ট্রেন এসে থেমেছে স্টেশনে। দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রীদেরকে অল্পক্ষণের মধ্যে উঠতে হবে। এমন পরিস্থিতিতে তাড়াহুড়ো করে ওঠার চেষ্টা করেন যাত্রীরা। এতে ধাক্কাধাক্কি হয়। কখনো নারী যাত্রীদেরকে টেনে বা ঠেলে তোলার চেষ্টা করেন সঙ্গে থাকা স্বজনরা। কখনো অন্য যাত্রী বা ট্রেনের কর্মীরা ঠেলে বা টেনে ওঠানোর চেষ্টা করেন। কোন কোন নারী যাত্রী ওঠার চেষ্টা করেন ছাদেও। শুধু নারী নন, পুরুষদের ক্ষেত্রে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়। এসব মুহূর্তে নিজের শরীরের কাপড় সব সময় সঠিক জায়গা থাকে না। অন্যরকম বিব্রতকর পরিস্থিতিও তৈরি হয় কখনো কখনো। ভিড়ের মধ্যে কাউকে টেনে হিঁচড়ে ওঠানো হচ্ছে ট্রেনে; যা ক্যামেরা ধারণ করে প্রচার করলে ওই ব্যক্তির জন্য বিব্রতকর হতে পারে।
সাধারণ যাত্রীরা যখন এসব মুহূর্ত পার করছেন, তখন কিছু আশপাশ থেকে কিছু অজানা ক্যামেরায় সেসব দৃশ্য ধারণ করে প্রচার করা হচ্ছে ফেসবুক, ইউটিউবে। বিচ্ছিন্ন দুয়েকটি ভিডিও নয়, বরং যাত্রীদের ট্রেনে ওঠা নামার সময়ের অসহায়ত্বের দৃশ্য এখন ফেসবুকের ‘কন্টেন্ট’-এ পরিণত হয়েছে। বেশ কয়েকটি ফেসবুক আইডি ও পেইজ থেকে নিয়মিত এসব দৃশ্য ধারণ করে পোস্ট করা হয়। এসব ভিডিও দেখছেন এবং শেয়ার করছেন লাখ লাখ মানুষ।
দ্য ডিসেন্ট এমন অন্তত ৬টি পেইজ ও আইডি সনাক্ত করেছে যারা এমন কন্টেন্ট প্রতিদিন আপলোড করেন।
নারী যাত্রীদের ওপর ক্যামেরা
একজন নারী ভিড় ঠেলে ট্রেনের দরজা দিয়ে ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করছেন। এসময় একজন ছেলের শরীরের সাথে ওই নারীর বুকের ধাক্কা লাগে। সেই মুহূর্তের ১৩ সেকন্ডের ভিডিওটি স্লো মোশন মুডে আপলোড করা হয়েছে রিলস অব ট্রেইন নামক একটি পেইজে। পেইজটিতে নারীদের নিয়ে এমন ভিডিও অনেক পাওয়া যায়।
এমন আরেকটি পেইজের নাম Explore by Rezuan। এই পেইজেও নারীদের টার্গেট করে ভিডিও কনটেন্ট বানায় নিয়মিত।
এই দুই পেইজের দুই শতাধিক কনটেন্ট বিশ্লেষণে দেখা যায়, কখনও কোনো নারীর দরজা দিয়ে ট্রেনে প্রবেশের চেষ্টা, জানালা দিয়ে প্রবেশ চেষ্টা এবং কখনও ছাদে ওঠার ভিডিও—এসবই প্রাধান্য পায় পেইজ দুটির কন্টেন্টে।
যাত্রীদের অসহায়ত্বের সুযোগে ভিডিও বানায় এমন ৬টি পেইজের অন্য ৪টি হলো— Md Arafat Hossain, Bangladeshi Train, Train Zone Bangladesh এবং Mahfuz Railway Vlog.09।
‘চেষ্টার কমতি ছিলো না মহিলাটির’, ‘অতিরিক্ত ভিড়ের কবলে আপুটি’, ‘The woman is going home to celebrate Eid at risk’, ‘A woman climbs onto the roof of a train while others watch’, এবং ‘Woman hanging from train gate, soaking wet in rain’ ইত্যাদি ক্যাপশনে এসব পেইজে আপলোড করে ভিডিওগুলো।
পেইজগুলোতে প্রতিদিন একাধিক ভিডিও আপলোড করা হয়। একাধিক পেইজের ফলোয়ার সংখ্যা কয়েক লক্ষ। প্রতিটি পেইজেই কয়েকশ করে এমন ভিডিও রয়েছে।
এসব পেইজের এডমিন কারা এবং কেন তারা এমন কাজ করেন এ ব্যাপারে জানতে পেইজগুলোর সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেছে দ্য ডিসেন্ট। তবে Explore by Rezuan পেইজটি ছাড়া আর কোনো পেইজ রেসপন্স করেনি।
Explore by Rezuan পেইজের ইনবক্সে মেসেজ পাঠালে তারা বিস্তারিত প্রশ্ন পাঠাতে বলেন। তবে প্রশ্ন পাঠানোর পর সেগুলোর উত্তর না দিয়ে এসব তথ্য জানতে চাওয়ার উদ্দেশ্য জানতে চান। এরপর থেকে ওই পেইজটির কার্যক্রম বন্ধ পেয়েছে দ্য ডিসেন্ট।
