সন্তানের স্নেহ-মমতার জায়গা থেকে অভিভাবক হিসেবে আমাদের একটি পরিমিতিবোধ থাকা প্রয়োজন। যদিও সেটা অনেক ক্ষেত্রেই মেনে চলা সম্ভব হয় না—মানছি। কিন্তু আমি কতটুকু ভালোবাসা সন্তানের জন্য বরাদ্দ রাখব আর কতটুকু তার শিক্ষকের জন্য—সেই বিষয় নিয়ে লেখা দুরূহ। তখনই মাথায় ঘোরপাক খায় একটি প্রশ্ন—তাহলে “শিক্ষাগুরুর মর্যাদা কি আজ প্রশ্নবিদ্ধ”? হয়তো! নাহলে লিখতে হচ্ছে কেন?
“শিক্ষক”—এমন একটি পেশার নাম, যা শুনলেই শ্রদ্ধায় মাথা অবনত করে কুর্নিশ করতে ইচ্ছে করে। বর্তমান সমাজে আসলেই কি সেই ইচ্ছে জাগে হৃদয়ে? যখন দেখি, আমারই সন্তান শিক্ষকের নিপীড়নের শিকার হয়ে নিভৃতে গুমরে গুমরে কাঁদে! বলা যায় না তো—শিক্ষক এমনটা করেছে! ফলে আড়ালে থেকে যায় অনেক শিক্ষার্থীর কষ্টগাঁথা। কেউ কেউ যন্ত্রণা বয়ে বেড়াতে না পেরে আত্মহত্যার মতো অমানবিক সিদ্ধান্ত নিতেও দ্বিধা করে না। প্রাইভেট না পড়ার ‘অপরাধে’ কত কোমলমতি শিশুকে যে নির্যাতনের শিকার হতে হয় ক্লাসে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আমার সন্তানের বেলায়ও ঘটেছে এমনটা।
মাত্র কয়েক দিন আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী মুনিরা মাহজাবিন মিমোর আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে সহযোগী অধ্যাপক সুদীপ চক্রবর্তীকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠিয়েছে পুলিশ। মিমোর চিরকুটে নাম ও হোয়াটসঅ্যাপ বার্তার ভিত্তিতে শিক্ষক সুদীপকে ২৬ এপ্রিল ২০২৬-এ বাড্ডা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় তোলপাড় চলছে। থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগ নিয়ে শোনা যাচ্ছে অনেক অশোভন কথাবার্তাও। যাই হোক—ঢাবি কর্তৃপক্ষ শিক্ষক সুদীপ চক্রবর্তীকে সব ধরনের একাডেমিক কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি দিয়েছে এবং বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে।
শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন ঘটনা বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবার ঘটেছে—এমন নয়! অহরহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এমন ঘটনা ঘটছে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় আরও একটি ঘটনা জনমনে বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে! ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট বনপাড়া আদর্শ স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধিকাংশ শিক্ষকের একাডেমিক সার্টিফিকেট নাকি ভুয়া। ময়মনসিংহের আরেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তারাকান্দা ইসলামিয়া কলেজেও একই পদ্ধতিতে নিয়োগ পেয়েছে অনেক শিক্ষক। তারাও শিক্ষক বটে! কীভাবে সম্ভব হলো এমন ঘটনা—জানতে চাওয়া অন্যায় হবে না নিশ্চয়ই।
সম্প্রতি ঢাকার উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজে শ্রেণিকক্ষে এক শিক্ষকের সঙ্গে এক শিক্ষার্থীর ‘অপ্রীতিকর’ ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠানের ভেতরে-বাইরে ব্যাপক অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। ঘটনাটা এমন—দিবা শাখার বাংলা মাধ্যমের দশম শ্রেণির শ্রেণিকক্ষে পদার্থবিজ্ঞানের একজন শিক্ষকের কাছে বাংলা বিষয়ের একটি প্রশ্নের সমাধান জানতে চায় এক শিক্ষার্থী। শিক্ষক তাকে বাংলা বিষয়ের শিক্ষকের কাছ থেকে বুঝে নিতে পরামর্শ দেন। কিন্তু ছাত্রটি আরও একবার শিক্ষকের কাছে এ বিষয়ে জানতে চায়। একপর্যায়ে শিক্ষকের কাছে গেলে ওই ছাত্র ‘অশোভন’ আচরণ করে। তখন শিক্ষক ওই শিক্ষার্থীকে থাপ্পড় দেন।
এটাতো খুব সাধারণ একটি ঘটনা—কিন্তু সাধারণ কোনো ঘটনাতো আর গল্প হয় না। গল্পটা হচ্ছে—থাপ্পড় খাওয়া ওই শিক্ষার্থীর বাবা একজন বিচারপতি। বিচারপতি মহোদয় জীবদ্দশায় সত্যিকারের বিচারক হয়ে উঠতে পেরেছেন কিনা—মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন! যে বিচারপতি সন্তানের অন্যায় স্বীকার না করে তার শিক্ষককে বাসায় ডেকে অপদস্থ করেন, তার নৈতিকতা নিঃসন্দেহে প্রশ্নবিদ্ধ। এই ধৃষ্টতা দেখানোর সাহস তিনি কোথা থেকে পেলেন—জানা দরকার। তার চাকরির বিধির সঙ্গে এটি সাংঘর্ষিক হলে অবশ্যই তার অপসারণ চাই।
একই সঙ্গে স্কুলের মাঠে সকল শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের সামনে হাঁটু গেড়ে ক্ষমা প্রার্থনা করানো—যা সোশ্যাল মিডিয়ায় লাইভ স্ট্রিমিং হবে—এ দাবিও উঠতে পারে।
আর উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের প্রধান শিক্ষকের কাছে একটি প্রশ্ন—আপনি কেন বিচারপতিকে আপনার স্কুলে আনতে ব্যর্থ হলেন? শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নাকি ব্যক্তি বড়—এই প্রশ্নের উত্তর জরুরি।
আপনার নিশ্চয়ই মনে আছে, ’২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক তার কক্ষ থেকে ফ্যাসিস্ট হাসিনার ছবি নামিয়ে ফেলেছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কত শিক্ষক শিক্ষার্থীদের সামনে দাঁড়িয়ে ঢালের মতো আগলে রেখেছিলেন। সারাদেশের চিত্র প্রায় একই ছিল। সেগুলো ভুলে গেলে চলবে না।
জাতি গঠনের অন্যতম এই কারিগরদের নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা অনেক করা যায়—করতে চাই না। আমরা এখনো মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি, এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা। শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা সেইসব শিক্ষকদের প্রতি, যারা আজও হাজারো প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেও সত্যিকারের শিক্ষক। তারাই আমাদের আলোকোজ্জ্বল ভবিষ্যতের পথপ্রদর্শক।
বিনম্র শ্রদ্ধা নিবেদন করছি সকল শিক্ষকদের প্রতি—কখনো তাদের সম্মান ও মর্যাদায় আঘাত না লাগুক।