এক নিভৃতচারী আলোকবর্তিকা

Share

একজন গৃহিণী তার নিজের বাড়িতে যমুনা নদীর বোয়াল মাছ কাটছেন আর বলছেন-আমার নামের শেষে একটা চাঁপা আছে কিন্তু আমি চাঁপাবাজি করি না। তার জীবনসঙ্গী যে বোয়াল মাছ এনেছেন সেটা সাইজে বেশ বড়ো- কাটা সহজ নয়। কিন্তু রান্না করতে হলে আগেতো মাছ কাটতে হবে। জীবনসঙ্গী বলছেন এটা কোনো ব্যাপার না- তুমি পারবা। সেই কথায় আবার গৃহিণী বলছেন- তিনি (জীবনসঙ্গী) যে ভালোবাসাময় বিশ্বাস নিয়ে মাছটা কাটতে বলছেন সেই বিশ্বাসটা তার রাখা উচিৎ!

এই যে বোধ-এক কথায় অসাধারণ।

ব্যক্তি জীবনে আমরা কে কতোটা সুখি সেটাতো প্রকাশ করি না- বুঝে নিতে হয়। এখানেও আমরা বুঝে নেবো।

কথা বলছিলাম কনকচাঁপাকে নিয়ে। ভাবছেনতো এটা আবার কোন কনকচাঁপা?

আসলে কনকচাঁপা অনেকের কাছে পরিচিত একটি ফুলের নাম। অর্থ- সোনালী রঙের সুগন্ধি ফুল। নাম জানলেও এর সাথে পরিচয় ঘটেনি অনেকের। পরিচয় ঘটুক আর নাই ঘটুক সেটা হয়তো ফুলের বেলায়, কিন্তু কনকচাঁপার গান শোনেনি বাংলাদেশ অথবা বাংলা ভাষাভাষী বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে বাস করা মানুষ খুঁজে পাওয়া সত্যিই মুশকিল। এবার আশাকরি কনকচাঁপাকে চিনতে আর অসুবিধা হচ্ছে না। হ্যাঁ, আমারা বলছি জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী রুমানা মোর্শেদ কনকচাঁপার কথা। জন্ম ১১ সেপ্টেম্বর ১৯৬৯ ঢাকায়। বাবা আজিজুল হক মোর্শেদ। সব্যসাচী এই মানুষটি পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা এবং চিত্রকর ছিলেন। তিনি শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন সাহেবের চারুকলার দ্বিতীয় ব্যাচের ছাত্র ছিলেন।

কনকচাঁপার দাদাবাড়ী সিরাজগঞ্জের কাজিপুর। দাদা কাজেম উদ্দিন শেখ। ১৯২১ সালে জলপাইগুড়ি জিলা স্কুলের নামকরা শিক্ষক ছিলেন তিনি। তার নানাভাই মজিবর রহমান। তিনি বগুড়ার গোঁসাইবাড়ি উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ছিলেন টানা চল্লিশ বছর। মা জনাবা মোমেনা জাহান একজন ইসলামি চিন্তাবিদ ও সমাজসেবি।

পাঁচ ভাই বোনের মধ্যে কনকচাঁপা তৃতীয়। বাবার কাছেই সঙ্গীতের হাতেখড়ি। তার পর সঙ্গীতের তালিম নেয়া শুরু করেন বাংলাদেশের প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী ওস্তাদ বশীর আহমেদের কাছে।

কনকচাঁপা একজন চিত্রকরও বটে। তিনি সুঁই সুতা, গাছের পাতা, মাটি বালু দিয়ে জলরং ও এ্যক্রিলিক রং নিয়ে কাজ করেন। তার একটি একক চিত্র প্রদর্শনী হয়েছিল শিল্পকলা একাডেমিতে ২০১৬ সালে।

বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী এই মানুষটি প্রায় চার দশক ধরে বাংলা গানের জগতে একক আধিপত্ত বিস্তার করে ছিলেন। বিশেষ করে চলচ্চিত্রের গানে। নায়িকা শাবনূরের ঠোঁটে প্রায় সব গান কনকচাঁপার গাওয়া। ৩ হাজারের অধিক চলচ্চিত্রে কণ্ঠ দিয়েছেন তিনি। এছাড়াও আধুনিক নজরুলসঙ্গীত লোকগীতি সহ প্রায় সব ধরনের গানে সমান পারদর্শিতা দেখিয়েছেন। প্রকাশ হয়েছে ৩৫ টি একক অ্যালবাম। শ্রোতাপ্রিয় বহু গান রয়েছে তার। মায়াবি কণ্ঠের যাদুতে বিমোহিত করেছেন বহু তরুণের হৃদয়। উল্লেখযোগ্য গানের মধ্যে-
*যে প্রেম স্বর্গ থেকে এসে জীবনে আমর হয়ে রয়
*তুমি আমার এমনই একজন যারে একজনমে না দেখিলে ভরবে না অন্তর
*অনেক সাধনার পরে আমি পেলাম তোমার মন
*আমি মেলা থেকে তাল পাতার এক
*অনন্ত প্রেম তুমি দাও আমাকে
এমন হাজারেরও অধিক কালজয়ী গানের শিল্পী তিনি।

১৯৭৮ সালে নতুনকুঁড়ি প্রতিযোগীতায় পুরষ্কার পাওয়ার মধ্যদিয়ে শুভসূচনা এরপর “জাতীয় শিশু প্রতিযোগীতায় পরপর তিনবার চ্যাম্পিয়ন হবার গৌরব অর্জন করেন। মাদারটেক আব্দুল আজিজ হাইস্কুল থেকে এসএসসি এবং ভিকারুননিসা নুন স্কুল অ্যান্ড কলেজে এইচএসসিতে ভর্তি হন। সেই সময়েই ১৯৮৪ সালের ৬ই ডিসেম্বর সঙ্গীত পরিচালক ও সুরকার মইনুল ইসলাম খানের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের এক পুত্র এবং এক কন্যা সন্তান আছে। আর আছে পাঁচ জন নাতীনাতনী।

গানের পাশাপাশি কনকচাঁপা লেখক হিসেবেও পরিচিতি পেয়েছেন। তার লেখা প্রথম বই “স্থবির যাযাবর” অনন্যা প্রকাশনী থেকে ২০১০ সালের অমর একুশে গ্রন্থমেলায় প্রকাশিত হয়। ২০১২ সালে “মুখোমুখি যোদ্ধা” পাঞ্জেরী প্রকাশনা থেকে প্রকাশ পায়। এরপর “মেঘের ডানায় চড়ে”
জীবনীমূলক গ্রন্থ “কাটাঘুড়ি ১” “কাটাঘুড়ি ২” “কাটাঘুড়ি ৩” “এসো সেই পথে যাই”-অনন্যা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছে। বই লেখার পাশাপাশি অনেকগুলো জাতীয় পত্রিকায় নিয়োমিত কলাম লেখেন তিনি।

তার লেখা কতোটা গভীর সেটা উপলব্ধি করতে হলে তাকে অধ্যয়ণ করা প্রয়োজন। তার লেখা কয়েকটি লাইন (বান্ধবীদের আড্ডার অংশ) আমার হৃদয় ছুঁয়েছে- “কে কবে কোথায় প্রেমে পড়লো এই গল্প খুবই বিস্ময়ের সঙ্গে আগ্রহ নিয়ে শুনতাম আর ভাবতাম এই মেয়েটি তো ডাকাত দলের সর্দারের চাইতেও সাহসী। তাকে বাহবা দিতে চেয়েও সমাজের ভালোমন্দ ভেবে কপট ধিক্কার জানাতাম। যদিও মনে মনে জানতাম যদি একদিন ভালোবাসা, মৃত্যু যে তারপর তাও যদি হয়! আমি চাই আমার সঙ্গে তাই হোক।
-কিশোরী বয়সের ভেতরের যে আকুতি তা কতই না সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন মাত্র কয়েটি লাইনে! অসাধারণ!

