এস এম হুমায়ুন কবির, প্রশিক্ষক ও নির্মাতা

সরকারের শিক্ষা সংস্কারের উদ্যোগ এবং আমাদের মানসিকতা

Share

একটি সার্বভৌম ও আত্মমর্যাদাশীল দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, সামাজিক এবং বৈশ্বিক মর্যাদার মূল চালিকাশক্তি হলো তার শিক্ষা ব্যবস্থা। ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিবর্তিত বাংলাদেশে জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার যখন ভঙ্গুর শিক্ষা ব্যবস্থাকে নতুন করে ঢেলে সাজানোর কিছু যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে, ঠিক তখনই ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের প্রশ্নপত্রে ভুল এবং প্রতিকূল আবহাওয়ায় পরীক্ষায় অংশ নিতে গিয়ে বিপাকে পড়া ছাত্র-ছাত্রী ও অভিভাবকদের সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে সরকারকে। বিষয়টি নিয়ে জল বেশ খানিকটা ঘোলা হয়েছে। সেই ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের আদিম প্রবণতায় মত্ত হতেও দেখা গেছে সুযোগসন্ধানী শিকারীদের। উদ্ভুত পরিস্থিতিতে তারেক রহমানের নেতৃত্বে মাত্র পাঁচ মাস বয়সী নতুন সরকারের পালকে ইতিমধ্যে আরও একটি ব্যতিক্রমী সাফল্য যুক্ত হয়েছে।

২০২০ সালের করোনাকালীন সময়ের পর এই প্রথমবার পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসে এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এই বিষয়টি কি আমরা ভুলে গিয়েছিলাম? হয়তো সরকারও। আমার সঠিক জানা নেই, পরীক্ষার জন্য প্রশ্নপত্র ঠিক কত দিন আগে তৈরি করা হয়। এ সরকারের বয়স হয়েছে মাত্র পাঁচ মাস। এর মধ্যে এইচএসসি পরীক্ষা শুরু হয়েছে প্রায় তিন সপ্তাহ। তাহলে পরীক্ষা শুরু হওয়ার আগে সরকার সময় পেয়েছে ধরে নিলাম চার মাস। যদি পরীক্ষা শুরুর এক মাস আগেও প্রশ্নপত্র তৈরির প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়ে থাকে, তাহলে বিষয়টি এমন দাঁড়ায়—নির্বাচিত একটি সরকারের মাত্র দুই মাসের মধ্যেই এই কাজের জন্য প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে হয়েছে।

মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী এবং তাঁর আমলারা কি খতিয়ে দেখেছিলেন আগের পাঁচ-ছয় বছর পরীক্ষা কীভাবে গ্রহণ করা হয়েছিল? এই প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২৪ জানুয়ারি ২০২২ সালে ইউনিসেফ একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছিল, যার শিরোনাম “কোভিড-১৯-এ পড়াশুনার ক্ষতি প্রায় অপূরণীয়”। এখানে তারা উল্লেখ করেছে, “মহামারির কারণে দীর্ঘদিন স্কুল বন্ধ থাকায় বাংলাদেশে ৩ কোটি ৭০ লাখ শিশুর পড়াশুনা ব্যাহত হয়েছে।” আমরা কি সেই অবস্থা থেকে রাতারাতি মুক্তি পেয়েছি? পাইনি। কোভিডের পর থেকে অটোপাস এবং সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এবছরই প্রথম সেই ধারাবাহিকতার বাইরে পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসে পরীক্ষা হচ্ছে। সেই বিষয়টিকে অবশ্যই গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সেটা করা হয়নি। সমস্যার শুরু এখানেই।

শিক্ষকদের মানোন্নয়ন এবং শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তন না করে কেবল প্রশ্নপত্র যুগোপযোগী করলেই হবে? ফিজিক্স প্রথম পত্রের প্রশ্ন যে মানের হয়েছে, আমার ধারণা অনেক শিক্ষকও শতভাগ উত্তর করতে পারবেন না। আমি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলছি। কারণ, ছাত্র-ছাত্রী ও শিক্ষকরা শুধু শহরকেন্দ্রিক না, দেশের হাজার হাজার গ্রামেও আছেন। তাদের বিষয়টি অবশ্যই বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন ছিল।

প্রশ্ন সহজ করার কথা আমি বলছি না; আমি বোঝাতে চাইছি শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের উপর ভিত্তি করে প্রশ্নপত্র প্রণয়নের বিষয়ে মনোযোগী হওয়া উচিৎ ছিলো। আমি ক্লাসে পড়াতেই পারলাম না, অথচ প্রশ্ন করলাম—সেটা কতটা যৌক্তিক? এগুলো আমাদের মূল সমস্যা।

