রাজনীতির রসায়ন বনাম ধর্মতত্ত্ব!

Share

রাজনীতির রসায়ন নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে মনে হলো রসের সঙ্গে রসায়নের সম্পর্ক নিয়ে কিঞ্চিৎ আলোচনা দরকার। রসায়নের ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো কেমিস্ট্রি। একটি পদার্থের সঙ্গে অন্য পদার্থের মিলন বা মিল-মহব্বত, সংঘাত। মারামারি, যুদ্ধ কিংবা নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে যেভাবে নিজেদের গুণাগুণ ও অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখে, তাকেই বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় কেমিস্ট্রি।

কেমিস্ট্রির বাংলা প্রতিশব্দ রসায়ন কে রেখেছিল, তা বলতে পারব না—তবে তার কারণে রসায়ন নিয়ে হাজারো অনাসৃষ্টি বাংলার জমিনে-মাঠে চলেছে। বিশেষত নারী-পুরুষের যে অংশটি রসায়ন সম্পর্কে জানে না, তারা মনে করে, রসায়নশাস্ত্রের মধ্যে প্রেম-পিরিতের খনি লুকায়িত আছে। ফলে অনেক ছেলেমেয়ে না জেনে, না বুঝে রসায়নের ছাত্র-ছাত্রী শিক্ষক-শিক্ষিকার প্রেমে হাবুডুবু খেয়ে থাকে।

ফিজিকস ও কেমিস্ট্রি অর্থাৎ পদার্থবিদ্যা ও রসায়নশাস্ত্র বিজ্ঞানের অতীব গুরুত্বপূর্ণ দুটি শাখা এবং একে অপরের পরিপূরক।
সে অর্থে মানুষের গঠন, প্রকৃতি, পরিবেশ, খাবারদাবার ইত্যাদির কারণে মানবদেহে যে রসায়ন তৈরি হয়, তা অন্য মানুষ, প্রকৃতি ও ভিন্ন পরিবেশে যে ক্রিয়া-বিক্রিয়া করে, তার ওপর রাজনীতির রসায়ন অনেকাংশে নির্ভরশীল। অন্যদিকে রাজনীতির নিজস্ব কতগুলো ধর্ম বা বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যাকে ইংরেজিতে বলা হয় পলিটিক্যাল থিওলজি বা রাজনীতির ধর্মতত্ত্ব। মানুষের কেমিস্ট্রি ও রাজনীতির কেমিস্ট্রি স্থান-কাল-পাত্র ভেদে ভিন্নতর হয় এবং প্রকৃতি ও পরিবেশ অনুযায়ী বারবার পরিবর্তিত হয়। অন্যদিকে রাজনীতির ধর্মতত্ত্ব সর্বজনীন এবং অনাদি, অর্থাৎ হাজার হাজার বছর আগে রাজনীতির যে ধর্ম ছিল, তা আজও অবিকৃত এবং মৌলিক অবস্থায় রয়ে গেছে।

উল্লিখিত অবস্থার কারণে রাজনীতির রসায়ন এবং ধর্মতত্ত্বের সংঘাত সেই সমাজে ও রাষ্ট্রে অনিবার্য হয়ে পড়ে, সেখানে রাজনীতিবিদদের রাষ্ট্রবিজ্ঞান এবং রাজনীতির ধর্মতত্ত্বের জ্ঞানের অভাব থাকে। দ্বিতীয়ত, মহামতি সক্রেটিসের ভাষ্য মতে, নিজেকে চেনার ব্যর্থতার কারণে যাঁরা নিজের অন্তর্নিহিত রাজনীতির রসায়ন, প্রতিপক্ষ, শত্রু, মিত্রের রসায়ন সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখেন না, তাঁদের জন্য রাজনৈতিক বিপর্যয় অনিবার্য হয়ে পড়ে। রাজনীতির রসায়ন সম্পর্কে জ্ঞান না থাকার কারণে সবাই রাজা হতে চান। উজির-নাজিরের সঙ্গে আত্মীয়তার জন্য অনেকে পাগলামো শুরু করেন। কেউ কেউ আমির-ওমরাহ, সিপাহি-কোতোয়াল প্রভৃতি রাষ্ট্রীয় কর্মচারীর প্রেমে উতলা হয়ে স্থান-কাল ভুলে গিয়ে নিজের সর্বনাশ ডেকে আনেন।
শিরোনামের তত্ত্বকথা বাদ দিয়ে এবার সুবে বাংলার রাজনীতির রসায়ন ও ধর্মতত্ত্ব নিয়ে আলোচনা শুরু করি। আপনারা যদি গত ২৪ মাসের রাজনীতির সমীকরণগুলো পাশাপাশি রেখে একটু চিন্তা করেন, তবে দেখতে পাবেন যে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর এবং ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে আমাদের রাজনীতিতে কত বড় সুনামির ঘটনা ঘটেছে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে সারা বাংলায় যে রসায়ন ছিল, তা পরবর্তী বছরে অর্থাৎ ২০২৪ সালে এসে ১৮০ ডিগ্রি অ্যাঙ্গলে উল্টে যায়। আবার ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসের রসায়ন ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে এসে এমন আকার ধারণ করেছে, যা সুবে বাংলার হাজার বছরের ইতিহাসে কখনো ঘটেনি।

মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে তিনটি ডিসেম্বর বাঙালির রাজনীতির রসায়নে এমন একটি ত্রিভুজ রচনা করেছে, যার সঙ্গে জ্যামিতির ত্রিভুজের কোনো মিল নেই, বরং আটলান্টিক মহাসাগরে যে ভয়ংকর বারমুডা ট্রায়াঙ্গল রয়েছে, তার সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের যে চরিত্র, তাতে সেই ট্রায়াঙ্গল অতিক্রম করার সাধ্য কোনো নৌযানের নেই। পৃথিবীর কোনো শক্তিশালী নৌযান, তা সে পারমাণবিক সাবমেরিন অথবা বিমানবাহী সপ্তম নৌবহর কিংবা টাইটানিকের মতো দানবীয় যাত্রীবাহী জাহাজ হোক, কোনো অবস্থায়ই নৌযানগুলো বারমুডা ট্রায়াঙ্গল অতিক্রম করা তো দূরের কথা, কাছাকাছি যেতে পারবে না। একইভাবে কোনো আকাশযান বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের ওপর দিয়ে উড়তে পারে না। কারণ অদৃশ্য অজানা প্রাকৃতিক শক্তি জলযান কিংবা আকাশযানকে নিখোঁজ করে দেয়।

বারমুডার মতো যখন রাজনীতিতে ত্রিমাত্রিক সংকট ঘনীভূত হয়, তখন দুনিয়ার কোনো রাজা-বাদশাহ, সেনাপতি, ওলি-দরবেশ, সাধু-সন্ন্যাসীর কেরামতি কাজে আসে না। রাজনৈতিক সংকটে যখন জনযুদ্ধ কিংবা মহাযুদ্ধ অনিবার্য হয়ে পড়ে, তখন মহাভারত কিংবা ট্রয়ের যুদ্ধের মতো ঘটনা ঘটতে থাকে। মহাভারত কিংবা ট্রয়ের যুদ্ধের ইতিহাস যাঁরা জানেন, তাঁরা নিশ্চয়ই দেখেছেন যে জনযুদ্ধে কিভাবে মানুষের সঙ্গে দেবতারা পর্যন্ত জড়িয়ে গিয়েছিলেন। যুদ্ধের সময় যেমন জ্ঞানীর উপদেশ, সেনাপতির বীরত্ব, রক্তের বন্ধন এবং দেবতার ইচ্ছা নিষ্ফল হয়েছিল, তেমনি ত্রিমাত্রিক রাজনৈতিক সংকটে বিবদমান পক্ষগুলো নির্মূল ও নির্বংশ হয়ে গিয়েছিল।

আমাদের চলমান রাজনৈতিক সংকট কতটা ত্রিমাত্রিক, সেটি এই মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না। কিন্তু আমাদের দেশে এক দশক ধরে যেভাবে রাজনীতির ধর্মতত্ত্ব লঙ্ঘন করা হয়েছে, তাতে রাজনীতিবিদদের মেরুদণ্ডের ৮০ শতাংশ ধ্বংস হয়ে গেছে। আগে যাঁরা ক্ষমতায় ছিলেন, তাঁরা প্রতিপক্ষের মেরুদণ্ড ভাঙতে গিয়ে অজান্তে নিজেদের মেরুদণ্ডের সর্বনাশ এমনভাবে করেছেন যে বিরূপ পরিস্থিতিতে ১০ মিনিট দাঁড়িয়ে থাকতে পারেননি। ১৫ বছরের শাসন এবং ১০ বছরের প্রশ্নবিদ্ধ শাসনের জামানায় রাজনীতির সব ব্যাকরণ নষ্ট করে ক্ষমতাধররা যে রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তা ২০২৪ সালের আগস্ট মাসের ৫ তারিখ দুপুর বেলায় মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যে তছনছ হয়ে যায়।

