‘মা’—শব্দটা বিশ্লেষণের ক্ষমতা পৃথিবীর কোনো মনীষীর আছে বলে জানা নেই! ‘মা’ এতটাই গভীর প্রভাব বিস্তারকারী এক শব্দ, যা ব্যাখ্যা করা যায় না। সন্তানের জন্য মায়ের চেয়ে নির্ভরতার জায়গা পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টি নেই। সন্তান যত অপরাধ করেই ঘরে ফিরুক, মা তাকে দূরে ঠেলে দেন না! এ এক অদৃশ্য মায়ার বন্ধন। পৃথিবীর সব আলো নিভে গেলেও মায়ের দোয়ার প্রদীপ সন্তানের মাথার ওপর চিরকাল জ্বলজ্বল করে।
‘মা’—পৃথিবীতে এর চেয়ে মধুর কোনো শব্দ বা পবিত্র কোনো সম্পর্ক আর হয় না। সন্তানের সঙ্গে মায়ের এই যে নাড়িছেঁড়া বন্ধন, তা সবকিছুর ঊর্ধ্বে। তাই মাকে ভালোবাসার জন্য আলাদা কোনো দিনের প্রয়োজন নেই। তবুও যান্ত্রিকতার এই যুগে বিশ্বের সকল মায়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে পালিত হয় ‘বিশ্ব মা দিবস’। কিন্তু আজকের দিনে এই দিবসটি উদযাপনের চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে আমাদের আত্মোপলব্ধি। আমরা কি আমাদের মায়ের নিঃশর্ত সীমাহীন ভালোবাসার যথাযথ মূল্য দিতে পারছি? হয়তো পারছি না।
এই তো কদিন আগেই একটা ভিডিও মোবাইল স্ক্রিনে ভেসে এলো—গ্রামের মানুষ একত্রিত হয়ে সালিশ বসিয়েছে। সন্তান বৃদ্ধ মাকে মারধর করেছে। মুরব্বিরা প্রথমে সন্তানকে চাপ দিয়েছেন মায়ের পা ধরে ক্ষমা চাইতে হবে। কতটা নির্বোধ সন্তান—সে মায়ের কাছে ক্ষমাও চাইবে না! এবার সালিশে সন্তানকে বেত্রাঘাতের সিদ্ধান্ত হলো। একজন সন্তানের গায়ে আঘাত করা শুরু করেছে সালিশের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী। কয়েক ঘা দিতেই ওই মা ছুটে এসে লাঠির সামনে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে সীমাহীন কান্নাকাটি শুরু করলেন—কিছুতেই তার সন্তানকে মারতে দেবেন না। এ-ই হলো ‘মা’।
মা কেবল একটি সম্পর্ক নয়; মা হলো পৃথিবীর একমাত্র নিঃস্বার্থ আদালত, যেখানে সন্তানের সব অপরাধ বিনা শর্তে ক্ষমা হয়ে যায়। মায়ের ভালোবাসা হলো সেই বিশাল বটবৃক্ষ, যার শিকড় মাটির অনেক গভীরে প্রোথিত থাকলেও তার শীতল ছায়া তপ্ত রোদে সন্তানকে পরম প্রশান্তি দেয়। Abraham Lincoln বলেছিলেন—“যার মা আছে, সে কখনোই গরিব নয়।” মা কেবল একজন ব্যক্তি নন, মা এক চিরন্তন আশ্রয়।
১৯১৪ সালে মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বিশ্ব মা দিবস’ হিসেবে পালনের স্বীকৃতি পায়। কিন্তু মাতৃত্বের প্রতি এই আনুগত্য আদিকাল থেকেই বহমান। মাকে নিয়ে এত গভীর দর্শনের আড়ালেও লুকিয়ে আছে অজানা অনেক নির্মম ঘটনা। তার মধ্যে আমাদের সমাজের এক বড় ট্র্যাজেডি হলো বৃদ্ধাশ্রম। যে মা নিজের শরীরের প্রতিটি রক্তবিন্দু দিয়ে সন্তানকে তিল তিল করে বড় করেছেন, জীবনের শেষ বেলায় তাঁকে আশ্রয় নিতে হয় চার দেয়ালের এক নির্জন কক্ষে। আত্মীয়-পরিজনদের থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন পরিবেশে সেখানে কেমন থাকেন ‘মা’?
