আচ্ছা, দালাল চেনা যায় কীভাবে? গরুর হাটে দালাল চেনা যায়। কারণ তারা এগিয়ে আসেন। দালাল কিন্তু সাহায্যকারীও বটে। ঠিক যেমনটা তেলবাজ মানে কমিনেকেটিভ। কিন্তু একটা মাত্রা থাকা জরুরি। মাত্রা পেরিয়ে গেলেই তারা দালাল বা তেলবাজ।
হালে জনপ্রিয় শব্দ ন্যারেটিভ বা বয়ান; ইতিবাচক বা নেতিবাচক। এই ন্যারেটিভ তৈরিতে আওয়ামী লীগের জুরি নাই। হওয়াটাও হয়ত স্বাভাবিক। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকায় অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরি হয়েছে। ১ টাকার পারিশ্রমিক হয়েছে ৫ টাকা। আর দুর্নীতি করে কামিয়েছে আরও ১০ টাকা। এমনকি ৫ই আগস্টের পরও তারা ন্যারেটিভ তৈরিতে সফল হয়েছে, এটাও মানতে হবে। কিন্তু অন্যরা ঢের পিছিয়ে। অ্যাক্টিভিস্টরাই এখন ন্যারেটিভ তৈরির ভরসা। সামাজিক মাধ্যমে সহজে বিএনপির বিরুদ্ধে ন্যারেটিভ ছড়িয়ে পরছে। পাল্টা ন্যারেটিভ তৈরিতে ব্যর্থ দলটি। এমনি এক অবস্থা- ট্যাম্পু দেশ থেকে বিতাড়িত। অটো-রিকশার দাপট। কিন্তু ট্যাম্পু স্ট্যান্ড কতোওও পরিচিত, আহ। ‘নির্বাচন চাই’ এটা নিয়ে কতো ট্রল। কিন্তু এখন পিআর নিয়ে পাল্টা ট্রল করতে পারছে না বিএনপি। বলতেই পারেন- রাজনীতি করবে না, ট্রল। কিন্তু জেনজিরা এখন ভোটার। তাদের আকৃষ্ট করতে অনলাইনে এগিয়ে থাকতেই হবে ব্রো।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যয়। তাকে পড়েন কিংবা না পড়েন; শ্রদ্ধানশীল উচ্চতায় তিনি। তবে বদরউদ্দীন উমর ‘ভারতীয় জাতীয় আন্দোলন’ বইয়ে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে বলেছেন- বৃটিশ বাণিজ্যের সমর্থক। ন্যারেটিভ তৈরির উদ্দেশ্যে বঙ্কিমচন্দ্র লিখেছিলেন- ছয় টাকা দিয়া বিলাতি থান কিনিলাম… তাহারা দুই টাকা মুনাফা করিল বটে কিন্তু ক্রেতাদিগদের কোনো ক্ষতি করিয়া লয় নাই। উমর বলছেন- এই ছয় টাকা যে দেশী তাঁতী পাইল না, তাহাতে কাহারও ক্ষতি নাই। কিন্তু এই থানের আমদানির জন্য তাঁতীর ব্যবসা মারা গেলো।
মূলত এই আলোচনায় বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যয় বিলাতি কাপড় দেশে আনাকে সমর্থন করেছেন। কিন্তু দেশী কাপড় বিলাতে যে উচ্চ করের কারণে যেতে পারছে না তা নিয়ে আঙুল তুললেন না।
