বগুড়ায় যমুনা নদীর ভাঙন ঠেকাতে গত ১৯ বছরে ব্যয় করা হয়েছে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা, কিন্তু সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ও সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে এই বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও ভাঙন রোধ করা সম্ভব হয়নি। এই পরিস্থিতিতে নতুন করে আরও একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো), যার প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে দুই হাজার ২০০ কোটি টাকা।
স্থানীয় বাসিন্দারা এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছেন, বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও যমুনার ভাঙন থামছে না এবং বিগত সরকারের সময় ভাঙনরোধের নামে বরাদ্দকৃত অর্থের একটি বড় অংশ আত্মসাৎ করা হয়েছে। সঠিকভাবে কাজ না হওয়ায় নদীভাঙনে বসতভিটা, ফসলি জমি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিলীন হয়ে গেছে, নিঃস্ব হয়েছে হাজারো পরিবার, আর এখনো ঝুঁকিতে রয়েছে অনেকে।
জানা গেছে, বগুড়া অংশে যমুনা নদী প্রায় ৪৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে প্রবাহিত হলেও এর মধ্যে ডান তীর সুরক্ষার কাজ হয়েছে মাত্র ১৯ কিলোমিটারে; বাকি ২৬ কিলোমিটার এখনো অরক্ষিত থাকায় সেখানে ভাঙন চলছেই। এই সময়ের মধ্যে ছয়টি স্পার, একটি গ্রোয়েন বাঁধ, দুটি হার্ডপয়েন্ট, ছয়টি ক্রসবার ও একটি ফিসপাস নির্মাণ করেছে পাউবো। ২০০২ সালে সারিয়াকান্দির হাটশেরপুর ইউনিয়নের হাসনাপাড়া ও নিজবলাইল বাজার এলাকায় স্পার নির্মাণের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এই কার্যক্রম ২০০৬, ২০০৮-১৮ এবং ২০১৬ সালে বিভিন্ন পর্যায়ে সম্প্রসারিত হয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে।
বগুড়া পাউবোর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী হুমায়ুন কবির জানান, বাকি ২৬ কিলোমিটার নদী এখনো অরক্ষিত থাকায় সেখানে ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। এই সমস্যা সমাধানে প্রায় সাড়ে ৯ কিলোমিটার তীর প্রতিরক্ষার লক্ষ্যে ‘বগুড়া জেলার যমুনা নদীর তীর সংরক্ষণ ও পুনর্বাসন’ শীর্ষক নতুন প্রকল্পের প্রস্তাব পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। তিনি জানান, সোনাতলার পাকুল্ল্যা, সারিয়াকান্দির কামালপুর এবং ধুনটের শহরাবাড়ি ও ভান্ডারবাড়ি এলাকা সবচেয়ে বেশি ভাঙনকবলিত, যেখানে উজানের ঢল ও অতিবৃষ্টিতে বসতবাড়ি ও ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে।
তবে স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল আজিজ প্রামাণিক ও সিরাজুল ইসলাম মইনুল হোসেনের অভিযোগ, অতীতে বাস্তবায়িত ভাঙনরোধ প্রকল্পগুলোর বেশির ভাগ অর্থই দুর্নীতির মাধ্যমে লোপাট হয়েছে। তাঁদের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বন্যা শুরু হলেই জরুরি কাজের নামে বিপুল অর্থ বরাদ্দ এনে অনিয়ম করেছেন পাউবোর কর্মকর্তারা, আর স্বল্প পুঁজি নিয়ে কাজ শুরু করা কিছু ঠিকাদার এখন কোটিপতি বনে গেছেন।
পাউবো সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের জুলাই থেকে ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত বাস্তবায়নের লক্ষ্যে হাতে নেওয়া নতুন প্রকল্পের আওতায় থাকবে যমুনার ডান তীরে সাড়ে ৯ কিলোমিটার তীর প্রতিরক্ষা, দুই কিলোমিটার এলাকার মেরামত ও পুনর্বাসন, ধুনটের শহরাবাড়ি ও বানিয়াজান স্পার পুনর্বাসন, সাড়ে তিন কিলোমিটার ড্রেজিং এবং প্রায় ৪৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বাঁধ মেরামতের কাজ। গণশুনানি ও জেলা পানিসম্পদ উন্নয়ন কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে প্রকল্পের পুনঃগঠিত নথি গত ১৪ মে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
এ বিষয়ে বগুড়া পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মাহমুদ হাসান বলেন, নতুন প্রকল্প অনুমোদন ও বাঁধ পুনর্বাসনের মাধ্যমে সোনাতলা, সারিয়াকান্দি ও ধুনট উপজেলায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে। সাম্প্রতিক টানা বৃষ্টি ও উজানের ঢলে সারিয়াকান্দি ও ধুনটে নতুন করে ভাঙন দেখা দেওয়ায় সেখানে আপাতত জিও ব্যাগ ফেলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি। দুর্নীতির অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ ধরনের কোনো তথ্য তাঁর জানা নেই, তবে কেউ অনিয়মের চেষ্টা করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।