সন্তানের অবহেলা বা সময়ের অভাব যখন মাকে ঘরছাড়া করে, তখনও কিন্তু সেই মায়ের দোয়া সন্তানের জন্য আশীর্বাদ হিসেবেই কাজ করে। বৃদ্ধাশ্রমের জানালার পাশে বসে থাকা মা প্রতিদিন পথ চেয়ে থাকেন—হয়তো আজ তার সন্তান আসবে! নিজের প্রতি অবিচার হলেও সেই মায়ের মনে সন্তানের প্রতি ভালোবাসা বা মঙ্গলকামনা বিন্দুমাত্র কমে না। এই ক্ষমাসুন্দর মমত্বই প্রমাণ করে, মায়ের চেয়ে কোনো বিকল্প আশ্রয়স্থল পৃথিবীতে নেই।
সব মাতৃত্বের গল্প আবার রঙিন হয় না। আমাদের এই সমাজেই কিছু মা আছেন, যাঁরা অনাকাঙ্ক্ষিত দায় থেকে মুক্তি পেতে ফুটপাতে বা ডাস্টবিনে ফেলে যান নিজের নাড়িছেঁড়া ধন। সমাজ থেকে লুকালেও সারাজীবন নিজের কাছ থেকে মুক্তি মেলে না তাঁর! আবার এমন মা-ও আছেন, যাঁরা দারিদ্র্যের চরম কষাঘাতে ধুঁকতে ধুঁকতে কেবল সন্তানের মুখে দুবেলা খাবার তুলে দেওয়ার আশায় নিজের বুক খালি করে সন্তানকে বিক্রি করে দেন সামান্য অর্থের বিনিময়ে। এই মায়েদের নীরব আর্তনাদ আর চোখের জল কোনো সংজ্ঞার জালে ফেলা সম্ভব নয়! এটি যেমন মাতৃত্বের ট্র্যাজেডি, তেমনি এক চরম সামাজিক অবক্ষয়ের প্রতিচ্ছবি।
আবার ধরুন কর্মজীবী মা—যিনি অফিসের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে কঠোর, তিনিই আবার ঘরে এসে রান্নাবান্না ও সন্তান সামলাতে কতটা কোমল! দিনশেষে নিজের ক্লান্তি একপাশে সরিয়ে রেখে তিনি যখন সন্তানের পড়ার টেবিলে বসেন, তখন তাঁর সেই ত্যাগ কোনো পদক বা বেতনে মাপা যায় না।
ধরুন একজন সিঙ্গেল মাদার বা সংগ্রামী মা, যিনি বিচ্ছেদ কিংবা একাকীত্বের বিরুদ্ধে লড়ে সন্তানকে এক হাতে মানুষ করছেন। এই মায়েরা দেখান যে, সামাজিক বৈষম্যের শিকার নারী দুর্বল হতে পারেন, কিন্তু মা কখনো হার মানেন না।
আবার ফুটপাতে জীর্ণশীর্ণ শরীরের অনেক মাকে দেখি—নিজের জীবন সংকটময়, অথচ সন্তানকে বুকের দুধ পান করাচ্ছেন কত মমতায়! তারাও মা। হয়তো বুকে আগলে রাখা সন্তানের বাবার কোনো পরিচয় সে নিজেও জানে না। হায় সমাজ আমাদের! পিতৃপরিচয়হীন একটা সন্তানকে ফেলে দিলেই কিবা এসে যায়! কিন্তু ও-ই যে “মাতৃত্ব”! কেবল সেই কারণেই আজীবন বয়ে বেড়াতে হয় যন্ত্রণা আর গ্লানি।
মা দিবসের এই উৎসবের আড়ালে একদল নারীর নীরব দীর্ঘশ্বাস আবার ঢাকা পড়ে যায় মর্মন্তুদ যন্ত্রণায়—যাঁরা হাজারো চেষ্টা আর প্রার্থনার পরও ‘মা’ ডাক শুনতে পাননি। নারীর এই অপূর্ণতা কোনো সান্ত্বনাতেই পূর্ণ হয় না। এই নীরব কষ্টগাঁথা বুকে চেপে হাজারো নারী হাসিমুখে সংসার সামলান। তাঁদের জন্য কৃতজ্ঞতা। কারণ, মাতৃত্ব কেবল জন্ম দেওয়ার মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়; মাতৃত্ব হলো এক পরম মমতা। এটা অনুধাবনের, অনুশোচনার নয়। যাঁরা সন্তান কোলে পাননি, তাঁরা চাইলে অন্য কোনো অনাথ শিশুকে পরম মমতায় “মানুষ” করতে পারেন। আপনার মহত্ত্ব অনেক গুণ বেড়ে যাবে।