বিগত স্বৈরাচারী শাসনামলে সুপরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করে দেওয়া শিক্ষা খাতকে টেনে তুলে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে বর্তমান সরকার আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ শুরু করেছে—এটা আমাদের আশান্বিত করে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সুদূরপ্রসারী ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’ ভিশন এবং শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের মাঠপর্যায়ের দৃঢ় ও অভিভাবকসুলভ প্রশাসনিক নেতৃত্ব দেশের শিক্ষাঙ্গনে বহুদিনের হারানো শৃঙ্খলা ও মেধার প্রকৃত মর্যাদা ফিরিয়ে আনবে—এই আশায় আমরা বুক বাঁধতেই পারি।

তবে সাম্প্রতিক উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষা ঘিরে তৈরি হওয়া প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত বিতর্ক মোকাবিলায় সরকারের দূরদর্শী অবস্থান দেশের সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার মানোন্নয়নে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে। এটা যতটা সত্যি, ততটাই সত্যি যে—সরকার চাইলেই বিতর্কের ঊর্ধ্বে থেকে বিষয়টির সমাধান করতে পারত।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্পষ্ট বিশ্বাস করেন যে, চতুর্থ শিল্পবিপ্লব এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই যুগে টিকে থাকতে হলে গতানুগতিক মুখস্থ বিদ্যার শিক্ষা দিয়ে আর চলবে না। নতুন প্রজন্মকে বৈশ্বিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হলে দরকার এমন এক শিক্ষা ব্যবস্থা, যা হবে একই সঙ্গে আধুনিক, নৈতিকতা-ভিত্তিক এবং সম্পূর্ণ কর্মমুখী। তাঁর এই রূপকল্প কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা বাস্তবায়নে দেশের ইতিহাসে অন্যতম বৃহত্তম শিক্ষাবান্ধব বাজেট (২০২৬-২৭ অর্থবছর) পেশ করা হয়েছে, যেখানে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার করা হয়েছে।

শিক্ষা খাতে প্রধানমন্ত্রীর যুগান্তকারী ও দেশজুড়ে প্রশংসিত উদ্যোগসমূহের মধ্যে অন্যতম হলো স্নাতক (অনার্স) পর্যায় পর্যন্ত নারী শিক্ষা সম্পূর্ণ অবৈতনিক করা, যা প্রান্তিক অঞ্চলের নারী শিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। এর পাশাপাশি প্রাথমিক পর্যায় থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত শিক্ষাক্রমকে রোবোটিকস, ডেটা সায়েন্স, সাইবার সিকিউরিটি এবং কারিগরি দক্ষতার উপযোগী করে ঢেলে সাজানো হচ্ছে। কেবল প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি নয়, শিশুদের ছোটবেলা থেকেই সহনশীলতা, দেশপ্রেম, পরিবেশ সচেতনতা এবং নৈতিকতার শিক্ষা দিয়ে একটি “মানবিক বাংলাদেশ” গড়ার কাজ শুরু হয়েছে। সবচেয়ে বড় সংস্কারটি আসতে যাচ্ছে শিক্ষক নিয়োগে; দলীয়করণের পুরনো সংস্কৃতি ভেঙে সম্পূর্ণ মেধাভিত্তিক এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় শিক্ষক নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যাতে শ্রেণিকক্ষে যোগ্য শিক্ষকরা পাঠদান করতে পারেন।

চলতি বছরের এইচএসসি পরীক্ষা শুরু হওয়ার পর থেকেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে, বিশেষ করে সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগের কিছু অংশে আকস্মিক বন্যা ও ভারী বর্ষণের কারণে অনেক পরীক্ষার্থী পরীক্ষাকেন্দ্রে উপস্থিত হতে অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে আবার পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্রের প্রশ্নপত্রে অনাকাঙ্ক্ষিত ত্রুটি পরীক্ষার্থীদের মানসিকভাবে আরও বিপর্যস্ত করে তোলে।