ডাকসু, জাকসু নিয়ে কতো কথা। গোড়ার কথা নবীন শিক্ষার্থীরা এই ছেলে-মেয়েগুলোকে বিশ্বাস করেছে। তারা শিবির না বাম-ডান তা দেখতে যায়নি। ভেবেছে বন্ধু। যাদের দ্বারা ছাত্রলীগ (নিষিদ্ধ ঘোষিত) হওয়া সম্ভব নয় তাদেরকেই ভোট দিয়েছে। পূর্বের ইতিহাস তারা জানে। চেতনা আর ট্যাগিং’কে তারা না বলেছে। তারা ‘৭১, ‘২৪ কে ধারণ করে, সম্মান করে। কিন্তু এনিয়ে রাজনীতি পছন্দ করে না। তারা নতুনে বিশ্বাসী, চায় নতুনত্ব।
হাতে মোবাইল। রাজনীতির বীজ ছড়িয়ে দেয়ার চার্জিং পয়েন্ট। ধর্ম সেনসেটিভ, মূল্যবান। কিছু জনপ্রিয় কিছু বক্তা দারুণ কৌশল হাতে নিয়েছেন। তারা ৯৮ শতাংশ ভালো কথা বলছেন। তারা বাকী ২ শতাংশ কথায় ভিন্ন বাঁক। মানুষ পরোক্ষ মনেই ৯৮ শতাংশ কথা যেহেতু ভালো বলেছেন বাকী ২ শতাংশ ওই স্রোতে ভালো বলেই গণ্য হয়। এটাই ভয়ের জায়গা। কারণ দীর্ঘদিন পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার পর একবেলা তেলচিটচিটে (জেনে বা না জেনে) খাবার অমৃতই লাগে। কারণ সচেতন মানুষও একবেলা জেনে বুঝেও স্বাধ পরিবর্তন করতে চায়।
ব্যাচেলর পয়েন্ট। এই ধারাবাহিক নাটকটা জেনজিরা মজা করে দেখেন। অপেক্ষায় থাকেন। এই নাটকে পাশা ভাই অনন্য এক চরিত্র। কাবিলার বাতেলা, অর্থের জোর। অনার্সটাও শেষ করা হয়নি কাবিলার। আছে রাজনৈতিক চিন্তা-দর্শন। ডিসকাউন্ট খোঁজা শুভ নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে সিরিয়াস। যে শুদ্ধ ভাষায় কথা পর্যন্ত বলতে পারতো না, সে এখন ফরফর করে ইংরেজি বলে। ইংরেজি শুধু রপ্তই শুধু করেনি, কানাডা পাড়িও দিয়েছে। অর্থের প্রয়োজন মেটাতে, বাবার চাপ কমাতে পাশা ভাইকে স্যার পর্যন্ত ডাকতে কুণ্ঠাবোধ করেনি। এদিকে পাশা ভাই পূর্বের কুখ্যাত জীবনকে ভুলতে চান। রীতিমতো শুণ্য হাতেই ব্যবসা শুরু করেন। এখন ঘরে এসি। কঠোর পরিশ্রম করে ব্যবসা দাঁড় করিয়েছেন। ‘সন্ত্রাসী’ পাশা ভাই নেশার জগৎ থেকেও দুরে (টুকটাক পার্টি অবশ্য করেন, অশ্রাব্য গালিগুলো খুবই নেতিবাচক)। তিনি রীতিমতো নিজের সঙ্গে বিপ্লব করেছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটা কথা বেশ প্রচলিত। ‘শ্রীলঙ্কায় বিপ্লব হয়েছে, দুর্নীতি গায়েব হয়েছে। আর বাংলাদেশে বিপ্লবের পর বিপ্লবই গায়েব হয়েছে।’ পাশা ভাই বিপ্লব করেছেন। তিনি একটা সুযোগ পেয়েছেন তা কাজে লাগিয়েছেন। কিন্তু ‘২৪ আন্দোলনের পর বাংলাদেশ কী এই সুযোগটা কাজে লাগাতে পারলো?
