পর্দার অন্তরালে ক্ষমতার নাচানাচি !

Share
সেদিন যে কী হয়েছিল তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো বিদ্যা আমার এখনো হয়নি। তবু বলছি, টেলিভিশন অনুষ্ঠান তৃতীয় মাত্রায় একটি গল্প বলেছিলাম আমি, যে উদ্দেশ্যে বলেছিলাম তা কেউ অনুধাবনের চেষ্টা করল না; বরং গল্পের উত্তেজক বিষয়াদি নিয়ে দেশের সব পত্রপত্রিকা একসঙ্গে লিড নিউজ করল। সেই জামানায় সামাজিক মাধ্যম সবে বাংলাদেশে হাঁটি হাঁটি পা পা করে চলতে শুরু করেছিল। ফলে আমি প্রাণে বেঁচে যাই, তা না হলে আজকের দিনের মতো ইল্লুবিল্লুদের প্রভাব শেখ হাসিনার ওপর থাকলে আমাকে নির্ঘাত মরতে হতো।
ঘটনার শুরুটা হয়েছিল বৈশাখী টিভিতে। সাংবাদিক রাহুল রাহা প্রয়াত আবুল হোসেনের স্মৃতি বলতে গিয়ে একটি কাহিনি বললেন। আমি কাহিনিটি কোনো টক শোতে বলতে পারি কি না এমন প্রশ্ন করলে তিনি বেশ দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন—আলবত পারেন। দরকার হলে আমার নাম উল্লেখ করবেন।
আমি কালবিলম্ব না করে চ্যানেল আই তৃতীয় মাত্রার অনুষ্ঠানে কাহিনিটি বললাম, কিন্তু সেখানে রাহুল রাহার নাম বললাম না। অনুষ্ঠান প্রচারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গল্পের বিষয়বস্তুর সঙ্গে স্যাটায়ার, ক্রোধ, ঘৃণা, সমালোচনা, আওয়ামী লীগকে হেয় করার মোক্ষম সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সব পত্রপত্রিকা শিরোনাম করল সৈয়দ আবুল হোসেনের দৌড়ের গল্প। প্রথম আলো তো আলপিন নামের তাদের সেই বিশেষ সংখ্যাটি আমাকে উৎসর্গ করল, পুরো সংখ্যাজুড়ে শুধু সেই গল্প। আর আলপিনের শিরোনাম ছিল—কি গল্প শোনালেন রনি ভাই।
উল্লেখিত অবস্থায় সারা দেশে তোলপাড় শুরু হলো। আওয়ামী লীগ বিব্রত। স্বয়ং শেখ হাসিনা কিংকর্তব্যবিমূঢ়। সংসদ চলছিল এবং ঘটনাটি আলোচনার জন্য আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের বৈঠক ডাকা হলো। লোকজন পরামর্শ দিল পালাও।
কেউ বলল, বেশি বাড় বেড়েছ! এবার দেখবে কত ধানে কত চাল। সার্বিক পরিস্থিতির কারণে আমার মাথা ঘুরতে আরম্ভ করল—ঘটনার আকস্মিকতায় আমি বেকুব হয়ে গেলাম। মবের কবলে পড়ে তিন যুগের রথী/মহারথীরা যেভাবে কান্নাকাটি করে এবং জাতপাত তুলে যেভাবে রাজনৈতিক দলের হর্তাকর্তার চরণতলে লুটিয়ে পড়ে, ঠিক সেভাবে শেখ হাসিনার পদতলে লুটিয়ে পড়ার জন্যও আমার শুভার্থীরা পরামর্শ দিল। কিন্তু আমি ওসব ভাবতেই পারছিলাম না। কারণ আত্মসমর্থন, চরণধুলির জন্য কান্নাকাটি এবং স্বার্থের লোভে অন্য মানুষের নিকট মাথা নোয়ানোর জন্য যে যোগ্যতা লাগে তা জন্মগতভাবে আমি পাইনি এবং কোনো দিন চেষ্টা-তদবির করিনি। ফলে আমাকে চূড়ান্ত পরিণতির ঝুঁকি নিয়ে সংসদীয় কমিটির বৈঠকে উপস্থিত হতে হলো।