বিগত সরকারের আমলে এমন সংকটে ‘অটো-প্রমোশন’ কিংবা ‘সাবজেক্ট ম্যাপিং’-এর মতো সস্তা ও আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিয়ে শিক্ষার্থীদের মেধা ধ্বংস করা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান সরকার সেই ভুল পথ সম্পূর্ণ পরিহার করেছে। শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন প্রধানমন্ত্রীর সুনির্দিষ্ট নির্দেশনায় স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন—পরীক্ষা হবেই, তবে তা হবে সম্পূর্ণ শিক্ষার্থী-বান্ধব পরিবেশে। দূর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া বা বন্যার কারণে যারা অংশ নিতে পারেনি, তাদের পরীক্ষাগুলো চট্টগ্রাম বোর্ডের স্থগিত পরীক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিশেষ বিকল্প ব্যবস্থায় নেওয়া হবে। আর প্রশ্নপত্রের ভুলের জন্য দায়ী কর্মকর্তাদের তাৎক্ষণিক বরখাস্ত করে ক্ষতিগ্রস্ত পরীক্ষার্থীদের ওই প্রশ্নে পূর্ণ নম্বর দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এটি জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

শত দুর্যোগের মধ্যেও ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে অভিন্ন ও একমুখী প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়ার যে সাহসী সংস্কার শুরু হয়েছে, যা শিক্ষাক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক বৈষম্য দূর করতে ঐতিহাসিক ভূমিকা রাখছে।

পরীক্ষার এই স্বাভাবিক ও নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাঝেই কিছু শিক্ষার্থী ও স্বার্থান্বেষী মহল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে আন্দোলনের চেষ্টা করেছে। শিক্ষাবিদ, বুদ্ধিজীবী এবং সচেতন সমাজ মনে করেন, এই দাবিগুলো সম্পূর্ণ অযৌক্তিক এবং দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য দীর্ঘমেয়াদে মারাত্মক ক্ষতিকর।
প্রথমত, পরীক্ষা ছাড়া ঢালাওভাবে সবাইকে পাস করিয়ে দিলে (অটো-পাস) রাতদিন কঠোর পরিশ্রম করা প্রকৃত মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের প্রতি চরম অবিচার করা হয়। দ্বিতীয়ত, বিগত দিনের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, পরীক্ষা ছাড়া সার্টিফিকেট পাওয়া শিক্ষার্থীদের পরবর্তীতে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে এবং উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে ‘অটোপাস প্রজন্ম’ বলে অবমূল্যায়ন করা হয়েছে, যা তাদের ক্যারিয়ারকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তৃতীয়ত, এইচএসসির মতো গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক পরীক্ষার সঠিক মূল্যায়ন না হলে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের সার্টিফিকেট গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানাতে পারে, যা দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করবে।

সরকার এই অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, “কোনো অবস্থাতেই শিক্ষার গুণগত মানের সাথে আপস করে আমাদের নতুন প্রজন্মকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেওয়া যাবে না।” শিক্ষার্থীদের আবেগকে সম্মান জানিয়ে তাদের যৌক্তিক কষ্টগুলো (বন্যা ও ভুল প্রশ্ন) সরকার সমাধান করেছে, কিন্তু অযৌক্তিক দাবির মুখে মাথা নত করেনি।

অভিভাবক হিসেবে আমাদের উদ্বিগ্নতার শেষ নেই। সারাবছর কোচিং-এ দৌড়ঝাপ, কোথায় সেরা শিক্ষক আছে তার কাছে দৌড়ানো কতো-কিযে করতে হলো ইয়ত্তা নেই! আর নাকে তেল দিয়ে ঘুমিয়ে কিছু বাচ্চা আর তাদের অভিভাবক প্রশ্নপত্র কঠিনের অযুহাতে পরীক্ষা বয়কট করতে চাইলো সত্যিই-হাস্যকর।

এইচএসসি পরীক্ষার সফল সমাপ্তির পর বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ বিশ্বমানে উন্নীত করতে এবং প্রকৃত মেধাবীদের বৈষম্যহীন সুযোগ দিতে হলে এই স্তরেও একটি বড় ধরণের সংস্কার প্রয়োজন। বর্তমানে দেশের অনেক শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায় বসার ন্যূনতম যোগ্যতা হিসেবে জিপিএ-৫ বা নির্দিষ্ট জিপিএ বাধ্যতামূলক করে দেয়, যা অনেক সময় প্রকৃত মেধাবীদের মেধা প্রকাশের সুযোগ কেড়ে নেয়। এবার যেমন জিপিএ ৫ অনেক কম হবে। কারণ, প্রশ্নপত্র যৌক্তিক ছিলো না। কঠিন/সহজ বিষয় নয়, বিষয় হলো পাঠদানের।

যাই হোক এবারের এইচএসসি পরীক্ষা পরবর্তি ভর্তিযুদ্ধের জন্য আমার কিছু সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা আছে।