মানুষ ‘হরতাল’ শব্দটা পছন্দ করে না। শুনলেই দৃষ্টিতে আসে কাইজ্যা, ফ্যাসাদ, আগুন, রক্ত। ‘২৪ আন্দোলনে ‘শাটডাউন’ শব্দটা মানুষ গ্রহণ করেছে। এমনভাবে জেনজি’দের জন্য হলেও সংস্কারের পরিবর্তে অন্যকোনো শব্দ হয়ত সুন্দর হতো। সংস্কার নিয়ে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ আকবর আলি খান ‘পরার্থপরতা অর্থনীতি’ বইয়ে লিখেছেন- ভীরুরা ভালুক শিকার করতে পারে না, তাদের পক্ষে সংস্কার করাও সম্ভব নয়। তিনি লিখেছেন- সংস্কারের শত্রুর অভাব নেই, কিন্তু সংস্কারের বন্ধু খুবই কম। আরেক স্থানে তিনি লিখেছেন, সংস্কার যে কোন আহাম্মক শুরু করতে পারে কিন্তু সবাই শেষ করতে পারে না। সর্বোপরি তিনি বলেছেন, রাজনীতিবিদদের চিন্তা আগামী নির্বাচনে সীমাবদ্ধ, একমাত্র বিজ্ঞ রাষ্ট্রনায়করাই ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নিয়ে চিন্তা করতে অভ্যস্ত।
আকবর আলী খানের লেখাটা যদি বর্তমান সময়ে নিয়ে আসি। বলা যেতেই পারে, প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস সমাজের কিছু দৃশ্যমান বা অদৃশ্যমান সংস্কার করার জন্য উপযুক্ত ছিলেন। আচ্ছা কতোটা পারলেন?
এবার আসি দালালে। বিপ্লব দেশে বারবার হয় না। মানুষ স্বভাবতই ভীতু। কিছু সময় আসে যখন মানুষ ভয়কে জয় করে। মানুষ ‘মব’ আটকাতে যায় না কারণ সে ভয় পায়। ভাবে ঝামেলায় জড়াবো কেনো? প্রতিবাদীকে প্রতিহত করাটাই ত্রাস রাজত্বের প্রথম অলিখিত নিয়ম। আওয়ামী ত্রাসে বিপর্যস্ত ছিল দেশ। জোয়ার উঠেছিল। শক্তি ছিল একটাই- আওয়ামী বিরোধী। ভয়ংকর হয়ে ওঠা সাধারণ মানুষরা ফিরেছেন নীড়ে। হয়েছেন শান্ত। আর আওয়ামীবিরোধী রাজনীতিগুলো যে যার ব্যানারের পেছনে দাঁড়িয়েছে। সাধারণ মানুষের এই আন্দোলন বেঁচতে এসেছে একদল দালাল। এরাই লোক চক্ষুর আড়ালে ভয় দেখায়। এরাই ‘২৪কে বিক্রি করে। এরাই খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে বের করে, কে কবে কোন সালে কী স্ট্যাটাস দিয়েছিল। কিন্তু জেনজি’রা সিদ্ধান্ত নিয়েছে নিজেদের মতো করে। ছাত্রলীগের (বর্তমানে নিষিদ্ধ) রাজনীতি করে আসা ফরহাদ-জিতুকে তারা ডাকসু-জাকসুতে ভিপি বানিয়েছে। তাদের কাছে মুখ্য বিপ্লবী মনোভাব। যদিও নির্বাচন নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়ে গেছে।
‘২৪ আন্দোলনেও ছাত্রলীগের (বর্তমানে নিষিদ্ধ) সংশ্লিষ্টতা নিয়ে প্রশ্ন থাকার পরও হাসনাত-সারজিসই ছিলেন নেতা। তারা তাদের ভরসা করেছেন। ৫ই আগস্টের পর সবমিলিয়ে ‘ফেক’ বিপ্লবীদের মনস্তাত্ত্বিক ‘উষ্টা’ মেরেছে, মরছে জেনজিরা। মিলেনিয়াসরাও কম যাননা। দিনশেষে চায়ের দোকানে রাজনৈতিক আড্ডাটা বড্ড জরুরি। এই আড্ডা যতো হবে ততো বেরিয়ে আসবে কারা মনস্তাত্ত্বিক দালাল, আর কারা পাশা ভাইয়ের মতো বিপ্লবী।
লেখকঃ পিয়াস সরকার, সাংবাদিক, স্টাফ রিপোর্টার, দৈনিক মানবজমিন