কারণ আমরা নিশ্চিত ছিলাম যে এগুলো দেশের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি করবে। কিন্তু বারবার শুধু বিরোধিতা করার পর আমরা অনুধাবন করলাম যে আমাদের একটি ইতিবাচক বিকল্প রূপরেখা দরকার। সেই চিন্তা থেকে ২০১৫ সালে আমরা ‘বিকল্প মাস্টার প্ল্যান’-এর কাজ শুরু করি এবং দুই বছর ধরে তা প্রস্তুত করি। ২০১৭ সালের জুলাইয়ে আমরা এর প্রথম খসড়া প্রকাশ করি।

এই কাজটিতে তিনটি দল অংশ নেয়: করপোরেট স্বার্থমুক্ত বাংলাদেশের স্বাধীন বিশেষজ্ঞ দল, জনস্বার্থ রক্ষা নিয়ে কাজ করা বিদেশি গবেষক এবং সংশ্লিষ্ট খাতের প্রবাসে কর্মরত বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞ।

আমরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলাম যে বাংলাদেশের এলএনজি আমদানি, কয়লা উত্তোলন, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ বা পারমাণবিক বিদ্যুতের কোনো প্রয়োজন নেই। এই প্রকল্পগুলো শুধু অপ্রয়োজনীয়ই নয়, দীর্ঘমেয়াদে আত্মঘাতী ও বিশাল বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। এর বদলে বাংলাদেশ নিজস্ব গ্যাসের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে এবং নবায়নযোগ্য শক্তির দ্রুত সম্প্রসারণ ঘটিয়ে নিজের চাহিদা মেটাতে পারে। এই সমন্বয়টি হবে সাশ্রয়ী, পরিবেশবান্ধব এবং টেকসই।

এখন আর কোনো সরকার বলতে পারবে না যে “আমাদের সামনে কোনো বিকল্প ছিল না।” আমরা এখন সেই প্ল্যানটি হালনাগাদ (আপডেট) করছি। নতুন তথ্য ও অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা আমাদের মূল যুক্তিগুলোকে আরও শক্তিশালী করেছে। এই রূপরেখা নিয়ে কাজ করতে আমরা খুব শীঘ্রই সভায় বসছি। ভিয়েতনাম, ভারত ও চীন কীভাবে এত দ্রুত নবায়নযোগ্য শক্তির প্রসার ঘটিয়েছে, আমরা তা গভীর মনোযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করছি।

নবায়নযোগ্য শক্তিতে রূপান্তর এখন সময়ের দাবি। তবে এটি সঠিকভাবে পরিচালনা করতে না পারলে অতীতে ‘সোলার হোম সিস্টেম’-এর যে দশা হয়েছিল, এখানেও তাই হতে পারে।

টিডিএস: বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট এই মুহূর্তের, অথচ বহু প্রস্তাবিত সমাধান বাস্তবায়ন হতে বছরের পর বছর লেগে যাবে। আগামী এক থেকে দুই বছরের মধ্যে বাস্তবে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব?

অনু মুহাম্মদ: আমাদের যে সক্ষমতা বর্তমানে আছে, তা সঠিকভাবে ব্যবহার করলে আগামী এক থেকে দুই বছরের মধ্যে স্থলভাগে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা সম্ভব। উদাহরণস্বরূপ, ভোলার গ্যাস অন্তত তিনটি উপায়ে ব্যবহার করা যেতে পারে: মূল ভূখণ্ডে পাইপলাইন টানা, গ্যাসকে এলএনজিতে রূপান্তর করে পরিবহন করা, অথবা ভোলাতেই বিদ্যুৎ উৎপাদন করে জাতীয় গ্রিডে যোগ করা। কোনটি দ্রুত ও সাশ্রয়ী হবে তা নির্ধারণে একটি সম্ভাব্যতা যাচাই (ফিজিবিলিটি স্টাডি) দরকার, যা জরুরি হওয়া সত্ত্বেও আজও করা হয়নি।

এরপর রয়েছে ছাতক (টেংরাটিলা), যেখানে সেই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটেছিল। সেখানে এখনও আমরা গ্যাস সঠিকভাবে উত্তোলন করছি না। কোনো জাতীয় প্রতিষ্ঠান দায়িত্ব নিলে আগামী এক-দুই বছরের মধ্যে সেখান থেকে উৎপাদন শুরু সম্ভব। এছাড়া বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রগুলোর কারিগরি মেরামত ও সংস্কার করা প্রয়োজন; কিছু ক্ষেত্রে মাত্র দুই থেকে চার মাসের মধ্যে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব।

