মাঠে নামলেই যেন প্রতিপক্ষের রক্ষণ তছনছ করে দেন আর্লিং হলান্ড। প্রিমিয়ার লিগ কিংবা চ্যাম্পিয়নস লিগ—যেখানেই খেলুন না কেন, ধারাবাহিকতায় খুব একটা ঘাটতি দেখা যায় না তাঁর। চলতি বিশ্বকাপেও এর ব্যতিক্রম নয়—তিন ম্যাচেই বল জালে জড়িয়েছেন পাঁচবার। উচ্চতা, শারীরিক শক্তি ও গতির এমন বিরল সমন্বয়ের কারণেই ফুটবলবিশ্বে তাঁকে ডাকা হয় ‘মেশিন’ নামে। কিন্তু এই যন্ত্রমানবের পেছনের জ্বালানিটা আসলে কী?
হলান্ডকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তোলে শুধু তাঁর গড়ন নয়, বরং জীবনযাপনের প্রতিটি খুঁটিনাটি। কোনো চমকপ্রদ শর্টকাট নেই এখানে—আছে শুধু নিয়মিত কিছু অভ্যাসের কঠোর অনুশীলন, যা দিনের পর দিন ধরে রেখেছেন তিনি।
খাদ্যাভ্যাসে সেই আদিম ছোঁয়া
আজকালকার ফুটবলাররা যখন ক্যালরি গুনে গুনে দামি সাপ্লিমেন্টের ওপর নির্ভর করেন, হলান্ড তখন ফিরে গেছেন প্রকৃতির কাছাকাছি এক খাদ্যাভ্যাসে। তাঁর প্রতিদিনের পাতে থাকে গরুর হৃৎপিণ্ড ও কলিজা, যা পুষ্টিবিজ্ঞানীদের চোখে প্রকৃত অর্থেই এক ‘সুপারফুড’—পেশি গঠনে জরুরি ভিটামিন বি, আয়রন ও নানা খনিজে ভরপুর। এর বাইরে ঘাস খাইয়ে বড় করা গরুর মাংস, সাওয়ারডো রুটির সঙ্গে ডিম আর খাঁটি মধুও তাঁর নিয়মিত খাদ্যতালিকার অংশ। প্রক্রিয়াজাত খাবারের কোনো ঠাঁই নেই সেখানে।
ঘুমকে বিজ্ঞানে রূপ দেওয়া
হলান্ডের কাছে ঘুম নিছক বিশ্রাম নয়, বরং একরকম নিয়মতান্ত্রিক অনুশীলন। রাত সাড়ে দশটার মধ্যে বিছানায় যাওয়া তাঁর জন্য প্রায় অলঙ্ঘনীয় নিয়ম। এর তিন ঘণ্টা আগে থেকেই তিনি চোখে পরে নেন নীল আলো প্রতিরোধী বিশেষ চশমা, যাতে ফোন বা টিভির আলো ঘুমের হরমোন মেলাটোনিনের নিঃসরণে ব্যাঘাত না ঘটায়।
আরও চমকপ্রদ বিষয়, ঘুমানোর সময় মুখে সার্জিক্যাল টেপ লাগিয়ে নেন তিনি, যাতে মুখ দিয়ে নয় বরং শুধু নাক দিয়েই শ্বাস নেওয়া নিশ্চিত হয়। এতে শরীরে নাইট্রিক অক্সাইডের মাত্রা বেড়ে গভীর ঘুম নিশ্চিত হয় বলে জানা যায়। সারারাত হৃদস্পন্দন ও শরীরের তাপমাত্রার হিসাব রাখতে আঙুলে পরে থাকেন একটি বিশেষ স্মার্ট রিং।
ভোরের আলোয় দিনের শুরু
ম্যানচেস্টারের আকাশ প্রায়ই মেঘে ঢাকা থাকলেও প্রতিদিন ঘুম ভাঙার পর অন্তত দশ মিনিট বাইরে হাঁটতে বের হন হলান্ড, চোখে মাখেন সকালের প্রথম আলো। এতে শরীরের জৈবিক ঘড়ি সচল থাকে বলে তাঁর বিশ্বাস। রোদ না থাকলে বিকল্প হিসেবে দাঁড়ান লাল আলোর বিশেষ প্যানেলের সামনে, যা কোষে শক্তি সঞ্চারে সহায়ক বলে মনে করা হয়।
বরফ-শীতল পানি ও সনার রুটিন
মাঠের ৯০ মিনিটের ধকল সামলাতে সপ্তাহে চার থেকে পাঁচ দিন বরফশীতল পানির টবে নামেন হলান্ড, পাশাপাশি নিয়মিত যান সনায়—৭০ থেকে ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার বিশেষ কাঠের ঘরে, যেখানে ঘাম ঝরিয়ে এরপর ঠান্ডা পানিতে গোসল সারেন। এই পদ্ধতি পেশির ক্লান্তি কাটাতে ও রক্তসঞ্চালন স্বাভাবিক রাখতে সহায়তা করে। প্রতিদিন আরও ২০ মিনিট ব্যয় করেন নিতম্ব, কুঁচকি ও হ্যামস্ট্রিংয়ের স্ট্রেচিংয়ে, আর হালকা অনুশীলনের সময়ও নাক দিয়ে শ্বাস নেওয়ার অভ্যাস বজায় রাখেন কঠোরভাবে।
নিয়মেই লুকিয়ে শক্তির রহস্য
আধুনিক প্রযুক্তি আর প্রক্রিয়াজাত খাদ্যে ভরা এই যুগে যেন এক ভিন্ন সময়ের মানুষ হলান্ড—যিনি বেছে নিয়েছেন সেই আদি ও প্রাকৃতিক জীবনধারা। তাঁর প্রতিটি অভ্যাসের সঙ্গে সবাই একমত নাও হতে পারেন, তবে একটি সত্য অস্বীকারের উপায় নেই—নিজের শরীরের প্রতি এই নিরলস যত্ন ও শৃঙ্খলাই তাঁকে পরিণত করেছে আজকের বিশ্বসেরা স্ট্রাইকারে।
সূত্র: রয়টার্স