উল্লিখিত পেইজগুলো প্রতিদিন নতুন নতুন ভিডিও কোথায় পাচ্ছে তা জানা যায়নি। ভিডিওগুলো বিভিন্ন যাত্রীদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয় নাকি এসব পেইজের নিয়োজিত ব্যক্তিরা বিভিন্ন স্টেশনের অবস্থান করে নিজেরা ভিডিও ধারণ করেন তাও জানা যায়নি।
বিদেশী দর্শক টানতে বিভিন্ন দেশের নামে হ্যাশট্যাগ ব্যবহার
Explore by Rezuan নামক পেইজে নারীদের নিয়ে বানানো রিলসে বিদেশি দর্শকদের আকৃষ্ট করতে কন্টেন্টের ক্যাপশন দেওয়া হয় ইংরেজিতে। পাশাপাশি হ্যাশট্যাগে পৃথিবীর নানা দেশ ও শহরের নাম উল্লেখ করা হয়। এসব ক্যাপশন বিশ্লেষণে দেখা যায়, কখনও আমেরিকা-ইউএসএ, আবার কখনও প্যারিস, ব্রিটিশ কলম্বিয়া, অন্টারিও; এসব দেশ ও শহরের নাম বারবার হ্যাশট্যাগে উল্লেখ করা হয়েছে।
মূলত বাংলাদেশ থেকে পরিচালিত কোনো পেইজের ভিডিও কনটেন্ট যদি উন্নত দেশ থেকে দেখা হয়, তবে ওই বাংলাদেশি ক্রিয়েটরের আয় অনেক বেশি হবে। সে কারণে ওই সব অঞ্চলের দর্শক আকর্ষণে ইংরেজিতে ক্যাপশন এবং উন্নত দেশ ও শহরের নাম ক্যাপশনে উল্লেখ করা হয়।
এবং এতে ফলাফল মিলতেও দেখা যায়। অনেক রিলসের কমেন্টে ভিনদেশি দর্শকের কমেন্ট লক্ষ্য করা গেছে।
যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা
এসব ভিডিওর মধ্যে অনেক ভিডিও ভাইরাল হয় এবং লাখো মানুষ সেগুলো দেখেন। নিজের অসহায়ত্বের মুহূর্ত বা অন্যান্য ধরনের বিব্রতকর সময়ের দৃশ্য মানুষ দেখছে এবং সেগুলো নিয়ে কথা বলছে বা অনেক ক্ষেত্রে হাস্যরস করছে– এমনটা দেখলে অনেকে মানসিক ট্রমায় পড়তে পারেন বলে মনে করেন মনোবিজ্ঞানীরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সৈয়দ তানভীর রহমান দ্য ডিসেন্টকে বলেন, ‘‘কেউ যখন তার অসহায়ত্বের ভিডিও এভাবে সোশাল মিডিয়ায় দেখেন এতে তিনি ট্রমাটাইজ হয়ে যেতে পারেন। এমনকি কেউ কেউ পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার-পিটিএসডিতে ভুগতে পারেন। এজন্য এসব ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের মনোযোগী হওয়া দরকার।’’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শাওন্তী হায়দার মনে করেন সস্তা ইনকামের লক্ষ্যেই এসব কনটেন্ট বানানো হয়। এসব প্রতিরোধে বাস্তবসম্মত আইন ও প্রয়োগের বিষয়ে জোর দেন এ শিক্ষক।
তিনি বলেন, ‘‘এমন কন্টেন্টের একটা সোশাল ইম্পেক্ট আছে। কিন্তু এসব কন্টেন্ট বানানো থামানো তো কঠিন। যেহেতু আমাদের দেশে এই ধরনের কোনো বিদ্যমান আইন নাই। থাকলেও সেটার মাধ্যমে কোনো ঘটনা সুরাহা করার কোনো নজির আমাদের দেশে নাই, এজন্য যে যা খুশি তাই করতে পারে। এজন্য আমি বলছি সঠিক আইন ও এর প্রয়োগ ছাড়া আসলে আমাদের দেশে এগুলার কোনো উত্তরণ নাই।’’
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী রায়হান সোবহান বলেন, ‘‘বিষয়টি যেহেতু ব্যাপক হারে ঘটছে, সেহেতু এ বিষয়ে সরকারকে জোরালো পদক্ষেপ নিতে হবে। এসব মানহানিকর ভিডিও ধারণ ও প্রচারের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা জরুরি। এ দায়িত্ব সরকারকেই কার্যকরভাবে পালন করতে হবে।’’
এ বিষয়ে রেলওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ উপ-মহাপরিদর্শক (ক্রাইম এন্ড অপস) তোফায়েল আহমেদ মিয়া দ্য ডিসেন্টকে বলেন, ‘‘এটা তো ভালো না। অবশ্যই খারাপ। কেন করবে? কেউ যদি েসব অন্যরকম উদ্দেশ্যে করে তাহলে তো আসলে খারাপ এবং সেটা তো অবশ্যই দণ্ডনীয় অপরাধই আমি মনে করি।’’
জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন কিনা এমন প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘‘বিষয়টা আপনি একটু লিখে দেন। আমি ছয়টি রেলওয়ে জেলার এসপিকে এটা পাঠাব। পাঠানোর পরে আপনার সাথে বিষয়টা নিয়ে একটা আলোচনা করব।’’