আবার সময়টাকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে তিনি লিখছেন-“কিন্তু মাকে ভয়, বাবাকে ভয়, যাকে ভালোবাসি তাকে ভয়, নিজেকে ভয়, নানাভাইয়ের ভয়, ওস্তাতজীর ভয়-তাহলে!? আমি কি এমন একাই বসে থাকবো? ওই হাত কি আমি কখনোই ধরবো না? এসব অযাচিত ভাবনায় আমার টিফিনের প্রতি আগ্রহ একদম কমে গেলো। অসাধ্য সাধন করা আরাধনার মত টিফিনের পরমানু সমান পয়সা জমাতে লাগলাম আমি-অজানা তাঁর জন্য। একটা আঙটি কিনবো! হা হা হা। কে সে, কি তার আঙ্গুলের মাপ, কেমন তার পছন্দ কিছুই জানিনা আমি অথচ পয়সা জমাই।”
-সত্যিত তো সেই সময়ের প্রেমের অনুভুতি এর চেয়ে আরও গভীরভাবে প্রকাশ করা যায়…!? যায় না। এমন অনেক লেখায় কনকচাঁপা কেমন লেখক তা আমাদেরকে চিনতে সাহায্য করে।

অবসরে বা একাকিত্তে নিজের লেখা কবিতা আবৃত্তি করেন। কিযে মায়া সে কণ্ঠে! অনুভব করলে হৃদয়ে শ্রদ্ধা যাগে। ওনার কবিতার লাইন থেকে কয়েকটি লাইন উদ্ধৃত করছি…
*প্রেম সেতো প্রসাদ পুঁজোআচ্চার পর দেবীর মনের আস্বাদ!
আরতিবেলায় পুঁজারী প্রচন্ড ভালোবাসায়
ঘণ নীল হাতে নীষাদে বাজায় ঘন্টা
কেউ না শুনলেও তীর্যনিনাদে দুলে ওঠে দেবীর মনটা।
*কি হয় মা ক খ লিখতে না পাড়লে
স্বপাটে চর এসে বসলো গালে
মা এমন নিষ্ঠুর কেনো হলে
তুমি জানো না আমার এখন কতো কাজ!
-এ ধরনের আবৃত্তি আপনাকে অন্য এক জগতে নিয়ে যাবে।

পৃথিবীর নানা প্রান্তে তিনি গান গাইতে গিয়েছেন প্রায় দুই শতাধিক বার। প্রবাসীদের জন্য তার ভালোবাসার প্রকাশ-সে এক মায়ার গল্প। সবাই তাকে নিজের আত্মীয় বা নিকট কেউ মনে করে সম্মোধন করতে দ্বীধা করেন না। তার সহজ-সরল মায়াবী চেহারা এবং নিরহঙ্কার ব্যক্তিত্ব সবাইকে ভালোবাসতে বাধ্য করবে। যে কারণে বিশ্বজুড়ে বাস করা কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন অবলীলায়।

প্লেব্যাক কণ্ঠশিল্পী হিসেবে তিনবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কার, মেরিল প্রথম আলো পুরষ্কার পরপর চারবার (৯৯ ২০০০ ২০০১ ২০০২), ঢালিউড অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন আটবার।
এছাড়াও বাচসাস চলচ্চিত্র পুরষ্কার, দর্শক ফোরাম পুরষ্কার ১৯৯৮ এবং ১৯৯৯, প্রযোজক সমিতি পুরষ্কার ১৯৯৫ সহ অসংখ্য পুরষ্কারে ভুষিত হয়েছেন।

তার সবচেয়ে বড়ো পুরষ্কার হলো মানুষের ভালোবাসা পেয়েছেন। মানুষের ভালোবাসা পাওয়া সত্যিই কঠিন এক কাজ। দু’একজন অযাচিতভাবে তার সম্মান ক্ষুন্ন করতে চাইলেই সেটা সম্ভব! না! সম্ভব নয়। কারণ কাঞ্চনজঙ্ঘার গায়ে যতো মাইল বেগেই ঝরো হাওয়া বইয়ে যাক না কেনো, তাতেকি কাঞ্চনজঙ্ঘা টলে পরে কখনো! পরে না। বরং তাকে জয় করতে গিয়ে কতো জনের দীর্ঘ সাধনার প্রয়োজন হয়, যে জয় করতে যায় সেই কেবল বোঝে!