কর্তৃত্ববাদী মেরুদণ্ডহীন শাসনের জাঁতাকলে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষও মেরুদণ্ডহীন হয়ে পড়েছিল। জেল-জুলুম, হত্যা, গুম, মামলা-মোকদ্দমা, অত্যাচার, অবিচার, অনাচার ইত্যাদির কারণে যাঁরা মজলুম হয়ে পড়েছিলেন, তাঁরা সময়ের পরিক্রমায় ক্লান্ত-বিধ্বস্ত হওয়ার পাশাপাশি সাহস-শক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন। মানবিক চিন্তা-চেতনা, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং বেঁচে থাকার সামাজিক শর্তগুলো ভুলে গিয়েছিলেন। ফলে একটি সফল গণ-অভ্যুত্থানের পর যে রাজনৈতিক নেতৃত্ব অপরিহার্য ছিল, তা অতীতের কর্তৃত্ববাদী শাসনের কারণে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। এমতাবস্থায় প্রকৃতির একটি অনন্য উপহার আমরা এমনভাবে নষ্ট করেছি, যার খেসারত পুরো জাতিকে আরো কত দিন দিতে হবে, তা হয়তো প্রকৃতিই বলতে পারবে।

উল্লিখিত অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা যদি ২০২৫ সালের বাংলাদেশের রাজনীতির চালচিত্র বিশ্লেষণ করি, তবে দেখতে পাব যে প্রতি ঘণ্টায় নিত্যনতুন ঘটনা ও দুর্ঘটনার কবলে পড়ে রাজনৈতিক সম্ভাবনার কবর রচনা হচ্ছে এবং নিত্যনতুন সংকটে একেকটি নতুন বারমুডা ট্রায়াঙ্গল তৈরি হচ্ছে। রাজনীতির নায়করা নির্বাসনে চলে যাচ্ছেন এবং পুতুলনাচের ইতিকথায় অভিনয়ের জন্য অদ্ভুত সব পুতুল রাজনীতির রঙ্গমঞ্চে হাজির হচ্ছেন। পুতুলগুলোকে যাঁরা নাচাচ্ছেন, তাঁরা এতটা কাঁচা হাতে খেলছেন যে দর্শক-শ্রোতা আনন্দ লাভের পরিবর্তে আতঙ্কে জড়সড় হয়ে পড়ছে।

রাজনীতির রঙ্গমঞ্চে যে হারে নায়ক-নায়িকা-ভিলেন এবং পাত্রমিত্ররা শোরগোল করছেন, সে হারে দর্শক-শ্রোতার কোনো উচ্ছ্বাস নেই। বাদ্যের সঙ্গে গানের মিল নেই, গায়কের সঙ্গে সুর-ছন্দের সম্পর্ক নেই, আর অভিনয়ের সঙ্গে দর্শক-শ্রোতার আবেগ-অনুভূতির মিল নেই। কান্নার দৃশ্যে দর্শক হাসছে এবং হাসির দৃশ্যে কাঁদছে। হাততালির দৃশ্যে পাদুকা প্রদর্শন করছে, আর পাদুকা প্রদর্শনের দৃশ্যে জোরসে তালিয়া বাজাচ্ছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, রাজনীতির ধর্মতত্ত্বে অধর্মের মন্ত্র ঢুকে গেছে এবং রাজনীতির রসায়নে প্রতিটি উপাদান একে অপরের সঙ্গে বিক্রিয়া করছে। ফলে যেখান থেকে সুগন্ধ ছড়াবে, সেখানে দুর্গন্ধের যন্ত্রণায় প্রাণ ওষ্ঠাগত অথবা যেখান থেকে শীতল বাতাস বের হবে, সেখান থেকে আগুনের লেলিহান শিখা বের হয়ে আসছে।

লেখক : গোলাম মাওলা রনি