মিয়ানমারের রাখাইন উপকূলের ছোট্ট বন্দর কিয়াউকফিউকে ঘিরে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নতুন করে জোরালো হয়ে উঠেছে ভূরাজনৈতিক তৎপরতা। চীনের কাছে এই বন্দর কেবল একটি সমুদ্রবন্দর নয়, বরং ভারত মহাসাগরে প্রবেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ। এই সংযোগ বাস্তবায়নের মূল কাঠামো হলো চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডর, সংক্ষেপে সিএমইসি, যা বেইজিংয়ের বহুল আলোচিত বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর অংশ হিসেবে বিবেচিত।
চীনের ইউনান প্রদেশের কুনমিং থেকে শুরু হয়ে এই করিডর মিয়ানমারের সীমান্ত শহর মুসে ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র মান্দালয় হয়ে দুটি শাখায় বিভক্ত হয়েছে। একটি শাখা গেছে ইয়াঙ্গুনে, অন্যটি রাখাইন রাজ্যের কিয়াউকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দরে গিয়ে মিশেছে। রেলপথ, মহাসড়ক, তেল-গ্যাস পাইপলাইন এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল—এই কয়েকটি উপাদান নিয়েই গড়ে উঠছে করিডরটি। কিয়াউকফিউ থেকে ইউনান পর্যন্ত সমান্তরাল দুটি পাইপলাইন ইতিমধ্যে চালু রয়েছে বলে জানা গেছে।
এই করিডরের কৌশলগত গুরুত্ব মূলত চীনের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা উদ্বেগ থেকে উদ্ভূত, যা কূটনৈতিক পরিভাষায় ‘মালাক্কা সংকট’ নামে পরিচিত। বর্তমানে চীনের বেশির ভাগ জ্বালানি আমদানি ও বাণিজ্য সংকীর্ণ মালাক্কা প্রণালি দিয়ে সম্পন্ন হওয়ায় কোনো আন্তর্জাতিক উত্তেজনা তৈরি হলে এই পথ অবরুদ্ধ হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়। সিএমইসি বাস্তবায়িত হলে মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা থেকে আসা তেলবাহী জাহাজ সরাসরি কিয়াউকফিউতে ভিড়তে পারবে, ফলে সময়, খরচ ও ঝুঁকি—তিনটিই কমে আসবে চীনের জন্য।
অর্থনৈতিক সংকটে থাকা মিয়ানমারের জান্তা সরকারের জন্যও এই প্রকল্প এক বড় সহায়তার উৎস হয়ে উঠেছে। বিপুল বিদেশি বিনিয়োগের সম্ভাবনা দেশটির বিদ্যুৎ ও পরিবহন খাতে পরিবর্তন আনতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে রাখাইনসহ করিডরসংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোয় জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী ও জান্তা বাহিনীর মধ্যে চলমান সংঘর্ষ প্রকল্পের অগ্রগতিতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর পাশাপাশি ঋণের ফাঁদ ও পরিবেশগত ক্ষতি নিয়েও মিয়ানমারের নাগরিক সমাজে উদ্বেগ রয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে এই আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে। গত জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বেইজিং সফরে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশ পর্যন্ত করিডর সম্প্রসারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়, যাকে বলা হচ্ছে চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডর বা সিএমবিইসি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভাষ্যমতে, বাংলাদেশ এখনো এ বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি, তবে প্রস্তাবটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এই উদ্যোগের লক্ষ্য চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরকে চীন-মিয়ানমার নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করে একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক বাণিজ্য হাব গড়ে তোলা।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ এই করিডরে যুক্ত হলে ইউনান ও মিয়ানমারের বাজারে সরাসরি সড়ক-রেল সংযোগের সুবিধা মিলতে পারে, যা রপ্তানি ও ট্রানজিট খাতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে মিয়ানমারের চলমান অভ্যন্তরীণ সংঘাত এবং রোহিঙ্গা সংকটের মতো অমীমাংসিত ইস্যু এই প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলছে।
ভারত মহাসাগর অঞ্চলে চীনের এই ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি ভারতের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যাকে নয়াদিল্লি ‘স্ট্রিং অব পার্লস’ কৌশলের অংশ হিসেবে দেখছে। জবাবে ভারত নিজস্ব কালাদান মাল্টি-মোডাল ট্রানজিট প্রকল্পের মাধ্যমে বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও তার ইন্দো-প্যাসিফিক মিত্ররাও এই অঞ্চলে চীনের প্রভাব বিস্তার নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং নিজেদের কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়েছে।
তবে বর্তমানে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার কারণে করিডরের মূল অবকাঠামো নির্মাণকাজ থমকে আছে। কুনমিং থেকে কিয়াউকফিউ পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ৭০০ কিলোমিটার দীর্ঘ রেল ও বাণিজ্যপথের একাংশ এখন জান্তা সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে এবং আরাকান আর্মিসহ বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠীর দখলে রয়েছে। চীন বিভিন্ন সময় যুদ্ধবিরতির মধ্যস্থতা করলেও মাঠপর্যায়ের অস্থিতিশীলতার কারণে বড় পরিসরে নিরাপদ বাণিজ্য পরিচালনা এখনো কঠিন হয়ে আছে।
সার্বিকভাবে চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডর দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অর্থনৈতিক মানচিত্রে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বাংলাদেশের জন্য এটি নতুন বাণিজ্য সম্ভাবনার দুয়ার খুলতে পারে, তবে এর সঙ্গে জড়িত জটিল কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা বিবেচনাগুলোও একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। আগামী দিনে এই প্রস্তাবিত ত্রিপক্ষীয় করিডর অঞ্চলের রাজনীতি ও অর্থনীতিতে কী প্রভাব ফেলে, তা এখন সময়ই বলে দেবে।
সূত্র: দ্য ডিপ্লোম্যাট ও বিবিসি অবলম্বনে