জনহিতকর কাজে সর্বদা নিজেকে বিলিয়ে দেয়ার অংশ হিসেবে সক্রিয় রাজনীতিতে জড়ানোর ইচ্ছে থেকেই ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিরাজগঞ্জ-১ কাজীপুর আসন থেকে তিনি বিএনপির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেন। কারচুপির সে নির্বাচনে জয় না পেলেও এলাকার জনগণের ভালোবাসায় শিক্ত হয়েছেন তিনি। এলাকার নানা উন্নয়নমূখী কর্মকান্ডে জনগণের পাশে থেকে তাদের সাথে নিয়ে একতাবদ্ধ হয়ে কাজ করেন। যা তার জীবনের অন্যতম পাওয়া। মানুষের জন্য মানুষ কাজ করবে খুব স্বাভাবিক ঘটনা কিন্তু নি:শ্বার্থ ভাবে কাজ করে যাওয়া মানুষের সংখ্যা দিনদিন কমে যাচ্ছে সমাজে। তাই কনকচাঁপাদের মতো মানুষের ভীষণ রকম প্রয়োজন সমাজের তথা রাষ্ট্রের জন্য। যিনি অকাতরে নিজেকে বিলিয়ে দিচ্ছেন সাধারণ মানুষের কল্যাণে। আমরা কি তার প্রাপ্য মর্যাদা রক্ষায় কিছুই করতে পারি না!? তার ব্যক্তিত্ব, মানুষের প্রতি ভালোবাসার শক্তিকে সমাজ বা রাষ্ট্রের প্রয়োজনে ব্যবহার করার সুযোগ তৈরি করা খুব কি কঠিন কিছু! চাইলেই সম্ভব।

আজকাল মানুষ শিষ্টাচার সুবচন এবং নৈতিকতা থেকে অনেক দূরে সরে যাচ্ছে, গ্যাজেট নির্ভরতা গ্রাস করছে পুরো প্রজন্মকে। উত্তরণের গল্প বলার জন্য পথনির্দেশক প্রয়োজন। যুগে যুগে তাই ঘটেছে। কারো না কারো লেখায় আদর্শে উজ্জীবীত হয়েই প্রাণ ফিরে পেয়েছে সমগ্র জাতি। পরোক্ষভাবে এসব নিয়েই কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। “ছায়াতল” নামক সুবিধাবঞ্চিত পথশিশুদের অর্গানাইজেশনের উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছেন। আছে একটি বৃদ্ধাশ্রম এবং সিলেটের চেইজ বিগেন্স নামক অসহায় নারীদের জন্য একটা অর্গানাইজেশনেরও উপদেষ্টা তিনি। এছাড়া দরিদ্র অসহায় ছাত্রছাত্রীদের পাশে আজীবন ছায়ার মতো থেকে কাজ করে যাচ্ছেন। এক কথায় তিনি একজন সমাজসেবক। সাদা মনের মানুষ।

অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ২০১৩ সাল থেকে একটা স্কুল চালান সেখানে কিন্তু গান শেখানো হয় না! শেখানো হয় সুবচন শিষ্টাচার ও নৈতিকতা সহ জীবন মৃত্যুর মধ্যবর্তী যাবতীয় কিছু! এই স্কুলের নাম “আমাদের খেলাঘর ইশকুল”। ছাত্রছাত্রীদের তিনি মা’বন্ধু। কি চমৎকার তা-ই না!?

কনকচাঁপা আমাদের সংস্কৃতি অঙ্গনে শুধু নয় ঘুঁণেধরা সমাজ বিনির্মানে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। যার আদর্শের পথনির্দেশীকা সমাজে আলো ছড়াবেই! কিছু শব্দের যাদুকরি বন্ধনে একজন কনকচাঁপাকে ফুটিয়ে তোলা খুব সহজ নয়! তাকে জানতে বুঝতে হলে অধ্যয়ণ করতে হবে। তার মায়াভরা কণ্ঠের রহস্য উন্মোচন করতে হলে তাকে নিয়ে উচ্চতর গবেষণা হওয়া প্রয়োজন। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনে ব্যাপক পরিসরে তাকে নিয়ে কাজ হোক তাহলেই নতুন এবং ভবিয্যৎ প্রজন্ম তাকে ধারণ করতে পারবে। কনকচাঁপাদের মত গুণি মানুষ সংস্কৃতিসেবীদের পদাঙ্ক অনুসরণ করেই বাংলা সংস্কৃতি এবং আমাদের এই আধুনিক কিন্তু পঙ্কিল সমাজটাও এগিয়ে যাক বহুদূর। শ্রদ্ধাঞ্জলি কনকচাঁপা!

 

এস এম হুমায়ুন কবির
প্রশিক্ষক ও নির্মাতা