সেদিনের বৈঠকে কী ঘটেছিল তা বলার আগে গল্পটির সারাংশ বলে নিই। সৈয়দ আবুল হোসেনকে নিয়ে সারা দেশে তখন তুমুল বিতর্ক হচ্ছিল। পদ্মা সেতুর দুর্নীতি এবং যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের কাণ্ডকারখানা তখন শুধু টক অব দ্য কান্ট্রি নয়, বলা চলে টক অব দ্য ওয়ার্ল্ড। লোকে বলাবলি করছিল যে আবুল হোসেন শেখ হাসিনা-রেহানার কাছের মানুষ। হাসিনা-রেহানার সব ধান্দার মাস্টার মাইন্ড হলেন আবুল হোসেন। আবুল দশ হাতে লুটপাট করে আর আট হাতের কামাই হাসিনা-রেহানাকে দেয়। আমি যে জামানার কথা বলছি তখনো সালমান, এস আলমরা ফোটেনি—তারা তখনো কলির মধ্যে থেকে ফোটার জন্য ছটফট করছিল। ফলে দুর্নাম-বদনাম সব আবুল হোসেনকে নিয়েই হচ্ছিল। বিরোধী দলে আবুল বিরক্তি যতটা না ছিল তার চেয়ে বেশি ছিল সরকারি দলে। পার্লামেন্টে সৈয়দ আবুল হোসেন কথা বলার জন্য দাঁড়ালেই সরকারি দলের এমপিরা টিটকারি করত—কেউ কেউ শিস দিত। অনেকে অকারণে টেবিলে চাপড়িয়ে মুখে মারহাবা, ভুয়া ইত্যাদি আওয়াজ তুলে ভদ্রলোককে বিব্রত করার চেষ্টা করত।
উপরোক্ত অবস্থায় আমার খুব মায়া হতো। জন্ম থেকেই আমি কৃতজ্ঞ প্রকৃতির মানুষ। যার নুন খাই, তার গুণ গাই এবং যাকে পছন্দ করি তার জন্য যেকোনো ঝুঁকি নিতে পারি। আর যার ওপর থেকে মন উঠে যায় তার দিকে ফিরেও তাকাই না। ফলে সৈয়দ আবুল হোসেনের জন্য খারাপ লাগছিল। কারণ আমি জানতাম তিনি অতটা দায়ী নন, যেভাবে তাঁকে দায়ী করা হয়। দ্বিতীয়ত, মন্ত্রণালয় চালাতে গিয়ে তিনি যে আন্তরিকতা, নিষ্ঠা, নিয়মানুবর্তিতা, দক্ষতা ইত্যাদি প্রদর্শন করেছেন তা যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের ইতিহাসে এর আগে কেউ করে দেখাতে পারেননি। আমি এসব বিষয়ে খুঁটিনাটি জানতাম, কারণ আমি বৃহত্তর যোগাযোগ মন্ত্রণালয়সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির সদস্য এবং তিনটি উপ-কমিটির সভাপতি ছিলাম।
তৃতীয়ত, শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা সম্পর্কে আমার ভক্তি-শ্রদ্ধা ছিল সর্বোচ্চ পর্যায়ের এবং আমি ভাবতেই পারতাম না যে তারা তাদেরই নিয়োগকৃত লোকের সঙ্গে মিলেমিশে দুর্নীতি করবে। অথচ তাদের নিয়ে দলের ভেতরে-বাইরে দুর্নাম-বদনাম এতটা ডালপালা বিস্তার করেছিল, যার বিপরীতে কোনো ইতিবাচক কথা প্রচার অসম্ভব ছিল। এই অবস্থায় আমি যখন রাহুল রাহার নিকট কাহিনিটি শুনলাম, তখন আমার মাথায় নিদারুণ এক আইডিয়া খেলে গেল। আমার মনে হলো—আমি যদি কাহিনিটি বলি তবে শেখ হাসিনা এবং সৈয়দ আবুল হোসেনের মধ্যকার সত্যিকার সম্পর্কটি উন্মোচিত হবে এবং এ ধরনের সম্পর্কের মধ্যে কখনো যে অনৈতিক লেনদেন হয় না তা সহজে বোঝানো যাবে। তো গল্প বলার পর কী কী ঘটেছিল তা বলার আগে সংক্ষেপে গল্পটি বলে নিই।
বিএনপি জামানার কোনো একসময়—সম্ভবত ২০০২-০৩ সালে শেখ হাসিনা চীন সফরে গিয়েছিলেন। চীন সরকারের নিমন্ত্রণে দলের নেতাকর্মী এবং অনুগত সাংবাদিকদের মধ্যে ওবায়দুল কাদের, সাবের হোসেন চৌধুরী, সৈয়দ আবুল হোসেন এবং রাহুল রাহা প্রমুখরা ছিলেন। তাঁরা চীনের অনেক ঐতিহাসিক স্থান পরিদর্শন করেছিলেন, সেগুলোর মধ্যে ছিল হ্যাংজু প্রদেশ।
