ঘরের ভেতর কোমরসমান পানি, ভিজে নষ্ট হয়ে গেছে বিছানাপত্র ও আসবাব, চুলা ডুবে যাওয়ায় বন্ধ রান্নাও—এমন অবস্থায় দুই বছরের মেয়ে আর ১৩ বছরের ছেলেকে নিয়ে দিশাহারায়ে পড়েছিলেন মা তসলিমা আক্তার। শেষমেশ ঘর ছেড়ে উঁচু জায়গার খোঁজে বেরিয়ে আশপাশে একটি কালভার্ট ছাড়া আর কোনো আশ্রয় খুঁজে পাননি তিনি। সেখানে ইতিমধ্যে অনেকে গরু-ছাগল ও ঘরের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রসহ ঠাঁই নিয়েছিলেন। বন্যার পানি থেকে বাঁচাতে তসলিমার স্বামী শাহাবুদ্দিনও নিজের অটোরিকশাটি সেখানে রেখেছিলেন—শেষে সেই অটোরিকশাতেই সন্তানদের নিয়ে আশ্রয় নেন তসলিমা।
গত বুধবার রাত কেটেছে দুই সন্তান নিয়ে সেই সিএনজিচালিত অটোরিকশাতেই। চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার পুঁইছড়ি ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডে এই দৃশ্য দেখা গেছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায়ও একই অটোরিকশায় দেখা মেলে তসলিমার। সেখানেই সেরেছেন খাওয়াদাওয়া, অটোরিকশার একটি আসনে কাঁথা মুড়িয়ে ঘুম পাড়িয়েছেন দুই বছর বয়সী মেয়ে জান্নাতুল মাওয়াকে, আর পাশে দাঁড়িয়ে পাহারা দিচ্ছিল বড় ছেলে বোরহান উদ্দিন। ওই একই কালভার্টে ত্রিপল টাঙিয়ে গরু-ছাগল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র রাখতে দেখা গেছে স্থানীয় আরও অনেককে।
আশ্রয় নেওয়া পরিবারগুলোর মধ্যে দু-একটি রান্না করা খাবার জোগাড় করতে পারলেও বেশির ভাগেরই ভরসা ছিল কলা, মুড়ি ও চিড়ার মতো শুকনো খাবার। এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে, তা কেউ কল্পনাও করেননি বলে আক্ষেপ করেন অনেকে—আগে থেকে জানা থাকলে হয়তো প্রস্তুতি নেওয়া যেত।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত সোমবার থেকে বাঁশখালী উপজেলার পুঁইছড়ি, ছনুয়া, শেখেরখীল, গন্ডামারা ও শীলকূপসহ একাধিক এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। বসতবাড়ি, রাস্তাঘাট ও পুকুর-জলাশয়ে পানি প্রবেশ করায় জনজীবনে নেমে এসেছে চরম দুর্ভোগ। এসব এলাকার মানুষের চুলায় রান্না বন্ধ থাকায় গত দুই দিন ধরে শুকনো খাবারের ওপর নির্ভর করেই দিন কাটছে তাঁদের।
স্থানীয়দের ভাষ্যে, বুধবার সামান্য সময়ের জন্য বিরতি দিলেও থেমে থেমে বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় পুরো দিন কষ্টেই কেটেছে সবার। এসব এলাকায় সরকারি ত্রাণ পর্যাপ্ত না হওয়ায় সবাই তা পাননি, ফলে খাবার নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়তে হয়েছে বহু পরিবারকে।
জানতে চাইলে তসলিমার স্বামী শাহাবুদ্দিন বলেন, বুধবার রাতে হঠাৎ করেই ঘরের ভিটায় পানি উঠে যায় এবং ক্রমান্বয়ে তা কোমরসমান হয়ে ওঠে। এমন অন্ধকার পরিস্থিতিতে পথ খুঁজে না পেয়ে শেষ পর্যন্ত কালভার্টে গিয়ে নিজেদের অটোরিকশায় আশ্রয় নিতে বাধ্য হন তাঁরা। তাঁর ভাষায়, এই পরিস্থিতি আর কতদিন চলবে তা তাঁর জানা নেই।
একই এলাকার বাসিন্দা নজির আহমদ বলেন, জীবনে এমন কষ্টের সময় আগে কখনো আসেনি। পাহাড়ি ঢলের কারণে সৃষ্ট এই দুর্ভোগে খাবার ও পানির অভাবে পড়ে গেছেন তাঁরা, আর এই কষ্টের শেষ কবে হবে তাও অজানা।