সমুদ্রের (অফশোর) জন্য আমাদের স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে, যাতে জাতীয় প্রতিষ্ঠানের অধীনে আমরা নিজেরাই অনুসন্ধান চালাতে পারি। আগামী চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে এতে দারুণ অগ্রগতি সম্ভব। নির্দিষ্ট কারিগরি কাজের জন্য বিদেশি কোম্পানিকে ভাড়া করা যেতে পারে, কিন্তু সম্পদের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ থাকবে আমাদের জাতীয় প্রতিষ্ঠানের হাতেই।

অন্যতম বড় সুযোগ হলো সৌরবিদ্যুৎ। দেশি-বিদেশি গবেষকদের মতে, বাংলাদেশের সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা বর্তমান বিদ্যুৎ চাহিদার চেয়েও কয়েক গুণ বেশি। দিনের বেলাতেই কৃষি সেচ ও কলকারখানার বড় অংশ চলে, যখন সূর্যের আলো পর্যাপ্ত থাকে—তাই সব ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক ব্যাটারি স্টোরেজেরও প্রয়োজন পড়ে না। উদাহরণস্বরূপ, জ্বালানি সংকটের সময় ভিয়েতনাম মাত্র এক বছরে প্রায় ১১,০০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত করেছিল, যেখানে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ চাহিদাই প্রায় ১৭,০০০ মেগাওয়াট। আর জমির স্বল্পতার যে যুক্তি দেওয়া হয়, তা উম্মুক্ত স্থান ও ছাদের পরিকল্পিত ব্যবহারের মাধ্যমে সহজেই সমাধান সম্ভব।

তবে বড় বাধা হলো শুল্ক কাঠামো। সরকার এখন ছয় মাসের শুল্ক ছাড় দিচ্ছে, কিন্তু জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নানাবিধ শর্তের কারণে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও সাধারণ নাগরিকরা এর সুবিধা পান না। কয়লা যদি শুল্ক সুবিধা পায়, তবে নবায়নযোগ্য শক্তি আরও বেশি প্রণোদনা পাওয়ার দাবি রাখে। সরকার নীতিগত সমর্থন দিলে বাংলাদেশ নিজেই দেশে সৌর প্যানেল তৈরি করতে পারে।

তবে নবায়নযোগ্য শক্তিতে রূপান্তরের বিষয়টি পুরোপুরি বেসরকারি খাতের ওপর ছেড়ে দিলে চলবে না। প্রাথমিক পর্যায়ে অবকাঠামো, প্রণোদনা ও আইনি কাঠামো তৈরির দায়িত্ব রাষ্ট্রকেই নিতে হবে। ভারতে যেখানে প্রতি ইউনিট সৌরবিদ্যুৎ ৪-৫ টাকায় উৎপাদিত হয়, সেখানে আমাদের সরকার যদি ১২-১৪ টাকায় দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি করে, তবে তা রাষ্ট্রের ওপর বড় বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।

পাশাপাশি ‘সোলার হোম সিস্টেম’-এর ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিতে হবে। প্যানেলগুলোর মান খারাপ ছিল, ব্যাটারি ছিল ব্যয়বহুল ও নির্ভরযোগ্য নয় এবং সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ ছিল না। শিক্ষা পরিষ্কার: শুধু সোলার প্যানেল বসালেই হবে না; ব্যাটারি, টেকসই রক্ষণাবেক্ষণ, কারিগরি সহায়তা ও অর্থায়ন—সবকিছুকে একসাথে সমন্বিত করতে হবে।

পরিশেষে, গতিপথ পরিবর্তনের মূল দায়িত্ব রাষ্ট্রেরই। সরকার যদি গুরুত্ব দিয়ে দেখে, তবে দেশীয় গ্যাস ও নবায়নযোগ্য শক্তির কাজ এখনই শুরু করা সম্ভব এবং কয়েক মাসের মধ্যে সুফল পাওয়া সম্ভব। তবে এই রূপান্তর হতে হবে সুপরিকল্পিত—যাতে এটি কেবল কয়েকটি গুটিকয়েক প্রকল্পের সমষ্টি না হয়ে একটি নির্ভরযোগ্য ও টেকসই ব্যবস্থায় পরিণত হয়, যা জনগণের আস্থা ও অংশগ্রহণ অর্জন করবে।