ছবি : সংগৃহীত

ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা মহারণে আজও জড়িয়ে ফকল্যান্ড যুদ্ধের ছায়া

Share

বিশ্বকাপের মঞ্চে ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনার লড়াই কখনোই শুধু ফুটবলের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এই দুই দলের মুখোমুখি হওয়া মানেই ইতিহাস, রাজনীতি, জাতীয় আবেগ এবং চার দশকেরও বেশি পুরোনো ফকল্যান্ড যুদ্ধের স্মৃতির এক জটিল মিশ্রণ। এবারের বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে আবারও যখন মুখোমুখি হচ্ছে দুই দল, তখন নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে সেই পুরোনো যুদ্ধের আবহ।

কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডকে হারিয়ে সেমিফাইনাল নিশ্চিত করেছে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা, অন্যদিকে নরওয়ের বিপক্ষে জয়ে শেষ চারে জায়গা করে নিয়েছে ইংল্যান্ড। ফলে আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই লড়াই শুধু ফাইনালে ওঠার ম্যাচ নয়, বরং বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম ঐতিহাসিক এক প্রতিদ্বন্দ্বিতার নতুন অধ্যায়।

ফকল্যান্ড যুদ্ধ থেকে বৈরিতার শুরু

দুই দেশের এই বৈরিতার সবচেয়ে বড় ভিত্তি ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড যুদ্ধ। দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরের ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রিত ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ, আর্জেন্টিনায় যা পরিচিত ‘লাস মালভিনাস’ নামে, তার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ৭৪ দিনের রক্তক্ষয়ী এক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল দুই দেশ, যাতে প্রাণ হারান ৯০০ জনেরও বেশি মানুষ। যুদ্ধে ব্রিটেন জয়ী হলেও সেই পরাজয়ের ক্ষত আজও অমলিন আর্জেন্টিনার জাতীয় স্মৃতিতে।

তবে দুই দেশের ফুটবলীয় বৈরিতার সূচনা আরও আগে। ১৯৬৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের কাছে ১-০ গোলে হারা ম্যাচটি আর্জেন্টিনায় আজও পরিচিত ‘শতাব্দীর চুরি’ নামে, যেখানে অধিনায়ক আন্তোনিও রাত্তিনের বিতর্কিত লাল কার্ড ও মাঠ ছাড়তে অস্বীকৃতি জানানোর ঘটনা বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত অধ্যায় হয়ে আছে। অনেকের মতে, সেই ঘটনার পরই আন্তর্জাতিক ফুটবলে হলুদ-লাল কার্ড প্রবর্তনের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যা কার্যকর হয় ১৯৭০ বিশ্বকাপে।

‘হ্যান্ড অব গড’ থেকে কিংবদন্তি

এই প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে কিংবদন্তির পর্যায়ে নিয়ে যায় ১৯৮৬ মেক্সিকো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল, ফকল্যান্ড যুদ্ধের মাত্র চার বছর পর অনুষ্ঠিত সেই ম্যাচে। ডিয়েগো ম্যারাডোনা প্রথমে বিতর্কিত ‘হ্যান্ড অব গড’ গোল করার পর মাত্র চার মিনিটের মাথায় মাঝমাঠ থেকে একক নৈপুণ্যে পাঁচ ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে করেন ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোল, যা পরিচিতি পায় ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’ নামে। সেই ম্যাচ ২-১ গোলে জিতে নেয় আর্জেন্টিনা।

ম্যাচ শেষে ম্যারাডোনা মন্তব্য করেছিলেন, গোলটি হয়েছিল কিছুটা তাঁর নিজের মাথা দিয়ে, আর কিছুটা ঈশ্বরের হাত দিয়ে। পরবর্তীতে তিনি স্বীকার করেন, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেই জয় ছিল ফকল্যান্ড যুদ্ধে নিহত আর্জেন্টাইনদের জন্য এক প্রতীকী প্রতিশোধ। নিজের আত্মজীবনীতেও তিনি লিখেছিলেন, ম্যাচটি নিছক ফুটবল ম্যাচ ছিল না, বরং তা ছিল দুই দেশের আবেগের এক লড়াই। অন্যদিকে সেই ম্যাচের ইংলিশ গোলরক্ষক পিটার শিলটন বহু বছর পরও সেই বিতর্ক ভুলতে পারেননি বলে সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে জানান তিনি, পুরো স্টেডিয়ামে কেবল রেফারি ও লাইনসম্যানই বলটি হাতে লাগার বিষয়টি খেয়াল করেননি।

আজও জীবন্ত সেই স্মৃতি

ফকল্যান্ড যুদ্ধের প্রভাব আজও স্পষ্ট আর্জেন্টিনার ফুটবল সংস্কৃতিতে। সমর্থকদের জনপ্রিয় গান ‘মুচাচোস’-এ মালভিনাস যুদ্ধের বীরদের স্মরণ করা হয়। চলতি বিশ্বকাপেও ইংল্যান্ডকে লক্ষ্য করে স্লোগান ও গান গাইতে দেখা গেছে আর্জেন্টাইন সমর্থক ও খেলোয়াড়দের, এমনকি শেষ ষোলোতে জয়ের পর ড্রেসিংরুমেও ইংল্যান্ডবিরোধী গান গাওয়ার ঘটনা নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অতিরিক্ত সময়ে সুইজারল্যান্ডকে হারিয়ে গ্যালারির সমর্থকদের সঙ্গে উল্লাসের সময় আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়দের মুখে মুখরিত হচ্ছিল সেই ঐতিহাসিক স্লোগান—যার অর্থ দাঁড়ায়, যে লাফাবে না, সে-ই ইংরেজ।

দীর্ঘ ২৪ বছর পর বিশ্বকাপের মঞ্চে ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনার মাঠের লড়াই শুরুর আগেই তাই যেন শুরু হয়ে গেছে এক মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। চার দশকের ইতিহাস, যুদ্ধের স্মৃতি, ম্যারাডোনার উত্তরাধিকার এবং দুই দেশের চিরন্তন প্রতিদ্বন্দ্বিতা মিলিয়ে আটলান্টার এই সেমিফাইনাল হতে যাচ্ছে চলতি বিশ্বকাপের সবচেয়ে আবেগঘন ও বহুল প্রতীক্ষিত ম্যাচগুলোর একটি।