পাথরের আড়াল থেকে যেন উঁকি দিল লাল রঙের সূর্য—সাদা টুপি লাল গির্দি। ছবি : লেখক

ঝরনার ছন্দে লাল-নীল নৃত্য

Share

ঝরনার পাখি—নামটি শুনলেই চোখে ভেসে ওঠে কলকল শব্দ, ভেজা পাথর আর জলের স্রোতে তাল মিলিয়ে লাফিয়ে চলা ছোট্ট পাখির দৃশ্য। এমন ভাবনাই টান দিল এক শীতের রাতে। ব্যাকপ্যাক গুছিয়ে রাতে রওনা দিলাম মৌলভীবাজারের উদ্দেশে। সঙ্গী না থাকায় একটু খারাপ লাগছিল।

শীত পড়েছে খুব। ভারী জামা গায়ে। জানালার বাইরে রাতের অন্ধকার। ভেতরে একরাশ উত্তেজনা।

গাড়িতে হঠাৎ দেখা হয়ে গেল নিসর্গ আর নাদিমের সঙ্গে। দুজনই পাখিপ্রেমী। সঙ্গী পেয়ে যাত্রা হয়ে উঠল আনন্দের। ভোরের দিকে মাধবকুণ্ড ঝরনার কাছে পৌঁছলাম।

ঝরনার দিকে এগোতেই চারপাশে নানা পাখির কিচিরমিচির কানে আসছিল। ক্যামেরা দ্রুত প্রস্তুত করলাম। মনে হচ্ছিল, সকালে ট্যুরিস্ট কম থাকলে ঝরনার পাখিদের ভালোভাবে দেখা যাবে।

কিন্তু কাছে গিয়ে একটু হতাশই হলাম। কয়েকজন ট্যুরিস্ট ঝরনার আশপাশে ঘোরাফেরা করছেন। পাখির দেখা নেই। তবু সিদ্ধান্ত নিলাম অপেক্ষা করব। কিছু সময় পর ট্যুরিস্টদল সরে যেতেই দৃশ্য বদলাল। ভেজা পাথরের আড়াল থেকে যেন উঁকি দিল লাল রঙের ছোট্ট সূর্য—সাদা টুপি লাল গির্দি, ইংরেজিতে হোয়াইট-ক্যাপড ওয়াটার রেডস্টার্ট।

পাখিটি চোখে পড়ার মতো বৈশিষ্ট্য তার রং। পুরুষ পাখির মাথার ওপরে উজ্জ্বল সাদা টুপি, গলা ও বুক গাঢ় লালচে-খয়েরি, ডানা ও পিঠ কালচে। স্ত্রী পাখি তুলনামূলক ম্লান, ধূসর-বাদামি শরীর। মাথায় সাদা অংশ কম স্পষ্ট, কিন্তু লেজের লালচে আভা দুই লিঙ্গেই দেখা যায়। পাহাড়ি ছড়া, ঝরনা আর দ্রুত বয়ে চলা পানির ধার ঘেঁষে এরা থাকতে ভালোবাসে।

আচরণে এরা বেশ চঞ্চল। পাথরের ওপর লাফিয়ে লাফিয়ে চলা, হঠাৎ থেমে লেজ ঝাঁকানো—এটিই তাদের চেনা ভঙ্গি। খাবার হিসেবে এরা মূলত জলজ ও উড়ন্ত ছোট পোকামাকড় খায়—মাছি, মশা, জলজ লার্ভা। জলের ওপর দিয়ে উড়ে গিয়ে হঠাৎ খাবার ছোঁ মেরে ধরার দৃশ্য দেখলে চোখ ফেরানো কঠিন।

ঝরনার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলে নীল গির্দি। ছবি : লেখক

ফেরার পথে আরো এক বিস্ময় অপেক্ষা করছিল—নীল গির্দি বা প্লাম্বিয়াস ওয়াটার রেডস্টার্ট। নামের মতোই এর শরীর নীল রঙের। পুরুষ পাখি গাঢ় নীলচে-ধূসর, লেজের নিচে লালচে আভা স্পষ্ট। স্ত্রী পাখি একটু হালকা ধূসর, তবু ঝরনার পটভূমিতে দারুণ মানিয়ে যায়। এদেরও বাস ঝরনা আর পাহাড়ি ছড়ায়। আচরণে এরা সাদা টুপি লাল গির্দির মতোই স্রোতের পাশে পাথরে বসে থাকা, হঠাৎ লেজ মেলে নাচের মতো ভঙ্গি, তারপর ঝাঁপিয়ে পড়ে খাবার ধরা।

ঝরনার বয়ে চলা জলের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এই পাখির চলাফেরা, লেজ ছড়িয়ে নাচ, পাথরে লাফ—সব মিলিয়ে এক অনন্য ছন্দ তৈরি করে। এমন দৃশ্য মনটাকে অদ্ভুতভাবে ভালো করে দেয়।

তবু একটা ভয়—বাড়তে থাকা পর্যটনের চাপ, শব্দ, ভিড়। এই নাজুক ঝরনা পরিবেশ যদি বদলে যায়, হয়তো একদিন এই সুন্দর পাখিগুলোকে আমরা হারিয়ে ফেলব। ঝরনার সৌন্দর্য শুধু জল আর পাথরে নয়, এই লাল-নীল রঙের জীবন্ত ছন্দেও লুকিয়ে আছে। এদের টিকিয়ে রাখতে হলে প্রকৃতির সঙ্গে আচরণে আমাদের দায়িত্বশীল হতে হবে।

সূত্র: কালের কন্ঠ।