পরিশেষে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় আলোকপাত করে শেষ করছি—তা হলো আমাদের জেন জি এবং আলফা প্রজন্মকে নিয়ে অভিভাবকদের দুশ্চিন্তার শেষ নেই। তারা অধিকাংশ সময় গ্যাজেটের পেছনে পড়ে আছে। বাবা-মাকে ভালোবাসা বা তাঁদের কাছ থেকে ভালোবাসা আদায় করে নেওয়া—কোনোটাই ঘটছে না। স্মার্টফোন যেন সব কিছু কেড়ে নিয়েছে। আবেগ-ভালোবাসার মূল্য আজ তুচ্ছ। আফসোস! আজকের ‘জেন জি’ প্রজন্ম প্রযুক্তির এক গোলকধাঁধায় বন্দি। তাদের হাতের মুঠোয় এখন পুরো পৃথিবী, অথচ পাশের সোফায় বসে থাকা মায়ের মন পড়ার সময় তাদের নেই।
মায়ের সঙ্গে সরাসরি কথা না বলে ফেসবুকে ঘটা করে স্ট্যাটাস দেওয়া আসলে এক প্রকার ‘পারফর্মিং লাভ’ বা যান্ত্রিক শ্রদ্ধা। মনে রাখতে হবে, মা-বাবার সান্নিধ্য হারানো সময় আর কখনোই ফিরে পাওয়া যায় না। কোনো ওয়াই-ফাই বা ইন্টারনেটে নয়, মায়ের ভালোবাসায় কেবল সরাসরি হৃদয়ের সংযোগই কাজ করে। মনে রাখতে হবে, দিন শেষে পৃথিবীটা বড্ড কঠিন, আর মায়ের কোলটাই একমাত্র নিরাপদ স্বর্গ। একটু ভুল হলে হা-হুতাশ করেও আর লাভ হবে না। বাবা-মা চলে গেলে বোঝা যায়—কী হারিয়েছি!
গ্যাজেট নয়, মায়া আর ভালোবাসায় ফিরুক আমাদের এই প্রজন্ম; কারণ পৃথিবীর সব নিরাপদ আশ্রয়ের ঠিকানা শেষ পর্যন্ত ওই একটি শব্দেই মিলে যায়—‘মা’।
প্রযুক্তির ভিড়ে হারানো শৈশব আবারও ফিরে আসুক মায়ের স্নেহের আঁচলে। স্মার্টফোনের স্ক্রিনে ‘মা’ লিখে সার্চ করলে হয়তো হাজারো তথ্য মিলবে, কিন্তু বাস্তবের সেই মমতাময় শীতল পরশের শিহরণ অনুভব করতে পারবেন কখনো? পাবেন কি ওই মায়ার আঁচলে মুখ গুঁজে দেওয়ার স্বাদ? পাবেন না। অতএব, সময় থাকতে সাবধান হই।
পবিত্র সব ধর্মগ্রন্থেই বর্ণিত হয়েছে মায়ের মর্যাদার গুরুত্ব কতখানি। আসুন, মাকে ভালোবাসি জীবনের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে। কেবল একটি দিনে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি আর বাকি সময়ে অবহেলা—সেটা যেন না হয়। আমাদের ধর্মেও স্পষ্ট উল্লেখ আছে—“মায়ের পদতলে সন্তানের বেহেশত।”
আমাদের আরও একটা মা আছেন—সেটা কি আমরা মনে রাখি? রাখলেও দুর্নীতি আর স্বার্থের মোহে ইচ্ছা করে ভুলে থাকি। সেটা হলো আমাদের “দেশমাতা”। আমরা যেন গর্ভধারিণী মায়ের মতোই আমাদের দেশমাতাকেও হৃদয়ে ধারণ করে রাখি। মায়ের মতোই তিনিও আমাদের আগলে রেখেছেন হাজারো প্রতিকূল পরিবেশের মাঝে।
ভালো থাকুক পৃথিবীর সকল “মা”।
এস এম হুমায়ুন কবির
প্রশিক্ষক ও নির্মাতা