আমি নিজে বহুবার হ্যাংজু ভ্রমণ করেছি এবং সেখানকার বিখ্যাত ওয়েস্ট থেকে অনেক অনুষ্ঠান উপভোগ করেছি। ফলে বাহুল রাহা যখন বিখ্যাত দৌড়ের কাহিনিটি বললেন, তখন আমি ধরে নিলাম সেটি সম্ভবত ওয়েস্ট লেকে হয়েছিল এবং সেই কল্পনা থেকে বললাম—
ওয়েস্ট লেকের মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক পরিবেশ দেখে শেখ হাসিনা আবেগে আপ্লুত হয়ে গেলেন। আর আপনারা তো জানেন, আবেগপ্রবণ শেখ হাসিনা প্রায়ই শিশুর মতো সহজ-সরল হয়ে পড়েন। তো সেদিন হঠাৎ তাঁর মনে হলো সেখানে একটি দৌড় প্রতিযোগিতা হলে উপভোগ্য হবে। তিনি মজা করে বললেন, ‘তোমরা সবাই দৌড় দেবে এবং যে দৌড়ে ফার্স্ট হবে তাকে আগামীতে মন্ত্রী বানানো হবে।’ উপস্থিত আওয়ামী লীগ নেতারা বিষয়টি সহজভাবে নিলেও সৈয়দ আবুল হোসেন সিরিয়াসলি নিলেন এবং প্রাণপণে দৌড় সবাইকে পেছনে ফেলে ফার্স্ট হলেন। তারপর শেখ হাসিনাকে বললেন, ‘আপা কিন্তু কথা দিয়েছেন আমাকে মন্ত্রী বানাবেন। আমার অনুরোধ আমাকে কিন্তু যোগাযোগ মন্ত্রণালয় দিতে হবে।’ পরবর্তীকালে ২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হওয়ার পর আবুল হোসেন শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করে তাঁর অতীত প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করিয়ে দেন।
উল্লেখিত গল্পের মাধ্যমে আমি শেখ হাসিনা ও সৈয়দ আবুল হোসেনের সম্পর্কের যে জটিল রসায়ন তুলে ধরতে চেয়েছিলাম তা হিতে বিপরীত হয়ে যায়। কেউ একটিবারের জন্যও চিন্তা করল না যে নিয়োগকর্তার সঙ্গে অধীনদের পারস্পরিক অর্থনৈতিক যোগসাজশ সহজে হয় না, সেখানে সম্পর্কটি হয় এক্সট্রিম লেভেলের শ্রদ্ধা, স্নেহ ও ভালোবাসার কারণে। বরং উল্টো পত্রপত্রিকাগুলো বোঝাতে চাইল যে শেখ হাসিনা খেলাচ্ছলে লোকজনকে মন্ত্রী পদে বসান এবং আবুল হোসেন কোনো যোগ্যতা ছাড়াই শুধু দৌড়ে ফার্স্ট হয়েই মন্ত্রী পদে আসীন হয়েছেন। পত্রপত্রিকার প্রতিবেদন এবং দলের ভেতরে-বাইরে প্রবল সমালোচনার কারণে আমার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠল এবং সবাই ধরেই নিলো, এবার রনির কেল্লা ফতে হয়েই যাবে।
মামলার দিন আমি সংসদে গেলাম। প্রথমেই ওবায়দুল কাদের বললেন—নেত্রী দৌড় দিতে বলছিলেন। আমি দিইনি। সাবের এবং আবুল দিয়েছে। বিকেলে মিটিং চলাকালে আমাকে প্রধানমন্ত্রী এবং সংসদ নেত্রী জিজ্ঞাসা করলেন—তুমি ওই গল্প কার কাছে শুনেছ? আমি বললাম, রাহুল রাহার নিকট। তিনি খানিকটা কৃত্রিম রাগ করার চেষ্টা করলেন এবং বললেন, রাহুল রাহার কাছে শুনেই টেলিভিশনে বলে দিলে। তোমার তো উচিত ছিল গল্প বলার আগে আমার সঙ্গে আলাপ করা। তুমি যে স্থানের কথা বলেছ, ওটা ঠিক নয়। ওটা লেকের পাড় ছিল না, ওটা ছিল একটি স্পোর্টস স্কুল! আর সেই দৌড়ে তো আবুল ফার্স্ট হয়নি, ফার্স্ট হয়েছিল সাবের। যদি দৌড়ে ফার্স্ট হলেই মন্ত্রী হওয়া যেত, তাহলে তো সাবের মন্ত্রী হতো…! আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে নেত্রীর কথা শুনছিলাম এবং পর্দার আড়ালে ক্ষমতার নাচানাচির সমীকরণ অনুধাবনের চেষ্টা করছিলাম।
লেখক : গোলাম মাওলা রনি
দৈনিক কালের কণ্ঠ
জানুয়ারি ১৪, ২০২৫