১. ‘ন্যূনতম যোগ্যতা’ নির্ধারণের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জিপিএ-৫ কে বাধ্যতামূলক না করে একটি যুক্তিসঙ্গত ন্যূনতম জিপিএ নির্ধারণ করতে পারে। জিপিএ-৫ একটি বিশেষ যোগ্যতা হতে পারে, কিন্তু জিপিএ-৪.৮ পাওয়া কোনো শিক্ষার্থীর ভর্তি পরীক্ষায় বসার সুযোগ কেড়ে নেওয়া মেধার সুবিচার নয়।

২. এইচএসসি পরীক্ষার জিপিএ-এর ওপর ভিত্তি করে কোনো অতিরিক্ত নম্বর যোগ না করাই শ্রেয়। ভর্তি পরীক্ষার নিজস্ব ১০০ বা ২০০ নম্বরের ওপর ভিত্তি করেই চূড়ান্ত মেধা তালিকা তৈরি করা, যাতে সবাই সমান মাঠে লড়াই করতে পারে।

৩. জিপিএ-৫ দেখার চেয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগের জন্য প্রয়োজনীয় বিষয়ের গ্রেড দেখা বেশি যৌক্তিক। উদাহরণস্বরূপ, বিজ্ঞান অনুষদে ভর্তির জন্য টোটাল জিপিএ-৫ বাধ্যতামূলক না করে গণিত, পদার্থ ও রসায়নে নির্দিষ্ট গ্রেড থাকার শর্ত দেওয়া যেতে পারে।

৪. আমাদের দেশে এবারই প্রথম বোর্ডের খাতা মূল্যায়ন পদ্ধতি একই রকম হবে, আগে যেটা বিভাগকেন্দ্রীক ছিলো। সাম্প্রতিক বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে এইচএসসিতে জিপিএ-৫ মিস করতে পারে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা সাধারণত ৪ থেকে ৫ মাস পর অনুষ্ঠিত হয়, যা একজন শিক্ষার্থীর ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য পর্যাপ্ত সময়। জিপিএ-৫ নির্দিষ্ট করে দিলে এই দুর্যোগগ্রস্ত সংগ্রামী মেধাবীরা শুরুতেই রেস থেকে ছিটকে পড়বে। সেটা কাম্য নয়।

৫. বিশ্বের অধিকাংশ উন্নত দেশে উচ্চশিক্ষার জন্য একাধিকবার পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ থাকে। আমাদের দেশেও সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্বিতীয়বার ভর্তি পরীক্ষার সুযোগ রাখা এবং সেখানেও পূর্বের জিপিএ-এর কঠোর দেয়াল তুলে দিয়ে শিক্ষার্থীদের ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমেই প্রকৃত মেধার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা উচিত।

সংকট আসবেই, কিন্তু সেই সংকটকে পুঁজি করে মেধা ধ্বংসের যে খেলা অতীতে চলত, তার অবসান ঘটুক। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দূরদর্শী দিকনির্দেশনা এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আপসহীন দৃঢ়তা আমাদের এই বার্তাই দেয় যে—বাংলাদেশ আর পেছনের দিকে তাকাবে না।

শিক্ষার্থীদের প্রকৃত কল্যাণের জন্য পরীক্ষা পদ্ধতিকে আরও যুগোপযোগী করা, মেধার সঠিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করা এবং উচ্চশিক্ষার দুয়ার সবার জন্য উন্মুক্ত রাখা, শিক্ষক নিয়োগে সর্বোচ্চ মেধাবিদের খুঁজে এনে নিয়োগ দেয়া, এমন সেলেবাস প্রনয়ণ করা যাতে নির্দিষ্ট সময়ে অবশ্যই শ্রেনিকক্ষে সেটা শেষ করা সম্ভব হয়। তাহলেই প্রশ্নপত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলার সাহস কেউ পাবে না। এসব সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়ণ করতে পারলেই আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে এগিয়ে নেয়া সম্ভব।

পরিশেষে এমনই একটি নতুন ভোরের আশায় দিনগুণতে চাই, যেদিন ঘুমভেঙ্গে দেখবো আমার সন্তানের শিক্ষা জীবন শেষ হবার আগেই তার জন্য সম্মানের সুযোগ অপেক্ষা করছে। দেশের বাইরে উচ্চশিক্ষা নিতে গেলেও হেনস্তার শিকার হতে হচ্ছে না বরং তাদেরকে আগ্রহভরে গ্রহণ করতে উদগ্রীব হয়ে বসে থাকবে বিশ্বের অনেক নামি-দামি বিশ্ববিদ্যালয়।

এস এম হুমায়ুন কবির
প্রশিক্ষক ও নির্মাতা